শবনম বা ঝর্ণা বসাক: এক অনন্য পরিমিত জীবনাচারের অভিনেত্রী

বুধবার, নভেম্বর ২০, ২০১৯ ৫:০৯ PM | বিভাগ : অর্জন


সিনেমার নায়িকা ত’ বটেই, আমাদের মতো বাংলা ভাষায় খান কয় গল্প-কবিতা লেখা মেয়েদের নিয়েও মাঝে মাঝেই প্রশ্ন ওঠে: এই সামান্য ‘নাম’ অর্জনের জন্য না জানি কী কী করতে হয়েছে। ইঙ্গিতটি স্পষ্ট। মেয়েদের নিয়ে এমন কথা ওঠেই। এমনকি চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রেও। ‘মি টু’ আন্দোলন ত’ বিশ্ব জুড়েই চলছে। আজো গোটা পৃথিবী জুড়ে অফিস-আদালত, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-নৃত্য-চলচ্চিত্র সবখানেই পুরুষের হাতে ক্ষমতার স্টিয়ারিং বলে এমন সব জল্পনা-কল্পনা হয়েই থাকে। কখনো মেয়েরা ‘আপোষ’ করেন, কখনো ‘আপোষ’ না করায় যে বস আগে মেয়েটির কাজের প্রশংসায় মুখর থাকতেন বা যে প্রকাশক, সাহিত্য সম্পাদক, মিউজিক ডিরেক্টর বা ফিল্ম ডিরেক্টর মেয়েটির প্রতিভায় ধন্য ধন্য করতেন, তারা মেয়েটির কণ্ঠরোধ করার বা কেরিয়ার বসিয়ে দেবার চেষ্টা করেন (তবে মেয়েটি পরিশ্রমী হলে এমন প্রচেষ্টা বেশি দূর ফলপ্রসূ হয় না- কোথাও না কোথাও কাজ করার জায়গা ত’ সে পাবেই)। আবার কোনো মেয়ে কিছুদিন ‘আপোষ’ করে পরেও ‘প্রতিবাদ’ করেন। ‘আপোষ’ করেন যারা একটা সময় তারা একদমই হারিয়ে যান। বরং মাঝে মাঝেই চাকরি থেকে হারিয়ে গিয়ে, বড় পত্রিকা-প্রকাশনা-সিনেমা থেকে হারিয়ে গিয়েও লড়াকু নারীরা মৃত্যু অবধি লড়াইটা জারি রাখতে পারেন। এসবের বাইরে আর একটি ‘সত্যি’ আছে। হয় সব বস-ফিল্ম ডিরেক্টর-মিউজিক ডিরেক্টর-প্রকাশক-সাহিত্য সম্পাদকের ‘বান্ধবী’ অথবা লতা মঙ্গেশকরের মতো চির অবিবাহিত হওয়া ছাড়া একদম নিরেট একগামী বিবাহিত জীবন যাপন করেও কি একজন নারী ‘সেলেব’ হতে বা থাকতে পারেন না? কি বললেন? চাকরি-গান-সাহিত্যে পারলেও সিনেমায় পারবেই না?

পুরণো ঢাকার মেয়ে (জন্ম: ১৭ই আগস্ট, ১৯৪২) ঝর্ণা বসাক ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন সুরকার রবীন ঘোষকে। তার আগেই মাত্র ২০ বছর বয়সে এহতেশামের ‘চান্দা’ ছবিতে যোগ দিয়ে সাদা-কালো পর্দায় অনন্য রূপে স্ক্রিনে ঝড় তুলেছেন। সিনেমায় তাঁর নাম হলো অবশ্য ‘শবনম’- সেটা ভারতের কোনো এক ইউসুফের ‘দিলীপ কুমার’ হয়ে ওঠার মতোই। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাশাকে কুর্ণিশ জানানো আর কী! ১৯৬৮ সালে পশ্চিম পাকিস্থানী অভিনেতা ওয়াহিদ মুরাদের আমন্ত্রণে তাঁর উর্দূ ছবি ‘সমুন্দর’-এ যখন অভিনয় শুরু করলেন, বাঙালিনী ঝর্ণাকে বাংলা হরফে উর্দূ সংলাপ মুখস্থ করতে হতো। গড় বাঙ্গালিনীর তুলনায় দীর্ঘকায়া ও গৌরী শবনম পশ্চিম পাকিস্থানে বা লাহোরে এতটাই জনপ্রিয়তা পেলেন যে বর রবিন ঘোষ সুদ্ধ লাহোরেই বাস করতে হলো। ১৯৭১-এ দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশে ফিরতে চাইলেও লাহোরের প্রযোজক-পরিচালকদের চাপে পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে বাংলাদেশে একবার বাবা-মা’র সাথে দেখা করার অনুমতি দিতে দু’বছর সময় নেয় এবং সেই অনুমতিও এই শর্তের বিনিময়ে মেলে যে আবার তিনি তার বর-পুত্র সমেত পাকিস্থান ফিরবেন। ১৯৬০-৮০’র দশক হয়ে ৯০-এর শুরু অবধি লাহোরে তিনি নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করে গেছেন। মোট ১৩ বার পাক ফিল্ম জগতে ‘নিগার’ পুরষ্কার বা সেরা অভিনেত্রীর শিরোপা জেতেন এই বাঙালিনী যা কোনো উর্দূভাষী নায়িকাও পারেনি। ১৯৯৭ সালে বর-পুত্র সহ দেশে ফেরেন। ২০১২ সালে একবার পাকিস্থান বেড়াতে গেলে পাক সরকার তাঁকে ‘আজীবন সম্মাননা’ পুরষ্কার দেয় ও তাঁর বর সুরকার রবীন ঘোষের সুরকৃত বহু গান তরুন পাক শিল্পীরা মঞ্চে গেয়ে শোনায়। তদানীন্তন পাক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা জিলানী নিজে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন। ঢাকাতেই ঝর্ণা বসাক বা শবনমের আজীবন সঙ্গী রবিন ঘোষ ২০১৬ সালে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতায় মারা যান। একমাত্র পুত্র রনি ঘোষ জীবিত। বর্তমানে ঢাকায় শান্ত, অবসর জীবন যাপন করছেন শবনম বা ঝর্ণা বসাক।

শবনম বা ঝর্ণা বসাক (ছবিঃ ইন্টারনেট)

অথচ শবনমের সময়ের অন্য অভিনেত্রীদের ভেতর মীনা পাল তথা আজকের সারাহ বেগম কবরী, সুমিতা দেবী সহ আরো অনেক অভিনেত্রীর জীবনই ব্যক্তিগত পরিসরে যথেষ্ট অশান্ত। সুমিতা দেবী পূবর্তন জীবনের ব্রাম্মণ স্বামীকে ছেড়ে জহির রায়হানকে বিয়ে করেন তবে টেঁকেনি বেশিদিন। শেষ জীবনে মা-মাসীর চরিত্রে অভিনয় করতেন। এক সময়ের কবরী সারোয়ার বা আজকের সারাহ বেগম কবরীর ঠিক কয়টা বিয়ে সেটা পরবর্তী প্রজন্মের মেয়ে হয়ে আমি পুরো খোঁজ রাখতে পারিনি। স্কুলে পড়তে আমরা বরং মুগ্ধ হতাম ববিতাকে দিয়ে বেশি। সেই ববিতা দ্রুতই বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদের পর সিনেমা ছেড়ে দিলেন, খুব বেশি মোটা হয়ে গেলেন। শাবানা বরং তুলনামূলক স্থির জীবন যাপন করেছেন। ভারতে মধুবালা বা মুমতাজ জাহান দেহলভী যেমন কিশোর কুমারের নিদারুন উপেক্ষা ও অবহেলা সয়ে অকালমৃত্যু বরণ করেছেন, চির অবিবাহিত পারভীন বাবি প্রতিমা বেদীর বর কবীর বেদীর হাতে প্রতারিত হয়ে মধ্য পঞ্চাশে জীবনের প্রতি আশা হারিয়ে একা ফ্ল্যাটে মৃত পড়ে থাকেন, এদেশেও শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি বা অপু বিশ্বাসদের কেরিয়ার ও ব্যক্তিজীবন খুব দ্রুতই তছনছ হয়ে গেলো। ওপারে নুসরত বিয়ে করে সিঁথিতে সিঁদুর পরছেন বা রথযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন...কেমন যেনো সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কুর্ণিশ! বিনোদন ভুবনে এমনিতেই নারীর বিপন্নতা রয়েছে। সংখ্যালঘু নারীর বিপন্নতা আরো বেশি। অথবা সংখ্যালঘু-গুরুও কথা নয়। ভারতে সুপ্রিয়া দেবী কেনো যে নিজেকে উত্তমের সাথে অমন স্বীকৃতিহীন সম্পর্কে জড়িয়ে নিজেকে এতো কষ্ট দিলেন আবার সুচিত্রা সেন রানীর অহঙ্কারে নি:সঙ্গ জীবন কাটিয়ে দিলেন...একজন নারী নিজের মাথা কতোটা উঁচু রাখবেন সেটা তাঁরই শেষ সিদ্ধান্ত।

একজন ঝর্ণা বসাক বা শবনমকে নিয়ে বিষ্ময়ের তাই অন্ত থাকে না যে কী করে সেই পাক আমলে একজন সনাতন বাঙ্গালিনী হয়ে বর-পুত্রের নিটোল, পারিবারিক জীবন নিয়ে লাহোরে তিন দশক রাজত্ব করে জাতিগত, সংস্কৃতিগত সব পরিচয় ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে একটি জীবন কাটালেন! লাহোরে একবার ঝর্ণা-রবীনের বাসায় ডাকাতি হলে এমন যে কুখ্যাত সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক তিনি নিজে হন্তদন্ত হয়ে ডাকাতদের শাস্তি দিতে উদ্যত হন। আবার দেখুন একজন অভিনেত্রী নিজের কাজে আন্তরিক ও পরিশ্রমী হলে ব্যক্তি জীবন ও অভিনয় জীবন আলাদা রেখেও সফল হতে পারেন। কই, উর্দূভাষী পাক প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতাদের সাথে তাঁকে ত’ ‘ভ্রষ্ট’ হতে হয়নি! হয়তো সুরকার স্বামীও সহায়ক ছিলেন (সে ত’ সুমিতা দেবীর প্রথম স্বামীই স্ত্রীকে যশস্বী করতে জহির রায়হানের কাছে নিয়ে এসেছিলেন)। তবে অবশ্যই সুরকার রবীন ঘোষ স্ত্রীর কাজকে ‘কাজ’ হিসেবেই দেখেছেন। মেলশভিনিজমের চশমায় বিক্ষত বোধ করেন নি। সেটুকু ম্যাচুরিটি নিশ্চিত তাঁর ছিল।

সাদা-কালো ছবিতে তরুণী শবনম বা ঝর্ণা বসাককে দেখা রীতিমত পবিত্র আনন্দের সঞ্চার করবে; এতোটাই অনিন্দ্য রূপ ও মায়ার অধিকারী ছিলেন তিনি। খামোকা শহীদুল জহিরের মত লেখকও কি ঝর্ণা বসাককে তাঁর গল্পে উল্লেখ না করে পারেন নি যখন মহল্লার ছেলেদের পাড়ায় শেফালী ফুলের গাছ দেখে ঝর্ণা বসাকের কথা মনে পড়ে যে এখন সিনেমায় অভিনয় করে ও ছেলেরা চেঁচিয়ে বলে: ‘এই শেফালী ফুল গাছ!’


  • ৬১৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা