নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৭

শুক্রবার, জানুয়ারী ৩১, ২০২০ ৩:৪৬ AM | বিভাগ : সাহিত্য



(পূর্ব প্রকাশিতের পর) কবিতায় মেয়েদের ব্যর্থতার আর একটি প্রধান কারণ হলো কবিতা দাবী করে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর অটল ও ধ্যানবদ্ধ সময়। বাংলাসাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক প্রভাবতী দেবী সরস্বতী বা আশাপূর্ণা দেবী যেমন ঘর-গেরস্থালীর ফাঁকে ফাঁকে উপন্যাস লিখেছেন, কবিতা অমন ফাঁকে ফাঁকে লিখবার বিষয় নয়।

ভার্জিনিয়া তাঁর ÔA Room of One’s Own’-এ আরো জানাচ্ছেন যে, রেনেসাঁ উত্তর ইউরোপে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ঘরে আরামপ্রদ বসার ঘর থাকতো মাত্র একটি। এখানেই অতিথি-অভ্যাগতরা এসে বসতেন। সাংসারিক নানা দায়-দায়িত্ব সেরে নারী লেখকরা ঐ বসার ঘরে বসেই লিখতেন।

স্বয়ং জেন অস্টেনের কোনো নিজস্ব পাঠকক্ষ ছিলো না। বসার ঘর বসে তাকে লিখতে হতো। যাবতীয় ব্যাঘাত মেনেই। ভার্জিনিয়া তাই অবাক হন কী করে ১৮০০ সালে জেন অস্টেন, সমাজ যাকে কখনো ঘরের বাইরে বের হতে দেয়নি, তিনি কোনোদিন একা একটি ক্যাফেতে বসে কিছু খেতে পারেননি, কোনোদিন বাসে চাপেননি... এতোসব অবদমনের মুখেও তিক্ততা, ভয়, প্রতিবাদ, ঘৃণা বা প্রচারের উর্দ্ধে উঠে “প্রাইডি এ্যান্ড প্রেজুডিসে’র মতো শিল্পমানসম্পন্ন বই লিখলেন? এইসব জেন অস্টেন ও শার্লট ব্রন্টিদের চেয়ে কে বেশি জানতেন যে দিগন্তের ধূ ধূ মাঠের দিকে তাকিয়ে দিন পার করে দেবার চেয়ে তাদের যদি ভ্রমণ বা বৃহত্তর সামাজিক মেলা-মেয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, তবে তাদের প্রতিভা কী পরিমাণেই না বিচছুরিত হতে পারতো।

আবার পুরুষ সমালোচকরা নারী লেখকদের লেখাকে একদিকে যেমন ‘গার্হস্থ্য’ লেখা বলে বিদ্রুপ করতে থাকেন, তেমনি নারী লেখকরা যখন সত্যি সত্যি বৃহত্তর সমাজ-রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে লেখায় টেনে আনেন, তখন তাদের লেখায় সমালোচকরা ‘রুক্ষতা’ খুঁজে পান। আমি সত্যিই বিস্মিত না হয়ে পারি না যখন আহমদ ছফার মতো মনস্বী লেখক মহাশ্বেতা দেবীর লেখা সম্পর্কে বলেনঃ “... লেখার কিছু নিজস্ব কোয়ালিটি থাকা দারকার, যা মহাশ্বেতার লেখায় অনুপস্থিত।” পাশাপাশি তিনি মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ সম্পর্কে বলেছেন যে এই সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভেতরে কালজয়ী হয়ে টিকে যাবার মতো সাহিত্যকর্ম (দেখুন সাক্ষাৎকার, আহমদ ছফা বললেন ১৯৯৬)। মৈত্রেয়ীর ‘ন হন্যতে’ বেশ মিষ্টি একটি প্রেম-কাহিনী, যা পড়ে টিন-এজ বয়সে আমি প্রচুর কান্না-কাটি করেছি। কিন্তু, মহাশ্বেতার ‘অরণ্যের অধিকার’ ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’, ‘অপারেশন বসাই টুডু’ কিম্বা ‘নৈর্ঝতে মেঘে’র পাশে পাশে ‘ন হন্যতে’ তো দাঁড়াতেই পারে না। আসলে শ্রদ্ধেয় আহমেদ ছফা যতোই তাত্বিক হোন না কেনো, মনের অবচেতনে আজো নারী লেখকের প্রতি তার প্রত্যাশাটি পুরুষের ‘প্রেমিকার হাতে মিষ্টি প্রেমপত্রের প্রত্যাশা’-ই রয়ে গেছে। অরণ্যের কুঁড়েবাসী শবরের গন্ধবাহী নারী লেখক কী করে ‘মিষ্টি প্রেমিকা’ হবেন? একইভাবে হ্যারিয়েট বেকার স্টে তাঁর Uncle Tom’s Cabin উপন্যাসের জন্য ‘রুক্ষতা’-র অভযোগে অভিযুক্ত হন।

কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের স্ত্রী এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং ছিলেন তাঁর সময়ের অত্যন্ত প্রশাংসিত কবি। সমালোচকরা তার লেখার ‘কোমলতা, নারীসুলভ প্রণয়- আখ্যানের ভক্ত ছিলেন, আরো ভক্ত ছিলেন তার ‘ব্যক্তিগত পরিগত প্রাণা, শুদ্ধ ও প্রেমময় জীবনযাপনের জন্য’। অথচ এই ব্যারেট ব্রাউনিংই যখন “Poems Before Congress” (১৮৬০) বা “Aurora Leigh” -এর মতো রাজনৈতিক কবিতা ও কাব্য রচনায় মনোনিবেশ করলেন, তখন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ সমালোচকরা তাকে ‘উন্মাদনাগ্রস্থ’ আখ্যায় অভিহিত করলেন। আজ ব্যারেট ব্রাউনিংয়ের পরিচয় শুধুই “Sonnets From The Protuguese” (১৮৫০)-এর কবি বলে। বিষয়ের দিক থেকে এটি হলো স্বামীকে লেখা প্রবাসী স্ত্রীর প্রণয়মূলক লিরিক গুচ্ছ। শুধু নারীর রচনা নয়, নারীর ব্যক্তি জীবনের প্রতিও পুরুষ সমালোচকদের অসীম আগ্রহ। এক তসলিমার ব্যক্তি জীবন নিয়ে কত টক-ঝাল-মিষ্টি সংবাদই না পরিবেশিত হলো। অথচ পুরুষ কবি বা শিল্পীদের আত্মজীবনীতে “কবির জীবনে সেসব নারীরা এসেছিলেন” শিরোনামে অগণিত নারীর নাম তালিকা, বংশ বিবরণ আমাদের মুখস্থ করতে হয়। এমন যে শারীরিক দুর্ভাগ্যপীড়িত বিজ্ঞানি স্টিভেন হকিন্স - মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে সহপাঠিনী তাকে বিয়ে করে ক্লান্তিহীন সঙ্গ দিয়েছেন জীবনের প্রথম দুই দশক, বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বখ্যাতি অর্জনের পর বিয়ে করলেন অন্য এক নারীকে। তবে পুরুষের ক্ষেত্রে এসবই তো ‘প্রতিভার স্বাভাবিক ধর্ম।

১৮৮০---১৯৪০ খ্রীঃ [Feminist পর্ব] মেরি শেলীর হাতে বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ‘সায়েন্স ফিকশন’ রচনা

উপন্যাস লিখতে মেয়েরা তুলনামূলকভাবে যতো স্বাচছন্দ্যই বোধ করুক না কেনো- অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, উপন্যাসও সাহিত্যের অন্য আর দশটা শাখার মতোই ‘রিযেলিজম’ ও ন্যারেটিভ নির্ভর। এই প্রকরণ প্রথম ভেঙ্গে ফেল্লেন মেরি শেলী(১৮১৮)। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। গোটা বইটিতে একটি শক্ত ন্যারেটিভ লাইন নেই (যা পুরুষালি টেক্সটেরই নামান্তর)। ভাঙচুর। ইতস্ততঃ অসম্পূর্ণ সব লাইন... যা কর্তৃত্ব ও নিশ্চয়তাব্যঞ্জক সব পুরুষালি লাইনকে ধ্বংস করে। মেরি ওলস্ট্যানক্র্যাফট ও উইলিয়াম গডউইনের কন্যা এবং পার্সি বিশি শেলীর প্রথমে সঙ্গীনী ও পরে স্ত্রী হলেন মেরি শেলী। ল্যাটিন ও গ্রীকসহ পাঁচটি ভাষায় গোগ্রাসে পাঠ করেছেন তিনি। ষোল বছর বয়সে গর্ভবতী হন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর ধারাবাহিকভাবে অন্তসত্বা হন। অধিকাংশ সন্তানই জন্মের পর গেছে মারা এবং তিনি আঠারো বয়স পর্যন্ত ছিলেন অবিবাহিত, অস্বীকৃত এক মা। এসময় তিনি ফ্রাঙ্কেনস্টাইন লেখা শুরু করেন। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বাহ্যিকভাবে সায়েন্স ফিকশন হলেও বক্তব্য প্রখরতম নারীবাদী। একটি জন্মকে ঘিরে যাবতীয় পাপবোধ, ঘৃণা ও আতঙ্কের শৈলীকে প্রদর্শন করাই এ আখ্যানের আধেয়। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের creator বিজ্ঞানী কেনো ঐ যন্ত্রদানব সৃষ্টি করেছিলেন? নোংরা এক কারখানায় বসে? কসাইখানা ও মর্গ হতে আনা মানবশরীরের বিভিন্ন অংশ আর হাড়গোর দিয়ে এই বিজ্ঞানী একটি বিশাল দৈত্যাকৃতি কাঠামো তৈরি করেন যার উপর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য (“I thought that if I could bestow animation upon lifeless matter, I might in process of time renew life where death had apparently devoted the body to corruption”) |

ফাঙ্কেনস্টাইনের Creator বিজ্ঞানীর মুখে এই সংলাপ আসলে অনেকগুলো মৃত সন্তানের জননী মেরীর অন্তর্গত নিঃস্বতারই বহিঃপ্রকাশ।

মেরীর আর একটি অনবদ্য রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি হলো The Last Man| এক ভয়াবহ প্লেগে পূর্ব ও পশ্চিমের Empire গুলো ভেঙ্গে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। ভার্ণি -পৃথিবীর শেষ জীবিত মানব -ধ্বংস হতে থাকা সংস্কৃতিগুলের জন্য আক্ষেপ করছে। বস্তুতঃ এই ধ্বংস ও পতন পুরো পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতারই পতন। বক্তব্যের দিক থেকে The Last Man এমনকি Coleridge- এর “Ancient Mariner”- এর এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী। শার্লট ও এমিলি ব্রন্টি, এলিজাবেথ গাস্কেল, ক্রিস্টিনা রোসেত্তি, আইজ্যাক দিনসেল, কর্সন ম্যাককুলার্স, সিলভিয়া প্লাথ, এ্যাঞ্জেলা কার্টার প্রত্যেকেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে দ্রোহ প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে ফ্যান্টাসি ব্যবহার করেছেন। মূলতঃ ১৮৩৬-১৯২০ পর্ব পুরোটাই ছিলো মেয়েদের হাতে সায়েন্স ফিকশন ও ইউটোপিয়া রচনার যুগ। নারীর শ্রম ও যৌনতার ওপর পুরুষের আধিপত্য নিরোধের পন্থা হিসেবে এই ফ্যান্টাসিগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাধীন জীবিকা, স্বতন্ত্র বাসস্থান, চাইল্ড কেয়ার সার্ভিস, বিবাহের জরুরী শর্ত হিসেবে পুরুষের শিশুপালন শিক্ষা প্রভৃতি সমাধান দেয়া হয়।

বলাবাহুল্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এজাতীয় ইউটোপিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব মূর্তি লাভ করে। এর মধ্যে গারট্রুড ব্যারোজ বেনেট রচিত ‘Friend Island’(রচনা, ১৯১৮) এ ১৯৭০ এর দশকে তোলা নারীবাদীদের বহু রণকৌশল যেমন, গার্হস্থ্য শ্রম ও শিশুপালনের মজুরী দাবি, মানুষের সাথে পশু-পাখি, উদ্ভিদ ও ধরিত্রীর আন্তঃসম্পর্ক...ইত্যাদি নানা বিষয় আলোচিত হয়। আমাদের রোকেয়াই বা কম কি? সুলতানাস ড্রিম বা তারিনীভবনের ইউটোপিয়া আরো কতো আলোকবর্ষ দূরে যে! (চলমান...)

(ষষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(পঞ্চম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ১৯৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা