নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৮

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ৬, ২০২০ ৩:৫৭ AM | বিভাগ : সাহিত্য


১৯৬০, ফেমিনিস্ট পর্বঃ সাহিত্যে নারীত্বের সংজ্ঞায়নঃ

১৯৬০ হতে অদ্যাবধি প্রবহমান এই ফেমিনিস্ট পর্বে এসেই নারীবাদীদের মধ্যে মতভেদ তীব্র হয়ে উঠেছে। মেয়েরা কী লেখবে কী লেখবে না, কীভাবে লেখবে, কেনো লেখবে এসব নিয়ে তর্ক চলছে যেমন, তেমনি সাহিত্যে ‘নারীসত্বা’-র সংজ্ঞায়ন নিয়েও চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোন ধরনের লেখাকে ফেমিনিস্ট বলবো? অথবা কোনো একটি বিশেষ লেখা মেয়েদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় বলেই কি তাকে ‘নারীবাদী’ লেখা হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে? রোজালিন্ড কাওয়ার্ড ও মিশেল ব্যারেট, এই দুই সাহিত্য গবেষক অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এর উত্তর দিয়েছেনঃ না। নারী রচিত বা নারী কেন্দ্রিক লেখা হলেই তা’ খুব কিছু নারীবাদী হয়ে যায় না। হাজার হাজার কর্মজীবী, ‘ভগ্ন গৃহ’ মহিলারা গোগ্রাসে পাঠ করছেন মিলস্ অ্যান্ড বুনস্, হার্ক্যুইলিন্স ও গথিক রোমান্সের কাহিনী। এইসব প্রকাশনা সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে সিরিজের পর সিরিজ প্রকাশ করে চলছেন হরেক রকমের রোমান্স বা প্রণয়োপখ্যান। কাহিনীর ছক প্রায় এক ও অপরিবর্তিতঃ

সুন্দরী/স্বল্পবয়স্কা/স্বল্প আয়/ কুসুম কোমাল কর্মজীবী নায়িকা অফিসে ‘ব্রোঞ্জমানব’ ও বয়স্ক বসকে দেখে শিহরিত হলো প্রথম দর্শনেই। এর পরপরই হুড়মুড় করে ঘটে যায় ঘটনা--- যা দু’জনের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে চলে। এ সবই অবশ্য পাঠকের কৌতুহলকে উস্কে দেবার জন্য। কারন, শেষটাতে তো নিঃসঙ্গ, ম্যাচিওরড ও শক্তিশালী নায়ক, অপরিণত ও উচ্ছ্বল নায়িকার আঙুলে পরিয়ে দেবে ম্যারেজ রিং। এর মাঝে অবশ্যই নায়ককে মুগ্ধ হতে হবে নায়িকার পোশাকে, রন্ধনক্ষমতায়, হাসপাতালে রোগী আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি নিবেদিত শুশ্রুষায়।”

যা হোক, এসব লেখাকে তো আর নারীবাদী আখ্যা দেয়া যায় না। কোনো লেখাকে নারীবাদী হতে হলে সেটিতে আবশ্যিকভাবে কিছু “রাজনৈতিক উপাদান” থাকতে হবে। প্রশ্ন হতে পারে, কী এই “রাজনৈতিক উপাদান”? কোন্ ধরণের রাজনীতির কথা এখানে বলা হচ্ছে? নিঃসন্দেহে রিগান-গর্বাচেভ শান্তি আলোচনা বা ভারত-বাংলাদেশ পানি সম্পদ আলোচনার রাজনীতির কথা এখানে বলা হচ্ছে না। এই রাজনীতি শারীরবৃত্তীয় রাজনীতি। দুর্বল লিঙ্গের ওপর সবল লিঙ্গের উৎপীড়ন, গায়ের জোরে মানব প্রজাতির একটি অংশ দ্বারা অপর অংশকে পৃথিবীর যাবতীয ভোগ, সম্পদ, স্বচ্ছলতা ও আনন্দ হতে বঞ্চিত করে রাখা। ‘লৈঙ্গিক রাজনীতি’ কথাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন কেইট মিলেট তার ‘Sexual Politics (১৯৭০) গ্রন্থে। লৈঙ্গিঁক রাজনীতির তীক্ষ্ম প্রতিফলন-বিশিষ্ট লেখাসমূহকেই আমরা নারীবাদী লেখা হিসেবে সনাক্ত করবো। তবে একইসাথে লক্ষ্য রাখতে হবে চড়াদাগের রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে যেয়ে লেখা যেনো তার শিল্পমান না হারায়। তলস্তয়ের “আন্না কারেনিনা” সেই অর্থে হয়তো নারীবাদী নয়, ‘ডলস হাউসে’-র নোরার মতো সোচ্চার ঘোষণাও দিতে পারেনি সে... তবু ট্রেন লাইনের নিচে আন্নার মাথা পাতার শেষ দৃশ্যটির পাশে পৃথিবীর কয়টি ঘোষিত নারীবাদী লেখা দাঁড়াতে পারে? অথবা আমাদের বাংলা সাহিত্যের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-র কুসুম? বিদূষী ও নাগরিক নারীবাদীকে হেলায় হারাতে পারে সে তার ইচ্ছা প্রকাশের অকপটতায়, তার শরীর আকাঙ্খার উজ্জ্বল বিন্যাসে:

আপনার কাছে এলেই আমার শরীর এমন করে কেনো ছোট বাবু?

`শরীর-শরীর। তোমার মন নাই কুসুম?”

যা হোক। নারীবাদী লেখার সংজ্ঞায়নে বা ঘুরিয়ে বললে কোন ‘লেখা’বা টেক্সটের নারবাদী সত্ত্বা নির্ধারনে প্রচলিত তত্বগুলো সংক্ষেপে নিচে গ্রথিত হলো।

১। অনুজ্ঞামূলক সমালোচনা (Prescriptive Criticism): ): চেরি রেজিষ্টার ও ওয়েন্ডি মার্টিন এই তত্বের প্রণেতা। তাঁদের ভাষ্যমতে, নারীবাদী টেক্সট রচিত হতে হবে লেখিকাকে এমন নারীচরিত্র উপস্থাপন করতে হবে যে খুব শক্ত ও দৃঢ়, কোন ভাবাবেগ তাকে ভাসায়না এবং চরিত্রের সঙ্কট ও উত্তরনের অভিজ্ঞতা পাঠের মাধ্যমে অজস্র পাঠিকা তাদের জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে পাবে। মজার ব্যাপার হলো নারী লেখকদের মধ্য থেকেই তুমুল প্রতিবাদ উঠেছে এই তত্বের। এলিজাবেথ বেইন, এলিসন লাইট, কোরা কাপলান কিম্বা এলিজাবেথ উইলসন বলেন, চাপিয়ে দেয়া তত্বমতে কোনোভাবেই একটি লেখা প্রস্তুত করা যায় না। সত্যিকারের লেখক চরিত্রগতভাবেই অদৃশ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। যেহেতু প্রকৃত লেখা থেকে উদ্ধার করা যবে “বহুবিধ পাঠ”(Plurality of Reading)। সরল/একরৈখিক লেখা, সংবাদভাষ্য বা কূটনীতিকের মতো যা স্থির ও অবিচল-নারী পাঠকদের হতাশও করে তুলতে পারে। কোথায় তার নিজ চরিত্রের ভুল-ভয়-গ্লানির প্রতিফলন? এতো এক লৌহমানবীর আখ্যান! উদাহরণ হিসেবে, পশ্চিম বাংলার লেখক সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপাবলী-র কথা উল্লেখ করা যায়। আমার অজস্র বান্ধবীর মুখে আমি শুনেছি, দীপাবলী তো মানুষ নয়, একটা রোবট! দীপাবলী হাসে না, কাঁদে না, ভয় পায় না কিম্বা প্রেমে পড়ে না। শুধু যুদ্ধই করে। ফলতঃ সমরেশের যাবতীয় সদিচ্ছা ও নারীর প্রতি ইতিবাচক রাজনীতি থাকা সত্বেও চরিত্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। পাশাপাশি, রোকেয়ার পদ্মরাগের সিদ্দিকা নারীবাদী হয়েও মানবী। রোবট নয়।

চেরি রেজিষ্টারের তত্ব যেনো মার্ক্সবাদীতারই নামান্তর। তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য যেমন শ্রমজীবি জনগণের মুক্তি সাধনে তৎপর, এ তত্ব অনুসারে লেখক চেষ্টা করেন ভগ্নীত্ববোধ বাড়াতে। কোরা কাপলান ও এলিজাবেথ উইলসনের মতে এটি হলো নারীবাদী তত্বের উপর রোমান্টিক নান্দনিক তত্বের প্রশ্নযোগ্য প্রভাব যা লেখককে লেখার অর্থময়তার সচেতন, ধ্রব ও বৈজয়ন্ত উৎসধারা বলে মনে করে। কিন্তু লেখাকে অর্থময় হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। এমন যে কেট মিলেট ÒSexual Politics” - এর প্রবক্তা, তাঁর ‘সীতা’ উপন্যাসে কিন্তু সেই অর্থে নারীবাদী রাজনীতি অনুপস্থিত।

শুধু কঠোর নারীচরিত্র সৃষ্টিই নয়, চেরি রেজিষ্টার আরো জোর দেন, . লেখাটি যেনো মেয়েদের জন্য একটি ফোরাম বা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। ২. একটি নির্দিষ্ট ‘সাংস্কৃতিক androgyny’ তৈরীতে সহায়তা করে। ৩. ভগ্নীত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সঙ্গত কারণেই তাই একটি যথার্থ নারীবাদী লেখাকে হতে হবে পুরুষালী অনুষঙ্গের প্রভাবমুক্ত (এলেন মর্গ্যান)। একজন নারীর জীবৎকালীন যাবতীয় অভিজ্ঞতা স্বভাবতঃই পুরুষের থেকে আলাদা। কিন্তু মুস্কিলটা বাধে তখনি যখন প্রচলিত সাহিত্যক মূল্যবোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে নারী লেখকরা পুরুষালী মূল্যমান অনুকরণ করেন।

যাহোক, রেজিষ্টার জীবনে বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে চাইলেও হুবহু বা ফটোকপি বাস্তবতা চান না। বরং ‘নারী জীবন হতে উদ্ভুত পুরাণের কথন শুনতে চান নারী কথকদের মুখ থেকেই”। নারীবাদী শিল্পকলা বা সাহিত্যকে নিশ্চিতভাবেই নারীজীবনের নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে উল্লেখ করতে হবে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রণীত ‘Female Studies’ সিরিজের গ্রন্থগুলো এই অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যের উপর জোর দিচ্ছে। যেমন, টিল্লি ওলসেনের “Women”; A List Out of Which to Read” বিভিন্ন বয়স, শ্রেণী ও বর্ণের নারীদের লেখার সঙ্কলন প্রকাশ করছে। যাতে করে “নারী অভিজ্ঞতা”র সমগ্রতা পরিষ্ফুট হতে পারে। আর এভাবেই নারীবাদী সাহিত্য একটি নির্দিষ্ট ফোরামের রূপ পরিগ্রহ করতে পারবে এবং ‘সাংস্কৃতিক andro-gyny” গ্রন্থে উল্ফ-উদ্ভাবিত ‘সাংস্কৃতিক androgyny’ শব্দটি পুনরায় চালু করেন। শুলামিথ ফায়ারস্টোনের ভাষ্যে, এ জাতীয়‘androgyny’ একটি যৌনবিকৃত সংস্কৃতির সংশোধনে কার্যকর হবে। মার্কিন দেশের বর্তমান নারী আন্দোলনগুলো বর্তমানে তাই চেষ্টা করছে মেয়েদের মধ্যে স্বজাত্যবোধ বৃদ্ধি, মেয়েদের নিজেদের ভেতর পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতা দূরীভূত করার জন্য।

পুনরায় উল্ফের দ্বারস্থ হওয়া:

শোলে অলিভিয়াকে পছন্দ করতো- আমি পড়লাম। আমি বিস্মিত হলাম। কী বিশাল পরিবর্তনই না ঘটে গেছে। এই প্রথম সাহিত্যে কোনো মেয়ে অপর একটি মেয়েকে পছন্দ করলো। ক্লিওপেট্রা অক্টোভিয়াকে পছন্দ করতো না। যদি করতো তাহলে গোটা এ্যান্টনী এবং ক্লিওপেট্রা আখ্যানটি কী ভয়ানক বদলে যেতে পারতো।” (চলমান... )

(সপ্তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(ষষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(পঞ্চম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ৩৪৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট