নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৪

শুক্রবার, জানুয়ারী ৩, ২০২০ ৩:৫০ PM | বিভাগ : সাহিত্য


(পূর্ব প্রকাশিতের পর) রিচের এই বয়ানের পাশাপাশি চিন্তা করুন গার্সিয়া মার্কেজের কথা! দশমাস ধরে ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ লিখেছেন বন্ধ দুয়ারের ভেতরে। একা স্ত্রী সামাল দিচ্ছেন পাওনাদার, সন্তান, সংসার সব কিছু।

নারীবাদী সাহিত্য তাত্বিকগণ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে যুগে যুগে কিভাবে ‘পুরুষের সাহিত্য উৎপাদনে (Male Literary Production)’ মেয়েদের ভূমিকা অস্বীকৃত হয়ে এসেছে। ডরোথি ওয়র্ডসওয়র্থ, এলিস জেমস, জেন্ডা ফিটজেরাল্ড, জেন কার্লাইল প্রমুখ তাঁদের কৃতী স্বামীদের রচনা দিস্তা কপি করা, প্রকাশকদের সাথে আলাপ-আলোচনা করাসহ নানা ধরনের সাহায্য করতেন। কাউন্টস তলস্ততায় যে ভয়ানক পরিশ্রম (কপি করা) ও দুঃচিন্তা করতেন তার স্বামীর লেখা নিয়ে, তা হয়তো খোদ ফরাসী লেখিকা জর্জ স্যান্দকেও লজ্জায় ফেলে দিতো। পুরুষ লেখকদের সর্বপ্রধান যে সুবিধা তা হলো তার অবাধ কমরেডশিপের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়, কফি হাউস কি কর্মক্ষেত্রে, সর্বত্রই সে লাভ করছে তারই সমসায়িক অন্যান্য লেখকদের সান্নিধ্য। নারীলেখককে কিন্তু সময় কাটাতে হচ্ছে টনটন আলু রান্না করা ও ফ্যাশনে ব্যস্ত মাতা-কন্যাদের সাথেই। একটি ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। জেন অস্টেন এবং ওয়র্ডসওয়র্থ ছিলেন সমসাময়িক। ওয়র্ডসওয়র্থ অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়ে বন্ধু হিসেবে পেলেন কোলরিজকে। দু'জন মিলে প্রকাশ করলেন LYRICAL BALLADS যা আজ ইতিহাস। জেন অস্টেন একই বয়সে, একই সামাজিক মর্যাদায়, মা’র সাথে ঘরে বসে দিন কাটাতেন। সাথে ক্ষোভ করেননি তিনি: “I may boast myself to be the most unlearned and uniformed female who ever dared to be an authoress.’

চমৎকার বলেছেন এলেন মোয়ের্স তাঁর “Liteterary women” (১৯৭৬) গ্রন্থে; ‘একজন নারীর পক্ষে লেখক হওয়ার অর্থ হলো এমন এক ¯স্রোতের সাঁতারু হওয়া, সে স্রোতে তার সমলিঙ্গ সাঁতারু অত্যল্প। বিপরীত লিঙ্গেঁর যাঁরা আছেন, তাঁদের চোখে সে না নারী, না লেখক। ‘Author’ শব্দটিই বড় বেশি ‘Authoriy’ সংশ্লিষ্ট। ‘রহস্যময়ীগণ’ লিখতে শুরু করলেই আর ‘রহস্যময়ী' থাকেন না। আবার লেখক বলেই তার সাথে পুরোদস্তর পুরুষের মতো ব্যবহারও করা যায় না। ...পুরুষ লেখক তাই শিক্ষিতা প্রেরণাদাত্রীকে কামনা করেন, কামনা করেন চাষীকন্যাকেও। কিন্তু খুব কমক্ষেত্রেই সহ্য করতে পারেন একজন নারী লেখককে।” সিলডিয়া প্লাথের প্রতি তাই দিন দিন নির্লিপ্ত হয়ে যান টেড হিউজ। বালজাক এক অর্থলোভী, ব্যভিচারীনী পোলিশ কাউন্টেসের প্রেমে উন্মত্ত হয়ে মারা যান কিন্তু প্রতিভাময়ী জর্জ স্যান্দের সামান্য মৌখিক শুভেচ্ছা গ্রহণেও তিনি অনুৎসাহী ছিলেন।

মেয়ে’ শব্দটির অর্থ কী? পিতৃতান্ত্রিক টেক্সটের শ’য়ে শ’য়ে পৃষ্ঠা ঘেঁটে টিল্লি ওলসেন ‘মেয়ে’ শব্দটির সমার্থক শব্দগুলো সাজাচ্ছেন এই ভাবে: “নোংরা/শয়তানের দ্বার/সতীদাহ/জহরব্রত/পর্দা/গৃহবন্দী/যৌন শিকার/ নির্বাসিত। আইনসভা-ধর্ম-কাজ-শিক্ষা-ভাষা: সবকিছু থেকে নির্বাসিত হওয়া। তোমার কাজ কোমল ও আকর্ষণীয়া হওয়া, বিবাহের নামে পুরুষের কাছে সম্পত্তি বিসর্জন, সন্তান লালন, পরনির্ভর বেঁচে থাকা অথবা উন্মাদ জীবন।“ সেই কোনকালে গ্রীক দার্শনিক পেরিক্লিস বলেছেন: ‘নারীর যথার্থ গৌরব হলো আলোচিত না হওয়া।“ গিলবার্ট, গুবার ও রঁলা বার্থ নারী লেখকের সমস্যাকে যথার্থ চিহ্নিত করেছেন, পুরুষের সাহিত্যে নারী হলো প্রতীক বা চিহ্ন। সুতরাং, পুরুষ-সৃষ্ট এই সাহিত্যজগতে যে নারীই লেখক হিসেবে পা রাখতে চাইবেন তাঁকেই হতে হবে শ্রেণীচ্যূত।

মেয়েদের নিজেদের তরফ থেকেও সংস্কার বড় কম নয়। সে গৃহলক্ষী, কল্যানী। কি করে সে লিখতে পারে বিদ্যমান সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে ক্রোধ, হতাশা অথবা নিজস্ব অকপর্ট শরীরী বাসনার কথা? আজ থেকে তিন/সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, নৃশংসতম পুরুষতন্ত্রের পীঠস্থান ভারতবর্ষে অসম্ভব উজ্জ্বল একটি প্রেমের কবিতা লিখে ফেলেছিলেন এক ভারতীয় নারী কবি: ‘যে ছিল আমার প্রথম কৌমারহর, সেই আজ বর। সেই মাধবীতরু আজো তেমনি পুষ্পিতা। সমুদ্রতীরের সেই শিলাশয্যা আজো অটুট। সেই গুল্মঝোপ আজো তেমনি নিবিড়।... কিন্তু, প্রথম প্রণয়ের সেই তীব্র মদিরতা আজ আর কই? শব্দ-বিন্যাসের মনোহর জয় করে নিল অগননহ কাঠকচিত্ত। কিন্তু কুমারী-প্রেমের অসঙ্কোচ বর্ণনায়, তা-ও নারীর মুখে, ক্রুদ্ধ সংস্কৃত পদকর্তারা কবিতাটির মাঠ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন অন্তত: কয়েক শতকের জন্য। আজো আন্না আখমাতোভাকে সোভিয়েত কর্মকর্তারা ‘অর্ধ-যাজিকা অর্ধ-বেশ্যা’ বলে গালিগালাজ করেন। তাঁরা ভুলে যান যে কোনো শিল্প সৃষ্টিরই প্রথম শর্ত ওটি। হাফিজ যেমন সুরার বোতল হাতে জায়নামাজে বসতেন, ব্যাক্কাসের উৎসব তো আর এমনি এমনি পূর্ণ হবে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাউন্ডুলেপনা ও পানাসক্তি নিয়ে কত না প্রশস্তি ‘কে বেশী মাতাল, কবি না কবিতা? মহুয়ার দায় নেই হিসেব নেবার। ঘুমোও বাউন্ডুলে!’ কল্পনা করুন, মধ্যরাতে অমনি কোন আসবমত্তা, স্খলিত পদ নারী! নবনীতা দেবসেন সারাজীবন শুধু প্রবন্ধই লিখে যান। ‘অন্য কিছু’ লিখলে পাছে তার পরিবার বা পরিচিতমহল কিছু মনে করে বসে? একই সমস্যায় ভুগেছেন খোদ ভার্জিনিয়া উলফ। ‘ভাল মেয়ে’ বা ‘ভদ্রমহিলার’ সংস্কার মেয়েদের বাধ্য করে ‘যৌনতাহীন’ বা ‘পুরুষের যৌনতা’ নিয়ে লিখতে। ফলত: সমালোচক উইলিয়াম গাসের অনিবার্য টিপ্পুনি: ÒLiterary women lack that blood-congested genital drive which energies every great style.” এ্যান্থনী বার্জেস জেন অস্টেনের উপন্যাসসমূহকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এই চিহ্নায়নের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘সজোর পুরুষ তৃষ্ণার” অভাব।

সমস্যার আলোচনা ঢের হলো। ঘুরে ফিরে আবার একই প্রশ্নে আসতে হচ্ছে: কারা আমাদের পূর্বনারী? কারা আমাদের আদিমাতা? কোথায় খুঁজে পাব তাদের? শোওয়াল্টার জবাব করেন, তাঁরা আছেন। লোকগান/ছড়া/ব্রত-কথায় তাঁরা বেঁচে আছেন। মার্কেসের দাদীমা পুশকিনের ধাইমা হয়েই তাঁরা মরে যান। টেক্সট তাকে বুকে নেয়নি। সমাজ যখনি পেরেছে, ডাইনী বলে তাকে হত্যা করেছে। এ সেই ‘সার্কাসের সং” পুরুষতন্ত্র যে এমিলি ডিকিনসনের Pontymeter লোককথাভিত্তিক বলে বিদ্রুপ করে। বাঙালি মেয়েদের সহজিয়া ব্রত কথা (রনে রনে সুয়ো হব জনে জনে এয়ো হব-আকালে লক্ষী হব-সময়ে মা হব) মুছে ফেলে তৈরী করে হতাশাবাহী, ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্লোক (বসুমতী মাতা তোমায় করি নমস্কার-পৃথিবীতে জন্ম আমার না হয় যেনো আর)। লুপ্ত অতলান্তিকে মতো তলিয়ে গেছেন খনা, গার্গী, স্যাফোরা। পুরুষতন্ত্র তাঁদের ক্বাসিদার স্বর থামিয়ে দিয়েছে চিরতরে। (চলমান)

(তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

(প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)


  • ২৯২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট