বাংলাদেশের নারীবাদের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া

রবিবার, ডিসেম্বর ৯, ২০১৮ ২:২৬ PM | বিভাগ : পথিকৃত


বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বেগম রোকেয়া জীবন্ত পথিকৃত। একজন বেগম রোকেয়া তৎকালীন সময়ে সামাজিক প্রথা ও কুসংস্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বের হয়েছিলেন নারী জাগরণের আলোকবর্তিকা নিয়ে। সেই আলোকবর্তিকার সৃষ্ট আলোকরশ্মি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছেন অনেক নারীর সুপ্ত প্রতিভাকে। 

বেগম রোকেয়া একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি বাঙালি নারী জাগরণের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রথম বাঙালি নারীবাদী হিসেবে সেই আঠার শতকের দিকেই। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলার 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' জরিপে ষষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছিলেন বেগম রোকেয়া। 

১৮৮০ সালের আজকের এই দিনে (৯ডিসেম্বর) রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন এই মহিয়সী মানবী। নিজের সৃষ্ট প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। বেগম রোকেয়া নিজের লেখনি প্রতিভা দিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে চেয়েছেন, শিক্ষা আর পছন্দানুযায়ী পেশা নির্বাচনের সুযোগ ছাড়া যে নারী মুক্তি আসবে না -তা বলেছেন।

নারী মুক্তি নিয়ে বেগম রোকেয়ার যে লেখনি এবং চিন্তার প্রসারতা তা আজকের এই অতি ডিজিটালাইজেশন এর সময়ে আমরা ক'জনেই বা জানার চেষ্টা করি বা জানতে চাই আগ্রহ নিয়ে! আমরা হলিউড, বলিউড, ঢালিউডের নারী অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে অনেকটাই ফ্যান্টাসিতে ভুগি তোতা পাখীর ন্যায় মুখস্থ করি তাদের আত্নজীবনী অথচ নিজের দেশের একজন মানব মুক্তির কান্ডারী ও নারী মুক্তির অগ্রদূতকেই চিনতে চাই না বা চিনার প্রয়োজনীয়তা মনে করি না। বেগম রোকেয়া আমাদের থেকে ঐ বদ্ধ সময়ে (আঠার শতকের) ছিলেন অনেকটাই অগ্রগামী ও অগ্রসর অথচ বর্তমান সময়ে আমরা আমাদের চিন্তার দৈন্যতায় পিছিয়ে অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের ন্যায়।

#Sultans_Dream_সুলতানার_স্বপ্ন যেটি বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যর একটি অন্যতম সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।

তিনি সুলতানার স্বপ্ন বইতে লিখেছেন..... 
"পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জ্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডীকেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডীমাজিস্ট্রেট, লেডীব্যারিস্টার, লেডীজজ — সবই হইব! উপার্জ্জন করিব না কেন?
যে পরিশ্রম আমরা "স্বামী"র গৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না? আমরা বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন করি না বলিয়া তাহা হীনতেজ হইয়াছে। এখন অনুশীলন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিকে সতেজ করিব। যে বাহুলতা পরিশ্রম না করায় হীনবল হইয়াছে, তাহাকে খাটাইয়া সবল করিলে হয় না?

তাছাড়া অবরোধবাসিনী, মতিচুর, পদ্মরাগ তাঁর অন্যতম সাহিত্যেকর্ম।

বেগম রোকেয়ার বইয়ের উল্লেখযোগ্য কিছু উক্তি-

১. বিবাহ হইলে বালিকা ভাবে,যাহা হোক পড়া হইতে রক্ষা পাওয়া গেল।

২. আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি।

৩. মুসলমানদের মতে আমরা পুরুষের অর্ধেক অর্থাৎ দুজন নারী একজন নরের সমান।

৪. শারীরিক দূর্বলতাবশত নারী জাতি অপর জাতির সাহায্য নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ 'প্রভু' হইতে পারে না।

৫. স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন,স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য - প্রস্থ মাপেন। 

বেগম রোকেয়ার কর্ম ও আদর্শ উদযাপনের লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস উদযাপন করা হয় এবং একই সাথে নারী আন্দোলনের লড়াকু নারীদের দেয়া হয় বেগম রোকেয়া পদক। 

এই মহিয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর। সেসময় তিনি ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। তাঁর কবর উত্তর কলকাতার সোদপুরে অবস্থিত যা পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অমলেন্দু দে আবিষ্কার করেন। জন্মদিবসে এবং প্রয়াণ দিবসে এই মহীয়সী নারীকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও লাল সালাম।


  • ৪৪০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মাহমুদা খাঁ

সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও চা শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক।

ফেসবুকে আমরা