পুরাণ, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে মায়ের অন্যত্র প্রেম বা বিয়ে ও একজন গুলতেকিন আহমেদ

শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯ ৯:২০ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


খ্রিষ্টপূর্ব ৪১০ অব্দে গ্রিক নাট্যকার সফোক্লেস রচিত ‘ইলেক্ট্রা’ নাটকটির উপর ভিত্তি করেই বহু শতাব্দী পরে ভিয়েনার সিগমুন্ড ফ্রয়েড নামের এক মনোবিজ্ঞানী পিতার প্রতি কন্যাশিশুর টান ও মা’কে ঈর্ষা করার প্রবণতার নাম দিয়েছিলেন ‘ইলেক্ট্রা।’ কেনো গ্রিক রাজ্য আর্গসের রাজা আগামেমননের কন্যা ইলেক্ট্রা গর্ভধারীনী মা ক্লাইটেমেনস্ট্রাকে হত্যার জন্য নিজেরই ভাই ওরেস্টেসকে উত্তেজিত করেছেন? বিপিতা এ্যাজিসথাসের সাথে মায়ের বিয়ের জন্য? ট্রোজান যুদ্ধের পর আগামেমননকে মা ক্লাইটেমেনস্ট্রা ও বিপিতা এ্যাজিসথাসের হত্যার বদলা? কিন্তÍ আগামেমননই কি একশো ভাগ সঠিক বা নীতিবাণ ছিলেন? ক্লাইটেমেনস্ট্রার প্রতি তিনি কি কোনো অন্যায় করেননি?

উত্তরে বলতে হয় অবশ্যই করেছেন। দীর্ঘ বর্ষ ব্যপী গ্রিক-ট্রয় যুদ্ধে গ্রিক জাহাজগুলো রাজা মেনিলাসের স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগীনী পত্নী হেলেনকে ট্রয় থেকে উদ্ধার করার আশায় যাত্রা করার সময় যখন পালে বাতাস পাচ্ছিলো না, তখন সুবাতাসের আশায় দেবতাদের তুষ্ট করতে এক কন্যা শিশু বলির দরকার হয়। আগামেমনন তখন ক্লাইটেমেনস্ট্রার কান্নাকে উপেক্ষা করে তাঁদের ন’বছরের শিশু কন্যা ইফিজেনিয়াকে কোলে নিয়ে আদর করার ভঙ্গিতে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন এবং ট্রয় বিজয়ের পর ট্রোজান রাজকন্যা ক্যাসান্দ্রাকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে সাথে করে নিয়ে আসেন। ইফিজেনিয়ার হত্যার পর থেকেই ক্ষুব্ধ ক্লাইটেমেনস্ট্রা স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় ইতোমধ্যেই এ্যাজিসথাস নামে এক প্রেমিকের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। আগামেমনন দেশে পৌঁছলে তাঁকে অতর্কিত অবস্থায় ক্লাইটেমেনস্ট্রা ও তাঁর প্রেমিক এ্যাজিসথাস হত্যা করেন। একমাত্র পুত্র বালক ওরেস্টেসকে পাঠিয়ে দেয়া হয় দূর ফোসিসে। আর দুই কন্যা ইলেক্ট্রা ও ইলেক্ট্রার ছোট বোণ ক্রিসোথেমিস মা ও বিপিতার সংসারেই রয়ে যায়। দুই বোনের ভেতর ক্রিসোথেমিস যদিও পিতৃহত্যার শোধ বা মা’র প্রেমিক জাতীয় বিষয় নিয়ে চিন্তিত নয়, ইলেক্ট্রা বোনকে প্রায়ই প্রতিশোধের কথা বলে। ক্রিসোথেমিস জানায় যে সেটা এই ক্ষমতা কাঠামোয় করা একরকম অসম্ভব।

Electra and Orestes, matricides

সফোক্লেসের এই নাটক শুরু হয় আগামেমননের মৃত্যুর বহু বছর পর ওরেস্টেস যখন পূর্ণ যুবক হয়ে পিতৃরাজ্যে ছদ্মবেশে ও গোপনে পুনরায় এক বৃদ্ধ সহচর ও ফোসিসেরই আর এক যুবক পাইলাদেসের সাথে আসেন। ওরেস্টেস ও পাইলাদেস পরিকল্পনা করেন যে রাজপ্রাসাদে ইলেক্ট্রার সাথে তাঁরা দেখা করবেন। তবে, সেই সুযোগ পাবার জন্য তাঁরা একটি মিথ্যে গল্প ফাঁদেন যে ওরেস্টেস মারা গেছেন ও একটি শবাধারে ওরেস্টেসের দেহভষ্ম বা দেহাবশেষই তাঁরা ইলেক্ট্রাকে হস্তান্তর করবেন।

ইলেক্ট্রা তো কোনোদিনই বাবার মৃত্যু মেনে নেয়নি আর মা’র প্রেমিককেও নয়। ছোট বোন যে বিপিতা আর মায়ের সংসারে নিজেকে এতো মানিয়ে নিয়েছে এটা নিয়ে ক্রিসোথেমিসকে সে তিক্ত বাক্যও বলে। ইলেক্ট্রার একমাত্র ভরসা যে ভাই ওরেস্টেস এসে একদিন এই হত্যার শোধ নেবে। ইতোমধ্যে দূতের মুখে ইলেক্ট্রা ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকবিহ্বল হয়ে পড়ে যদিও মা ক্লাইটেমেনস্ট্রা এটা শুনে আশ্বস্তই হয়। ক্রিসোথেমিস অবশ্য বলে যে আগামেমননের কবরের বেদিতে সে কিছু অর্ঘ্য-এর পাশাপাশি এক গোছা চুল দেখেছে এবং হয়ত ওরেস্টেস ফিরে এসেছে। ইলেক্ট্রা সে কথা উড়িয়ে দেয় ও ভাইয়ের শোকে কাঁদতে থাকে। ইলেক্ট্রা পুনরায় বিপিতাকে হত্যার জন্য ছোটবোনকে তার সাথে হাত মিলাতে বলে তবে ছোট বোন এতটা আবেগপ্রবণ নয়।

ইতোমধ্যে ওরেস্টেস কিছু ছাই বা ‘দেহভষ্ম’ সহ একটি শবাধার নিয়ে প্রাসাদে ঢোকে- ছদ্মবেশী হিসেবে। শুরুতে সে ইলেক্ট্রাকে চিনতে পারে না বা ইলেক্ট্রাও চিনতে পারে না ভাইকে। তবে, একটু দেরি করে হলেও বোনকে চেনার পর যেই না নিজের পরিচয় জানিয়েছে ওরেস্টেস, আনন্দ ও উত্তেজনায় সরল ইলেক্ট্রা ভাইয়ের পরিচয় প্রায় ফাঁসই করে দেয় আর কী!

Roman sculpture of Electra and Orestes

যাহোক, এরপর ইলেক্ট্রা, ওরেস্টেস ও পিলাদেস মিলে ক্লাইটেমেনস্ট্রাকে হত্যা করে এবং মায়ের মৃতদেহ লুকিয়ে রাখে একটি চাদরের নিচে। বিপাতা এ্যাজিসথাস ঘরে আসার পর ইলেক্ট্রা চাদরে ঢাকা দেহটি ‘ওরেস্টেসে’র দেহ বলে তার কাছে দেবার পর এ্যাজিসথাস চাদর খুলেই মৃত স্ত্রীর দেহ দেখতে পান। ওরেস্টেস তখন তার আসল পরিচয় দিয়ে পিতৃহন্তারক ও মায়ের প্রেমিককে নিয়ে যায় সেই বেদীতে যেখানে অতীতে আগামেমননকে হত্যা করা হয়েছিল। ‘দ্য নস্টই’ নামে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের বিলুপ্ত কিছু আখ্যানের একটি গল্পের উপর ভিত্তি করে এই নাটকটি লেখা হয়েছিল হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্যদ্বয় রচনার মধ্যবর্তী সময়ে।

সমাজতাত্ত্বিকভাবে এই নাটকটি এমন এক সময়ের রচনা যখন গ্রিসে মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃসূত্রী সমাজব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতা কায়েম হতে চলেছে। আদি গ্রিক সমাজে তখনো মাতৃহত্যা প্রবলতম পাপ এবং এই হত্যার পর গ্রিক দেবসমাজের ভেতর যে বিচারসভা বসে, সেখানে মাতৃসূত্রী সমাজব্যবস্থার প্রতীক বা বিচারের দেবী ফিউরিগণ মাতৃহত্যার কঠোর শাস্তি ওরেস্টেসকে দিতে চায় যেহেতু ক্লাইটেমেনস্ট্রা স্বামী আগামেমননকে হত্যা করলেও ‘সে ছিলো না তার আপন রক্তের কেউ।’ তীব্র বাদানুবাদনির্ভর এই বিতর্ক সভায় দেবী এথিনা পুরুষ দেবতাদের পক্ষে বা নবোত্থিত পিতৃতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়ে ওরেস্টেসকে শাস্তি থেকে বাঁচান। বিশিষ্ট সমাজতন্ত্রী সমাজবিজ্ঞানী ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলসের ‘পরিবার, ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উদ্ভব’-এ এ বিষয়ে দীর্ঘ বিবরণ রয়েছে। সমাজে নারী তার প্রজনন ও শিশু পালনের ভূমিকার কারণেই অর্থনৈতিক নানা কাজ থেকে যতো পিছিয়ে পড়ছিলো, পুরুষের হাতে ততই কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল আর্থিক সম্পদ ও সেই সম্পদের ভিত্তিতেই কঠোর পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও তার নয়া মূল্যবোধ জারি হতে থাকে যেখানে পিতা হয়েও আপন কন্যাকে হত্যা করা বা অন্য দেশ থেকে যৌনদাসী আনার অধিকার আছে আগামেমননের। কিন্তু, ক্লাইটেমেনস্ট্রার তরফে বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ কী প্রতিশোধ পাপ। পিতৃতন্ত্রের এই নয়া বিচার সম্পন্ন করায় মুখ্য ভূমিকা পালন করলো ক্লাইটেমেনস্ট্রারই কন্যা ও বাবা আগামেমননের হাতে অন্যায় বলি হওয়া শিশু ইফিজেনিয়ার বোন ইলেক্ট্রা।

ভারতীয় পুরাণে ত্রেতা যুগে (তাম্র যুগ) মহর্ষি উদ্দালক ও তাঁর কিশোরপুত্র শ্বেতকেতুর সামনে থেকেই একদিন শ্বেতকেতুর মা ও উদ্দালকের স্ত্রী এক পরপুরুষের সাথে বের হয়ে গেলেন। মর্মপীড়া অনুভব করলেন শ্বেতকেতু ও পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে মা’কে কেনো তিনি বাধা দিলেন না। উত্তরে উদ্দালক বললেন যে শ্বেতকেতুর মা’কে আটকানোর এখতিয়ার বা অধিকার তাঁর নেই। আসলে এটা সেই সময়ের কাহিনী যখন মানবসমাজে একগামী বিয়ে প্রথা চালু হয়নি। সমাজে সব পুরুষের উপর সব নারীর এবং সব নারীর উপরেই সব পুরুষের অধিকার ছিল। বালক শ্বেতকেতু একদিন প্রবীণ হলেন এবং সমাজে একগামী বিয়ে প্রথা কঠোর করলেন।

ভারতীয় পুরাণে আরো আছে পরশুরাম ও তাঁর মায়ের গল্প। ক্ষত্রিয়দের আগ্রাসন থেকে ব্রাহ্মণদের রক্ষা করতে মহর্ষি জমদগ্নি ও রেণুকার কোল আলো করে পরশুরাম রূপে জন্মগ্রহণ করলেন ভগবান বিষ্ণু। তিনি ছিলেন তাদের পঞ্চম ও কনিষ্ঠ পুত্র। মহাদেবের তপস্যা করে তিনি লাভ করেছিলেন অমোঘ অস্ত্র পরশু বা কুঠার। একদিন জমদগ্নি যজ্ঞের আয়োজন করেছেন, রেণুকা গেছেন নদীতে স্নান করতে। সেখানে চিত্ররথ নামে এক গন্ধর্ব্ব রাজ স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে জলে সন্তরণ করছিলেন। গন্ধর্ব্বরাজের মনোহর রূপ দেখে রেণুকা মনে মনে তার প্রতি আকৃষ্ট হন। এদিকে স্ত্রীর স্নান করে ফিরতে দেরি হওয়ায় জমদগ্নি ধ্যানযোগে পত্নীর সব কার্যকলাপ দেখতে পেলেন। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে পুত্রদের তিনি আদেশ করলেন এক্ষুনি তোমাদের মায়ের শিরচ্ছেদ কর। মাতৃ হত্যা মহাপাপ, তাই প্রথম চার পুত্র একাজ করতে অস্বীকার করলেন। তখন জমদগ্নি কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরামকে এই কাজ করতে আদেশ দিলেন। পিতৃ আজ্ঞা অমান্য করাও মহাপাপ। তাই পরশুরাম কুঠারের আঘাতে মায়ের শিরচ্ছেদ করলেন। জমদগ্নির ক্রোধ প্রশমিত হল। পুত্রের পিতৃভক্তি দেখে তাকে মনোমত বর চাইতে বললেন। পরশুরাম বললেন হে পিতা, আপনি আমার মায়ের প্রাণ ফিরিয়ে দিন। খুশি হয়ে তিনি রেণুকাকে পুনর্জীবিত করলেন। কিন্তু দেখা গেলো পরশুরামের হাতের কুঠার হাতেই লেগে আছে, কোনোভাবেই তাকে বিচ্ছিন্ন করা গেলো না। নিরুপায় পরশুরাম পিতার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। জমদগ্নি বললেন, ‘তুমি নিজের গর্ভধারিনী মাকে হত্যা করেছ। কাজেই কুঠার ছুটছে না।’ অবশেষে পিতার কথায় পবিত্র নদীতে অবগাহন করে পরশুরাম পাপমুক্ত হন।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী ও পুরুষের জন্য যৌন আচরণের ক্ষেত্রে দ্বিবিধ নৈতিকতার প্রত্যাশা করা হয়। বিয়ের আগে দৈহিক সম্পর্কে জড়ানো পুরুষের জন্য পাপ না হলেও আমাদের মত প্রাচ্যের সমাজে আজো নারী বিয়ের সময় পর্যন্ত কুমারী থাকবে এটাই প্রত্যাশা করা হয়। বিবাহিত অবস্থায়ও পুরুষ অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে ততোটা দোষ ধরা হয় না যা নারী করলে দোষ মনে করা হয়। পিতা পরিত্যক্ত সন্তানরা একা মায়ের ঘরে পালিত হবার যত শত শত উদাহরণ চারপাশে দেখতে পাওয়া যায়, বিপ্রতীপ উদাহরণ নেইই বলতে গেলে। মা তরুণী বয়সে বিধবা হলেও আর বিয়ে করবেন না বলে এখনো আমাদের মত দক্ষিণ এশীয় সমাজে প্রত্যাশা করা হয়। বাবার ক্ষেত্রে এমনটা ভাবাই যায় না। বাবা বয়সে হাজারগুণ ছোট মেয়ে বিয়ে করলেও সমস্যা নেই। মা বয়সে ছোট কেনো, ঘরের কুমারী বোনটিও যদি বয়সে এক দিনের ছোট ছেলেকেও বিয়ে করে, তাতেও অনেক পুরুষতান্ত্রিক ভাইয়ের চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায় বা যাবে। অথচ, এগুলো সবই ‘সামাজিক প্রত্যক্ষণ/অবধারণ/বিনির্মাণ’ ব্যতীত কিছুই নয়। এমনকি একটি পোলিশ সিনেমাতেও দেখেছিলাম যে বিধবা তরুণী মায়ের প্রেমে বিরক্ত দুই কিশোরপুত্র কী করে বাথরুমে মা’র শাওয়ার নেবার সময় থেকে প্রতিটা মূহুর্ত মা’কে নজরদারি করে এবং নিজেদের ভেতর মা’কে ‘হোর/বিচ’ বলে ডাকে। স্লাভিক বা পূর্ব ইউরোপীয় সমাজও অবশ্য বর্ণের শ্বেতাভাটুকু বাদ দিলে ভাবনা-চিন্তা বা আচার-আচরণে অনেকটাই বরং আমাদের বা পূর্বদেশীয়দের মত। পোলিশরা চার্চভক্ত ও খুব ধর্মভীরুও বটে।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ যখন আপন কিশোরী কন্যা শীলারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাওনকে বিয়ে করার জন্য স্ত্রী গুলতেকিন ও সন্তানদের পরিত্যাগ করেন (গুলতেকিন নিজেই ১৫ বছর বয়সে ত্রিশের হুমায়ুনকে বিয়ে করেছিলেন- সমাজ সেই কিশোরীকে এভাবেই শিখিয়েছিল- পনেরোর চপলা কিশোরী ত্রিশের কোনো উদীয়মান লেখকের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পিতা না হোক পিতৃব্যের বয়সী কারো গলায় মালা পরালে পিতৃতন্ত্র আরো বলবান হয়)। প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খাঁ-এর দৌহিত্রী ও ঢাকার এক অভিজাত পরিবারের কন্যা গুলতেকিন ব্যক্তিসত্ত্বা বা ব্যক্তি পরিচয় অর্জনের বদলে যশস্বী লেখকের স্ত্রী ও তাঁর সন্তানদের মা হবার সমাজের তোতা পড়া শেখানো, পিতৃতান্ত্রিক আনন্দেই জীবন পার করেছেন। সেই আনন্দে বজ্রপাত ঘটলো যখন মেয়ের বান্ধবী তাঁরই স্বামীকে বিয়ে করে বসলেন।

আজ মধ্য বা অন্ত্য পঞ্চাশের গুলতেকিন মেয়েদের সবার বিয়ে ও পুত্র নুহাশের পেশাগত প্রতিষ্ঠার পর যখন তাঁরই মত আর এক বিপত্নীক তবে সুযোগ্য পেশাগত মর্যাদার এক কবিকে বিয়ে করলেন, তখন গুলতেকিনের ছেলে-মেয়েরা হাসি মুখে মায়ের বিয়েতে অংশ নিলেও এবং এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও আমাদের সমাজেরই একটি অংশ খুবই ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। পিতা লম্পট বা ব্যভিচারী হলেও মানা যায়, তাই বলে মাতা? গুলতেকিনই কি এতটাই হুমায়ুন অনুগত ছিলেন যে প্রথম স্বামীর জীবদ্দশায় এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি? অথবা পুত্র-কন্যাদের মানুষ করাটাই তখন বড়ো বিবেচনা ছিলো?

যাহোক, গুলতেকিনের এই বিয়ের ফলে আজো এসমাজে উচ্চ শিক্ষা বা কেরিয়ার গড়ার প্রবল সংগ্রামে ত্রিশ, মধ্য ত্রিশ বা চল্লিশ পার হওয়া যে নারীদের আর সারা জীবনের মত চির অবিবাহিত থাকার ঝুঁকিটাই নিতে হয়, তাদের জন্য একটি দারুণ দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। শুধু পুরুষ নয়, নারীর জন্য বিয়ের কোনো বয়স নেই- এমন বোধ একদিন আমাদের সমাজেও প্রতিষ্ঠা পাবে বা পেতে যাচ্ছে বলে আশা করা যায়। ডিভোর্সী বা অতীতে বিবাহিত, সন্তানের মায়েরাও নতুন ভাবে সম্পর্ক গড়া বা জীবন গড়ার সাহস পাবেন। দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম স্যারের কথায় বলতেই হয় যে ‘জীবন জয়ী হবে।’

হ্যাঁ, মা ও নতুন পিতার বিয়ে উপলক্ষ্যে ঘরোয়া ভাবে সাজানো খাবারের টেবিলের সামনে গুলতেকিনের পুত্র-কন্যাদের মুখের মৃদু হাসিতে হাল্কা কি বিষাদও রয়েছে? পিতার ক্ষমার অযোগ্য আচরণের কারণেই মায়ের এই এতো বছর পর ঘুরে দাঁড়ানোটা যুক্তি ও নীতির অংশ হিসেবে মেনে নিলেও ভাই-বোনদের হাসির আড়ালে কি আছে কোনো ‘করুণ ভায়োলিন?’ তবু কোথাও মায়া রহিয়া গেলো!


  • ৬৩৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা