নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৫

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৬, ২০২০ ১০:৩১ PM | বিভাগ : সাহিত্য


পূর্ব প্রকাশিতের পর...

নারী রচিত সাহিত্যের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক ও কালপর্বায়নঃ

প্যাট্টিসিয়া মিয়ার স্প্যাকস তাঁর "The Female Imagination” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: সহজবোধ্য, ঐতিহাসিক কারণেই মেয়েদের লেখার বিষয় পুরুষদের লেখার বিষয় হতে আলাদা। কাজ ও অবস্থানের ভিন্নতাই এই ভেদ সৃষ্টি করেছে। প্রায়শঃই দেখা যায় মেয়েরা যেসব বিষয় নিয়ে লেখে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পুরুষ লেখদের কাছে প্রান্তিক (peripheral) বিষয় বলে চিহ্নিত হয়। এর কারণটি আসলে কী? দেখা গেছে, শ্রেণী, জীবনযাত্রা ও পুরুষ আত্মীয়দের অবস্থানের উপর নির্ভরতা মহিলাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘সমাজতাত্বিকভাবে অস্থির’ (Sociological Chamleon) শ্রেণী হিসেবে তৈরী করে। সমাজে মেয়েদের অবস্থান সদা-ভঙ্গুর, সদা পরিবর্তনশীল-সমাজ, শ্রেনী ও পুরুষ-আত্মীয়ের অবস্থান বদলের সাথে সাথে তা বদলায়। এতদসত্ত্বেও বলা যেতে পারে, পুরুষ-নির্ধারিত সংস্কৃতির গন্ডীর মধ্যেই মেয়েরা তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, প্রথা, অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারের আলোকে একটি ‘সাব-কালচার’ বা উপ-সংস্কৃতিও গড়ে তুলেছে যা নারী-লেখকদের সাহিত্য ভাবনার অন্যতম মৌল উপাদান গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি এই উপ-সংস্কৃতির রয়েছে সীমাবদ্ধতা যা একজন নারী লেখকের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারে আত্ম-ঘৃণা ও পরক্যবোধ।

এখন প্রশ্ন হলো, সাব-কালচার বস্তুটি আসলে কী? সমাজের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীসমূহ সচেতনভাবেই তার জীবন প্রণালীকে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রত্যাশা ও মূল্যবোধ সভা, সন্তান লালন, গৃহজীবন এসব কিছুকেই মেয়েদের নিজস্ব সাব-কালচার বলে সনাক্ত করেছেন। মেয়েদের যৌনানুভূতি, সন্তান ধারন, প্রসব কিংবা ঋৃতুবন্ধের সহজ ও স্বাভাবিক যে চক্র সমাজে নিষিষ্ট ও গোপনীয়, তারই পারস্পরিক বেদনা ভাগাভাগি মেয়েদের নিজস্ব উপ-সংস্কৃতিটি গড়ে তোলে। সারাহ্ এলিস সর্ব প্রথম নারী লেখকদের আহবান করেন ‘যৌথ শত্রু’র বিরুদ্ধে নিজেকে সনাক্ত করতে। ছেলেদের মতো দলবদ্ধ দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, সিনেমা হলে দাঁড়িয়ে টিকিটের জন্য মারামারি করা অথবা একসাথে ক্রিকেট খেলা নয়, মেয়েদের সাব্কালচার তৈরী হয় মায়ের শেল্ফ থেকে উপন্যাস চুরি করে একে ওকে পড়তে দেওয়া, ফ্রকের লেস নিয়ে আলোচনার মতো যাবতীয় অনুষঙ্গঁ নিয়ে। আবার, কালো, ইহুদী, কানাডীয়, এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রভৃতি সাহিত্যিক সাব-কালচার গ্রুপগুলো লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে প্রতিটি সাব-কালচার গ্রুপের তিনটি প্রধান পর্যায় বা স্তর রয়েছে।

প্রথমত, প্রচলিত ঐতিহ্যের দীর্ঘ অনুকরণ,

দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং সংখ্যালঘু অধিকার ও মূল্যবোধের উপস্থাপন।

তৃতীয়ত, আত্ম-আবিস্কার ও প্রতিবাদী পরাধীনতা থেকে স্বায়ত্তশাসনের পথে অভিযাত্রা।

নারী লেখকদের সাব্-কালচার অনুযায়ী এই তিনটি স্তরকে আবার এ্যাংলো মার্কিনী ও ফরাসী, উভয় স্কুলের তাত্বিকগণই তিনস্তরে বিন্যস্ত করেছেন।:

প্রথমত, ১৭৮০-১৮৮০ খ্রীঃ (Feminine) পর্ব। এই পর্বে ইউরোপে প্রচুর সংখ্যায় নারী লেখকের উদ্ভব ঘটেছিলো। এসব নারী লেখকরা পুরুষের ছদ্মনামে লিখতেন। এ পর্বের কালপরিক্রমায় সংক্ষেপে পুরুষের ছদ্মনামে নারী লেখকদের লেখা হতে শুরু করে জর্জ এলিয়টের মৃত্যু পর্যন্ত সময়কাল ধরা হয়ে থাকে)

দ্বিতীয়ত, ১৮৮০-১৯৪০ খ্রীঃ (Female)পর্ব। ভোটাধিকার অর্জন, সায়েন্স ফিকশন রচনা প্রভৃতি নানা অর্জন ছিলো এ পর্বের বৈশিষ্ট্য)। এই পর্বে ইউরোপে প্রচুর সংখ্যায় নারী লেখকের উদ্ভব ঘটেছিলো।

তৃতীয়ত, ১৯৬০- (Feminist phase) নারীর নিজস্ব স্বত্বা উম্মোচনের দার্শনিক লক্ষ্যে প্রবহমান যাত্রা

নারী রচিত সাহিত্যের এই কাল-পর্বায়নের বিস্তারিত আলোচনার আগে নারী লেখকদের লেখার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক নিয়ে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজন।

মেয়েদের লেখার বিষয়বস্তুটি সাধারণতঃ কী ধরনের হয়ে থাকে? রচনার কোন মাধ্যমে তারা বেশি স্বচছন্দ?

পুরুষ সমালোচকদের সমালোচনার মুখে কবি এমিলি ডিকিনসন একবার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘সমালোচটকরা শুরু থেকেই ধরে নেন যে পুরুষ লেখক মাত্রই লিখবেন রণক্ষেত্রে নিয়ে আর নারী লেখকের বিষয়বস্তু হবে প্রসব”।

সত্তরের দশকের নারীবাদীরা ‘মেয়েদের লেখা’ সম্পর্কে পুরুষালী সমালোচনাতত্বের তিনটি প্রধান প্রবণতা সনাক্ত করেন।

প্রথমত, Quiller-Couch Syndrome, যা মনে করে পুরুষের লেখা হলো শক্তি-ঔদার্য স্বচছতা-শিক্ষণ-কৌশল-অভিজ্ঞতার সমন্বয়। পাশাপাশি, মেয়েদের লেখা স্রেফ ভাবালুতাপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, “The Lady Painter Syndrome’ বা ‘She Writes Like A Man Syndrome’| কানাডীয় লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউডকে একবার এক পুরুষ চিত্রকর মহিলা আঁকিয়েদের সম্পর্কে বলেন: যখন কোনো মহিলা ভাল আঁকেন তখন তিনি শিল্পী। কিন্তু যখন তিনি খারাপ আঁকেন তখন তিনি মহিলা শিল্পী’। একইভাবে কোনো মহিলা ভাল লিখলে, তাকে শুনতে হয় `তিনি পুরুষের মতো লেখেন।‘

তৃতীয়ত, Domesticity Syndrome। অধিকাংশ পুরুষেরই একটি নাক উঁচু ধারণা আছে। মেয়েরা কী লিখবে? কতোটুকু দেখেছে তারা জীবন? জীবন বলতে ত’ ওদের রান্নাঘর, বাসরঘর আর আঁতুড়ঘর। এহেন মনোভাব অবশ্য মাঝে মাঝে বেশ হাস্যরসের উদ্ভব ঘটায়। যেমন, এমিলি ব্রন্টির সাড়া জাগানিয়া উপন্যাস ‘Wuthering Heights’ যখন প্রথম বের হয়, লাজুক ব্রন্টি মলাটে নাম ছাপেননি। তখন সমালোচকেরা বেশ বেচইন হয়ে পড়েছিলেন। এই উপন্যাসের তীক্ষ্মতা, ক্রুরতা, বিষাদ, ক্ষোভ ও অন্তর্বাহী অসুস্থতায় সমালোচকেরা একজন শক্তিশালী নতুন পুরুষের আবির্ভাব-সঙ্কেত অনুভব করেন। পার্সি এডুইন হুইপল, এক মার্কিন সমালৈাচক আবিস্কার করেন, “উপন্যাসটি লিখেছেন দুই ব্যক্তি। অর্থাৎ এক ভাই ও এক বোনের হাতে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের যে অংশটি হিথাক্লিফ চরিত্রের সন্ত্রাস/প্যাশন/শুদ্ধতা ও দৃঢ়তা উম্মোচন করেছে সে অংশটুকু লিখেছে ভাই। আর উপন্যাসের যে অংশগুলোতে আরোগ্য-নিকেতনের বর্ণনা, কী পার্টিতে মেয়েদের পোশাকের নিখুঁততম বর্ণনা করা হয়েছে, সেটি লিখেছে বোন।” কি অসাধারণ অনুমানশক্তি!!

জর্জ ওয়াশিংটন পেক নামক অপর এক সমালোচক “দ্য আমেরিকান রিভিউয়ে” বইটির শক্তিমত্তা ও পৌরুষকে তুলনা করেন, ‘স্ট্যাটেন দ্বীপে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সাগরে একাকী দাঁড় টেনে চলা কোনো ইয়র্কশায়বীয় নাবিকের সমুদ্র যাত্রার কাহিনী’। যা হোক পরে ধীরে ধীরে যখন লেখকের লিঙ্গ পরিচয় উদ্ভাসিত হলো, তখন সমালোচকদের স্বর-ভঙ্গী বদলে যেতে থাকলো। বলা হলো, এ এমন এক লেখকের লেখা, বাস্তব জীবন ও চরিত্রের বৈচিত্র্য যার খুব কমই আয়ত্ব’ অথবা “বইটি বৃটিশ নারী লেখকদের রচিত গ্রন্থতালিকার কলেবর বাড়ালো।” সমালোচক সিডনি ডোবেল জানালেন, “এ যেনো এক তম্বী পাখির খাঁচায় ডানা ঝাপটানো” আর এভাবেই এমিলি ব্রন্টির লিঙ্গ-পরিচয় একই গ্রন্থকে নিঃসঙ্গ ও রুক্ষ্ম নাবিকের অভিযাত্রা হতে খাঁচায় বন্দীনী পাখির ডানা ঝাপটানোতে পরিণত করে। নারী লেখকদের বিরুদ্ধে সমালোচকদের এই সুতীক্ষ্ম আগ্রাসী মনোভাব এমনকি বর্ণগত সলিডারিটিও অনেক সময় ঘুচিয়ে দেয়। সৃষ্ণাঙ্গ লেখিকারা প্রায়ই দেখা যায় তিন ধরনের আক্রমনের শিকার হন।

প্রথমত, মেইনস্ট্রীম শ্বেতাঙ্গ পুরুষ লেখকদের সমালোচনা,

দ্বিতীয়ত, শ্বেতাঙ্গ লেখিকাদের অবজ্ঞা ও নির্লিপ্তি;

তৃতীয়ত, তিক্ততম আক্রমনটি আসে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ লেখকদের কাছ থেকেই। কারণ আর কিছুই নয়। কৃষ্ণাঙ্গ নারী লেখকদের উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ইসমাইল রীডকে তাই বলতে শোনা যায়ঃ “কৃষ্ণাঙ্গ লেখিকাদের লেখার বিষয় তো ওই একই.... হার্লেমেরে নিষ্পাপ মেয়েদের কান্নাকাটির গল্প দিয়ে আমার বই ভরাও। দ্যাখো- কেমন কাটতি!”

কথা হচ্ছিলো নারী লেখকদের লেখা প্রসঙ্গে। Domesticity Syndrome নিয়ে। ধরেই নেওয়া হয় যে, নারীমাত্রই লিখবে যেনো গার্হস্থ্য বিষয়টি নিয়ে। যেন কাপ-ডিশ ধোওয়ার গপ্পো ছাড়া মেয়েদের করার আর কিছু নেই। সিনথিয়া ওজাকের ভাষ্যে, ‘বছরের পর বছর পার হয়ে গেলো। আজ অব্দি নারীকবিদের কাব্য গ্রন্থের সমালোচনায় কবির লিঙ্গ-পরিচয়ের প্রতি তর্জনী না তুলে সমালোচকগণ পারলেন না।“ এবার আসা যাক মেয়েদের লেখার আঙ্গিক বা মাধ্যমের প্রসঙ্গে। পৃথিবী জুড়েই দেখা যায় মেয়েদের ভেতর কবি, নাট্যকার বা গল্পকারের চেয়ে (Feminine) ঔপন্যাসিকের সংখ্যা বেশি। সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে উপন্যাসকেই মেয়েদের রচনা-মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়ার আগ্রহটি কেনো বেশি? (চলমান...)

(চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ৪২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা