লাল গেন্দা ফুল’ : পুঁজি ও পুরুষাধিপত্যের ক্ষমতা প্রদর্শন

মঙ্গলবার, মার্চ ৩১, ২০২০ ৪:১১ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


 

বিখ্যাত বৃটিশ সিনেমা সমালোচক ও নারীবাদী লরা মালভি (১৯৪১-) তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘ভিজ্যুয়াল এ্যান্ড আদার প্লেজার্স’ বইয়ে বলছেন, ‘সিনেমা শুরু হয় নারীকে বস্ত বা অবজেক্ট হিসেবে উপস্থাপনার মাধ্যমে- তাকে বস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় সব দর্শক এবং সিনেমার পুরুষ চরিত্রদের সম্মিলিত দৃষ্টির সামনে। সে বিচ্ছিন্ন, লাবণ্যময়ী, প্রদর্শন টেবিলে এবং যৌনায়িত। তবে গল্প যতোই এগোয়, সে প্রেমে পড়ে সিনেমার মূল নায়ক চরিত্রটির সাথে এবং হয়ে ওঠে তার সম্পত্তি, ধীরে ধীরে সে হারায় তার বাহ্যিক চাকচিক্যময় চারিত্র্য, তার সাধারণীকৃত যৌনতা, শো-গার্ল হিসেবে যা কিছু দেখানোর; ধীরে ধীরে তার যৌনাবেদনময়তা ঐ প্রধান পুরুষ চরিত্রটির একার হয়ে ওঠে। তাঁর সাথে নিজেকে সণাক্ত করার মাধ্যমে, প্রধান পুরুষ চরিত্রটির ক্ষমতায় অংশ নিয়ে, দর্শকেরাও পরোক্ষভাবে নারী চরিত্রটিকে অধিকার করতে পারে।’

লরা মূলত: তাঁর ‘ভিজ্যুয়াল প্লেজার এ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ প্রবন্ধটির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন যা ১৯৭৩ সালে রচিত এবং ১৯৭৫ সালে বিখ্যাত বৃটিশ জার্ণাল ‘স্ক্রিন’-এ প্রকাশিত হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং জাঁক লাঁকার তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত লরার কাজের মাধ্যমেই মূলত: সিনেমা বিষয়ক তত্ত্বাদি সাইকো-এ্যানালিটিক ফ্রেমওয়ার্কের পথে অগ্রসর হয়। সিনেমা তত্ত্ব, সাইকো-এ্যানালিসিস ও নারীবাদের পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়া লরার চিন্তার প্রধান দিক। ফ্রয়েড ও লাঁকার তত্ত্বাদিকে ‘রাজনৈতিক অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করেই চিরায়ত হলিউডি সিনেমায় নারীকে কিভাবে পুরুষ তার ‘অধীনস্থ’ ও ‘যৌনবস্তু’ হিসেবে দখল করার চেষ্টা করে, পর্দার নারী চরিত্রগুলোকে ‘বাসনা’ ও ‘মেল গেইজ’ বা ‘পুরুষের চোখের’ আরাম হিসেবে উপস্থাপন করে, সেটাই লরা দেখিয়েছেন তাঁর প্রবন্ধে।

নাহ্, আর তত্ত্বে ভারাক্রান্ত না করি। প্রিয় পাঠক, আসলে হালে ইউটিউবে ভারতের জনপ্রিয় পাঞ্জাবী র‌্যাপ গায়ক আদিত্য প্রতীক সিং সিসোদিয়া ওরফে বাদশাহর ইউ টিউবে ভাইরাল হওয়া নতুন গান ‘লাল গেন্দা ফুল’ নিয়ে আলাপে আসি। বাদশা মূলত: হিন্দি, হরিয়ানভি এবং পাঞ্জাবী গানের জন্য বিখ্যাত। ইউটিউবে তাঁর প্রথম গান ‘ডিজে ওয়ালে বাবু’ আপলোড হবার ত্রিশ ঘন্টার ভেতরে এক মিলিয়ন ভিউ অর্জন করে। সেবার সেই মিউজিক ভিডিওতে নারী চরিত্রে অভিনয় করেন আস্থা গিল। এই বাদশাই এবার জনপ্রিয় সিংহলী বংশোদ্ভুত মুম্বাই সিনেমার অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্ণান্দেজকে নিয়ে একটি পুরণো বাংলা লোকগান ‘লাল গেন্দা ফুল’ পাঞ্জাবি ভাষায় লেখা নিজস্ব লিরিকসের সাথে রি-মিক্স করে ইউ টিউবে ছাড়ার পর গত অল্প কয়েকদিনেই এটা আড়াই মিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়েছে। গানটিতে বাংলা লিরিকসে কণ্ঠ দিয়েছেন গায়িকা পায়েল দেব। কিন্তু বহু পুরণো এই বাংলা লোকগানটির চার লাইন ব্যবহার করা হয়েছে মূল গীতিকার ও সুরকার রতন কাহার ও মূল গায়িকা স্বপ্না চক্রবর্ত্তীর প্রতি কোনো প্রকার কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করেই। সবচেয়ে বড় কথা ভারতের পশ্চিম বাংলার বীরভূম-বাঁকুড়ার অন্ত্যজ নারীর প্রেম ও বঞ্চণার এই অসামান্য গানের ক্যাচি মাত্র চারটি পংক্তি খুবই আপত্তিজনক, অশালীন রুচির পাঞ্জাবি লিরিকস ব্যবহার, জ্যাকুলিনের অনাবৃত শরীরী সৌন্দর্য ও গানের মূল পুরুষ চরিত্রে অভিনয়কারী গায়ক বাদশাহ নিজেই ভয়ানক এ্যাগ্রেসিভ ও লোলুপ পুরুষালী মুদ্রায়, জ্যাকুলিনের শরীরী ভাবে পুরোই নিয়ন্ত্রিতা ও প্যাসিভ মুখভঙ্গিমায় গানটি হয়ে উঠেছে নারীদেহকে পুরোপুরি পণ্যায়ণ ও ভোগের বস্তু হিসেবে ব্যবহারের ভয়ানক, বিবমিষা জাগানো একটি মিউজিক ভিডিও। প্রশ্ন উঠতে পারে যে এমন ত’ অনেকদিন থেকেই হচ্ছে। হলিউড-বলিউড বা দক্ষিণ ভারতীয় ছবি, হালের বলিউডি নানা আইটেম সং...কোথায় নারী যৌনবস্তু নয়? আফসোসটা ত’ এখানেই। পুরনো দিনের হলিউডি ছবিতে গ্রেটা গার্বো থেকে মেরিলিন মনরো হয়ে আজকের এ্যাঞ্জেলিনা জোলি বা বলিউডি ছবিতেও মধুবালা-মীনা কুমারী-নার্গিস থেকে শুরু করে হেমা মালিনী-রেখা-মাধুরী দীক্ষিত-কাজল-কারিশমা-কারিনা হয়ে হালের দীপিকা পাডোকোনরা অব্দি নারীচরিত্রগুলো সিনেমায় পুঁজি ও পুরুষাধিপত্যের শর্ত মেনে পুরুষের ‘যৌন বস্তু'ই বটে; তবু দুই থেকে তিন ঘন্টার একটি সিনেমায় যেহেতু একটি গল্প বলতেই হয় এবং একই গল্প মানুষ বারবার দ্যাখে না, কাজেই নায়িকা চরিত্রেও অনেক শক্তিময়তা বা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও আনতে হয়। হলিউডে ত’ নায়িকারা পুলিশ, গোয়েন্দা, নভোচারীসহ নানা ধরণের চরিত্রেই অভিনয় করে। বলিউডেও শিক্ষিকা বা আইনজীবীসহ নানা চরিত্রেই নায়িকাদের বাধ্য হয়েই আনতে হয়, সে যতোই তিন ঘন্টার ভেতর দেড় ঘন্টা সমুদ্র সৈকতে বা বৃষ্টিতে নায়িকাকে নাচতে হোক। যেহেতু এ পৃথিবীতে মানুষ যতো দিন যাচ্ছে ততো ব্যস্ত হচ্ছে...গল্প-উপন্যাস পড়া দূরের কথা, তিন ঘন্টার একটি সিনেমাও দেখার সময় করতে পারে না অনেকে...কাজেই আসছে ‘আইটেম সং’ বা ‘মিউজিক ভিডিও’ আর তিন ঘন্টার ‘মেইল গেইজে’র রসদ একটি গানেই ঠেসে দেওয়া হচ্ছে। আমি যেহেতু পাঞ্জাবি বুঝি না, গুগলে সার্চ দিয়ে প্রথমে রোমানে পাঞ্জাবিতে বাদশার মূল গানের লিরিকস এবং ইংরেজিতে তার অর্থ এখানে বাংলায় তুলে দিচ্ছি। তারপর মূল বাংলা গানের অসামান্য লিরিকস ও তার পেছনের এক দরিদ্র, কুমারী মায়ের জীবনের বঞ্চণার গল্প তুলে ধরব ‘নারী’র পাঠকের জন্য।

বাদশা-পায়েল-জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের এই গানে শুরুতে বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গা পূজার সময়ের চিরায়ত লাল-সাদা শাড়িতে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা সিংহলী জ্যাকুলিনকে দেখা যাচ্ছে পূজার ধুনুচি হাতে। যদিও বাঙ্গালিনীরা বাস্তবে তো শাড়িটা এত খোলামেলা বা অনাবৃত ভাবে পরতে পারেন না। অনেক রেখে-ঢেকেই পরতে হয়। প্রচুর নর-নারীর ভেতরে লরা মালভির সূত্র মেনেই ‘নায়ক’ তথা গায়ক বাদশা ঢোকেন। নায়িকার দিকে কামুক চাহনীতে বারবার জিহ্বা বের করে তিনি ইঙ্গিত করছেন। এরপর জ্যাকুলিনকে দেখা যায় স্বচ্ছ শিফন বা জর্জেটের সাথে আরো অনাবৃত কাঁচুলিতে। বাদশা ও জ্যাকুলিনকে আরো দেখা যায় খুবই ঘনিষ্ঠ কিছু শরীরী বিভঙ্গে। সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে গানের পাঞ্জাবি লিরিকস। এখানে পাঞ্জাবি লিরিকস বাংলা হরফে তুলে দিচ্ছি এবং সাথের ইংরেজি অর্থ বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছি:


‘চলে যব তু লাটক মাটক,

লন্ডো কে দিল পাটক পাটক,

স্যানসেইন জায়ে আটক আটক,

আটা মাঝি সাটক সাটক

(ও মেয়ে, তুমি হাঁটো এমন ঢঙ্গে

যা হৃদয় ভাঙ্গে এ্যাতো এ্যাতো ছেলের,

শ্বাস নিতে কষ্ট হয় যে খুব,

আমার মনে কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই)

বাম তেরা গোতায় খায়ে,

কমর পে তেরি বাটারফ্লাই,

বডি তেরি মাখখাম জ্যায়সে,

খানে ম্যায় বাস তু বাটার খায়ে।

(তোমার কোমর দুলছে

যেথা আঁকা এক প্রজাপতি,

তোমার ত্বক ত’ যেনো মাখন মাখন,

তুমি খাও কি শুধুই মাখন?)

কাম অন বেবি কিক ইট, কিক ইট,

কাটুন তেরি টিকেট টিকেট,

খেলতা নাহি ক্রিকেট উইকেট,

পার লেহা তেরি উইকেট উইকেট,

(কাম অন বেবি! কিক ইট!

আমাকে পেতে দাও একটি টিকিট,

আমি ত’ খেলি না ক্রিকেট একদম,

তবে পেতে চাই তোমার উইকেট)।

বড় লোকের বেটি লো, লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথায় বেন্ধে দেব লাল গেন্দা ফুল।

সানওয়ালা সা রং তেরা,

বাওলা সা ঢং তেরা,

মুঝসে চোরি চোরি বাতেই কারে,

অঙ্গ অঙ্গ তেরা।

তেরি লিয়ে কুছ ভি কর লুঙ্গা,

তেরি ম্যায় হার লুঙ্গা কই ভি পীড়া,

(ওহ মেয়ে, তোমার এমন ত্বক,

আর এমন রূপ,

কথা বলে তোমার প্রতিটি অঙ্গ,

সবকিছু করবো যেনো না পাও পীড়া!)

ইয়ে! পাগল হুয়া তেরে পিছে,

য্যায়সে দিমাগ ম্যায় কিরা,

লাগ গ্যায়ে মিঠি য্যায়সে শক্কর শক্কর,

আজা চলা লে চক্কর চক্কর,

বাকি কে লন্ডে বাগার-বাগার!

(আমি খুব মন্দ, আমি খুব মন্দ!

তাই পাগল হলাম তোমার জন্য,

তুমি ত’ মিষ্টি যেন চিনির টুকরো,

চলো ভালবাসি, এক্ষুনি চলো,

অন্য ছেলেরা নয় একটুও ভাল,

যখন কিনা আমি সুন্দর এ্যাতো,

হৃদস্পন্দন হচ্ছে যে বন্ধ।

আমাকে নিয়ে চলো আকাশে, ও মেয়ে!

তোর চোখ দেখলেই হৃদস্পন্দন বন্ধ,

তোর প্রেম নেবে আমায় সপ্তম স্বর্গে,

প্রতিশ্রুতি দেই তোকে কাঁদাব না কোনোদিন,

প্রতিশ্রুতি দেই প্রিয়া কাঁদাব না কোনোদিন,

তুই আমার জীবন, নয় এ মিথ্যে),

যব তু লুক ম্যায় ইন দ্য আই,

লাভ তেরা বেবি মুঝে

(তুই যখন তাকাস আমার চোখে,

ভালবাসি তোকে, খুকি আমার!)

বড় লোকের বেটি লো, লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথায় বেন্ধে দেব লাল গেন্দা ফুল।

গানটির সংযোজিত লিরিকসে কি অশালীন সব শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে তা তো আপনারা দেখছেনই। মেয়েটি একটি চিনির দলা বা টুকরো, তার ত্বক মাখনের মতো, কোমরের কাছে প্রজাপতি আঁকা (মিউজিক ভিডিওতে জ্যাকুলিনের কোমরে প্রজাপতি আঁকা), ছেলেটি জীবনেও ক্রিকেট না খেললেও মেয়েটির উইকেট চায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অশালীন গান অনুবাদের কোনো ইচ্ছা আমার ছিলো না। তবে নারীর প্রতি অসম্মান ও অসংবেদনশীলতা কোন পর্যায়ের হতে পারে, সেটা বুঝতেই গুগলে গিয়ে পাঞ্জাবি পংক্তিগুলোর ইংরেজি থেকে বাংলা করতে হলো।

এবার তবে মূল বাংলা গানের লিরিকস ও সেই লিরিকসের রচয়িতা কেনো এমন গান লিখেছিলেন সেটা বলি? মূল গানের লিরিকস দেখুন। সত্তরের দশকে পশ্চিম বাংলার গায়িকা স্বপ্না চক্রবর্ত্তী রতন কাহারের কথা ও সুরে গাইছেন,

বড় লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথায় বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল,

বড় লোকের বিটি লো লম্বা লম্বা চুল,

এমন মাথা বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল,

এমন মাথা বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল।

দেখে ছিলাম শরানে ওরে শরানে

দেখে ছিলাম শরানে ওরে শরানে,

আমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে

আমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে,

বড় লোকের বিটি লো লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথা বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল।

ওরে লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে,

লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে,

ভালোবাসা দাঁড়িন ছিল মাথার সিঁথেনে,

ভালোবাসা দাঁড়িন ছিল মাথার সিঁথেনে।

বড় লোকের বিটি লো লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথা বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল।

ওরে যা কেনে কোথা যাবি ওরে ও যাবি

যা কেনে কোথা যাবি ওরে ও যাবি,

দু'দিন পরে আমার ছাড়া আর কার বা হবিি

দু'দিন পরে আমার ছাড়া আর কার বা হবি

বড় লোকের বিটি লো লম্বা লম্বা চুল

এমন মাথা বেঁধে দুবো লাল গেন্দা ফুল।

এই গানের গীতিকার ও সুরকার রতন কাহার কোথা থেকে পেলেন এমন গানের ভাবনা? বীরভূম অঞ্চলের এক দরিদ্র, কুমারী মা তার ফুটফুটে ছোট মেয়েকে দেখিয়ে বলেছিল যে মেয়ের বাবা তাকে ফেলে চলে গেলেও আসলে বাচ্চাটি ত’ বড়লোকেরই বটে। তাই তার এমন ফুটফুটে রূপ! গানটির চারটি পংক্তিই এতোদিন জানতাম। আজ পুরো গানটি এক বান্ধবীর ফেসবুক শেয়ারে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। পরিত্যক্তা, কুমারী মা অতীতে বড়লোক প্রেমিকের সাথে দেখা করার স্মৃতি মনে করছেন?

দেখে ছিলাম শরানে ওরে শরানে

দেখে ছিলাম শরানে ওরে শরানে,

আমার সঙ্গে দেখা হবে বাবুর বাগানে 

ভালোবাসা দাঁড়িন ছিল মাথার সিঁথেনে,

ভালোবাসা দাঁড়িন ছিল মাথার সিঁথেনে।

মনে পড়ে যায় পুশকিনের অমর কালজয়ী কাব্যনাটক যেখানে জিপসী মেয়ের সাথে রাজপুত্রের প্রেম হয় ঠিকই তবে পরে রাজপুত্রকে তো বিয়ে করতেই হয় এক রাজকন্যাকে। কালীদাসের ‘অভিজ্ঞানা শকুন্তলা’তেও সন্তানের পিতৃ পরিচয় নিতে পলাতক রাজা দুষ্মন্তের বিস্মৃতির সাথে বহুদিন লড়াই করতে হয় অরণ্যচারিনী শকুন্তলার। তারপর? তারপর কী হলো? কলিজাচেরা এই কয়টি পংক্তির পর ফিরে আসছে পরিত্যক্তা, কুমারী মায়ের আশাবাদ যে হয়তো একদিন প্রেমিক বা তার প্রেম তথা শিশুটির বাবা তার কাছে ফিরে আসবে:

‘ ওরে যা কেনে কোথা যাবি ওরে ও যাবি

যা কেনে কোথা যাবি ওরে ও যাবি,

দু'দিন পরে আমার ছাড়া আর কার বা হবি।

আশা ছাড়া কি নিয়েই বা বাঁচে মানুষ? এক অসামান্য করুণ ও মানবিক, নারীবাদী এই লোকগানের (তৃণমূলের এক সিঙ্গল মাদার বা একাকী মায়ের সাহস ও লড়াইয়ের প্রতিস্পর্ধা লক্ষ্য করুন- আবার প্রেম বা জীবনের সৌন্দর্যের প্রতি আশাও সে হারিয়ে ফ্যালেনি এত বঞ্চণার মাঝেও) কী ভয়ানক ও কুশ্রী বাণিজ্যিকায়ণ সম্ভব হলো তাই ভাবছি! রতন কাহার আর স্বপ্না চক্রবর্ত্তীর স্বীকৃতি মিলল কি মিলল না তা’ আরো পরের কথা।

তবে হতাশার জায়গা এটাই যে আমাদের মতো কয়েক জনের লেখা বা বলায় কিছু আসবে যাবে না। পৃথিবীতে আজো নারী দরিদ্র। সম্পদের মালিকানা, পুঁজির মালিকানা মূলত: পুরুষেরই হাতে। কাজেই বিনোদন বলুন, শিল্প-সাহিত্য বলুন, সবখানে পুরুষই আজো কর্তা বা ভোক্তা। যতোদিন সে কর্তা বা ভোক্তা, ততোদিন তার চাহিদা বা তার বাসনাই কর্তৃত্ব করবে। তার চাওয়ার নিক্তিতেই নারীর ‘পন্যায়ণ’ চলতেই থাকবে। অভিনেত্রীরা হয়তো একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে পারেন। তবে তেমন কোনো চাওয়ার লক্ষণ এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।


  • ৬০৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট