টিনটিন (গ্রেটা)-কে লেখা জোয়ান বায়েজের চিঠি : অদিতি ফাল্গুনী

সোমবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯ ২:১৭ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


শিরোনাম দেখে চমকে উঠলেন? ওর পুরো নামটা যে বেশ বড়ো! গ্রেটা টিনটিন এলিওনোরা এর্নম্যান থুনবার্গ। ২০০৩-এর ৩রা জানুয়ারিতে জন্ম নেয়া বাচ্চা মেয়েটি যে গোটা পৃথিবীতে ঝড় বইয়ে দিচ্ছে! অপেরা গায়িকা মালেনা এর্নম্যান ও অভিনেতা সভন্তে থুনবার্গের মেয়ে ও অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার পিতামহ ওলফ থুনবার্গের নাতনী গ্রেটা থুনবার্গ ২০১১ সালে প্রথম যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শোনে, সে বুঝে উঠতে পারেনি যে কেনো এবিষয়ে এতো কম কাজ করা হচ্ছে! তিন বছর পর গ্রেটার ভেতর বিষাদ ও আলস্য, কথা বলা ও খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেবার প্রবণতা দেখা দেয়। গ্রেটার ভেতর এ্যাসপার্গার সিন্ড্রোম দেখা দেয়। কথা না বলা বা সামাজিক মেলা-মেশায় আগ্রহ বোধ না করা এই রোগের বৈশিষ্ট্য। যদিও গ্রেটা স্বীকার করে যে অসুস্থতা তার কাজ-কর্ম কিছুটা ‘সীমিত করে ফেলেছিলো’ তবে একইসাথে অসুস্থতাকেই গ্রেটা তার ‘পরম শক্তি’ বলেও মনে করে।

গত দু’বছর ধরে গ্রেটা তার পরিবারকে নিরামিষাশী হওয়া ও বিমান ভ্রমণ বাতিলের কথা বলে ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ কমাতে বলছে।  এক পর্যায়ে তার মা’কে আন্তর্জাতিক অপেরা গায়িকার পেশা ছেড়ে দিত হয়। এজন্য গ্রেটা তার পরিবারের ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। ২০১৮-এর শেষ নাগাদ থুনবার্গ তার ‘স্কুল স্ট্রাইক’ কর্মসূচী শুরু করে। তার বাবা যদিও মেয়ের স্কুল কামাই করা পছন্দ করে না, তবে এটাও বলেন: ‘আমরা ওর অবস্থানকে সম্মান করি। ও বাসায় থেকে অখুশি হতে পারে অথবা প্রতিবাদ করে সুখী হতে পারে।’ গ্রেটার স্কুল শিক্ষকেরাও দ্বিধা-বিভক্ত। ‘মানুষ হিসেবে তাঁরা মনে করেন আমি ঠিক করছি তবে শিক্ষক হিসেবে মনে করেন যে আমার এখন থামা উচিৎ।’

২০১৯ সালে গ্রেটা ওরফে টিনটিন তার জলবায়ু বিষয়ক বক্তৃতা সঙ্কলণ ‘পরিবর্তন আনতে কেউই খুব ছোট নয়’ প্রকাশ করে ও বই বিক্রির অর্থ দাতব্য সংস্থায় দান করে। ২০১৯-এর আগস্টে গ্রেটা আটলান্টিক সমুদ্র অতিক্রম করে নিউ ইয়র্ক যায় একটি ষাট ফুট দীর্ঘ ইয়াটে চেপে যেটাতে ছিল সৌর জ্বালানী। তবু সে বিমানে চড়বে না । ১৪-২৮ আগস্ট এক দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর থুনবার্গ নিউইয়র্ক পৌঁছে ‘ইউএন ক্লাইমেট এ্যাকশন সামিট’-এ অংশ নেয়।

২০১৮-এর মে মাসে থুনবার্গ সুইডিশ পত্রিকা ‘সভেনস্কা দাগব্লাদেত’ আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি রচনা প্রতিযোগিতায় গ্রেটা প্রথম হয়। ছোট্ট টিনটিনের সেই লেখাটি পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করলে ‘ফসিল ফ্রি ডালসল্যান্ড’ নামে এক সংস্থার নির্বাহ গ্রেটার সাথে যোগাযোগ করেন। তিনিই গ্রেটাকে জলবায়ু প্রশ্নে ‘স্কুল স্ট্রাইক’ বা ‘স্কুল ধর্মঘট’ করার কথা বলেন। গ্রেটা তার বন্ধু-বান্ধবীদের বললেও শুরুতে ওরা আগ্রহী হয়নি। তখন সে একাই কাজটি শুরু করে। এদিকে সুইডেনে গত ২৬২ বছরের বা স্মরণাতীত কালের গরম প্রদাহ আর দাবানল শুরু হলে নবম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেটা ২০১৮-এর ২০শে আগস্ট ঠিক করে যে সে ৯ই সেপ্টেম্বর সুইডিশ সাধারণ নির্বাচন অবধি স্কুলে যাবেই না। প্রতি শুক্রবার সুইডিশ সংসদ রিক্সড্যাগের সামনে সে বসা শুরু করে। এখন আরো কিছু ছেলে-মেয়ে তার সাথে বসে। যদিও স্কুলের পড়াও পড়ে গ্রেটা, তবু ছোট্ট টিনটিনের এখন অবসর সময় বলতে তেমন কিছু নেই।

এমন দৃঢ়চিত্ত টিনটিনকেই এবার চিঠি লিখলেন কিংবদন্তীতূল্য গায়িকা ও মানবাধিকার কর্মী জোয়ান বায়েজ। জোয়ান সম্পর্কে নতুন করে লেখার কিছু নেই। জোয়ান বায়েজ ১৯৪১ সালে নিউইয়র্কের স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন।

জোয়ানের বাবা ইউনেস্কোর সাথে কাজ করার জন্য তার পরিবারকে অনেকবার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ছাড়াও জোয়ানের পরিবারকে বিভিন্ন সময় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যে যেতে হয়। মানবাধিকার এবং সমাজসেবায় জোয়ান ক্যারিয়ারের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন। আমেরিকান মাস্টার্স নামক পিবিএস এর সিরিজে তিনি বলেন যে সমাজ সেবাই তার জীবনের ব্রত, গানের থেকে এটা বডরো। জোয়ান বায়েজের সত্যিকারে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভালে। তার রেকর্ডিং ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৬০ সালে। তার প্রথম তিনটি অ্যালবামে নাম "জোয়ান বায়েজ", "জোয়ান বায়েজ ভলিউম ২", "জোয়ান বায়েজ ইন কনসার্ট", সবগুলো 'গোল্ড রেকর্ড' মর্যাদাপ্রাপ্ত হয় ও বিভিন্ন চার্টে দুই বছর স্থান ধরে রাখে। তিনি ইংরেজির পাশাপাশি স্প্যানিশেও দক্ষ। এ দুই ভাষার পাশাপাশি আরো অন্ততঃ ছয়টি ভাষায় গান রেকর্ডিং করেছেন তিনি। ৫৩ বছর ধরে তিনি ৩০টির বেশি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালে মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামক বিখ্যাত কনসার্টে "স্টোরি অফ বাংলাদেশ" গানটি পরিবেশন করেন। গানটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, পাকিস্তানের গণহত্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ত্রহীন ছাত্রদের হত্যার কথা উঠে আসে। পরে চান্দস মিউজিক থেকে ১৯৭২ সালে "সং অফ বাংলাদেশ" নামে গানটি প্রকাশ করেন। পুরো গানটিতে ২২ বার বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে।

এখানে কিশোরী টিনটিনকে লেখা জোয়ান বায়েজের ছোট্ট চিঠিটির বাংলা অনুবাদ ‘নারী’-র পাঠকের উদ্দেশ্যে দেয়া হলো:

“ প্রিয় গ্রেটা,

এই দেশে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী জাতিকে সত্য কথা বলার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

এখানে সম্পদ ও ক্ষমতার দুর্গগুলো আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয়ের পুরোভাগে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, দাঁড় করিয়েছে ষষ্ঠ অবলুপ্তি, যেমনটা জানি সেই সভ্যতার সম্ভাব্য শেষ কিনারায়।

একমাত্র যে পন্থায় আমরা এই আসন্ন অন্তিম বিপদ রোধ করতে পারি সেটা শুধুই একটি গণ অভ্যুত্থান গড়ে তোলার মাধ্যমে সম্ভব, একদম তৃণমূল স্তর থেকে। এর অর্থ কথা বলার পাশাপাশি পায়ে হাঁটা। এর অর্থ ঝুঁকি নেয়া। এর অর্থ চারপাশে নেতি আর প্রত্যাখ্যানের হট্টগোলের ভেতর নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া।

এর অর্থ আজ তুমি এবং তোমার মতই এই পৃথিবীর দীপিত কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা যা করছে ঠিক তাই।

এই দেশে সভ্য মানুষের আর একটি জাতি আছে, যাদের তুমি গভীরভাবে নাড়া দিয়েছ। সেই জাতির এক সদস্য হিসেবে আমি আমার গোটা জীবনের একটি বিবরণধর্মী তালিকা করছি- এটা পরখ করে নিতে যে তুমি এবং তোমার মতই আমাদের অন্যান্য সন্তানরা আমাদের কাছ থেকে যে দাবি করছে, সেই মানদন্ড অনুযায়ী আমরা বাঁচতে পারছি কিনা। আমি আশা করি আমি পারব।

এবং তুমি জান যখন বুড়ো খোকা রাজনীতিকরা পাগলের মত তোমাকে আক্রমণ করাকেই তাদের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তখন তুমি একদম ঠিক কাজটিই করছো।

খুব সত্যকারভাবেই তোমার,

জোয়ান বায়েজ


  • ২৪৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী গায়েন

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা