নারীবাদী সাহিত্যতত্ব: লুপ্ত অতলান্তিক ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ - ০৩

শুক্রবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯ ৭:৩১ PM | বিভাগ : সাহিত্য


(প্রথমদ্বিতীয় পর্বের পর) টিল্লি ওলসেন ১৯৭২ সালে প্রথম প্রকাশিত তাঁর “Breaking the Silence” গ্রন্থে নারী লেখকদের পক্ষ হতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ তোলেন। আর তা হলো কোনো সূক্ষ অদৃশ্য কারণে সমালোচকেরা নারী লেখকদের লেখা নিয়ে আলোচনা করতে কেমন কুণ্ঠা বোধ করেন। ফলতঃ এই নীরবতায় একদিকে যেমন নারী লেখকরা গোটা গোটা প্রজন্মসহ বা শতাব্দীসহ হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মরণের কৃষ্ণগহবরে, তেমনি যে সদ্যতরুনী আজ লেখার টেবিলে প্রথম বসলো, সে খুঁজে পাচ্ছে না কোনো আদিমাতা (Foremothers), শুরুতেই ভয়াবহ হীনমন্যতায় আক্রান্ত হতে হচ্ছে তাকে। অথচ, তারই সমবয়সী যে তরুণ আজ লিখতে শুরু করলো, তার কাঁধে আকাশের ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সফোক্লেস, হোমার, গ্যেটে, শেক্সপীয়ার, হেমিংওয়ে....। মেয়েদের মধ্যে এমন সাহিত্য প্রতিভা, জন্ম নেয় না কেনো? সাহিত্যের ‘আদিপিতা’দের মতো ‘আদিমাতা’দের কেনো খুঁজে পাওয়া যায় না? ভার্জিনিয়া উল্ফ গোটা নারীজাতির পক্ষ হয়ে উত্তর দেন: আদিমাতাদের খুঁজে পাওয়া যাবে কী করে যখন সভ্য ইউরোপে ষোঢ়শ শতাব্দী পর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়া ছিলো প্রায় নিষিদ্ধ? সপ্তদশ শতকেও ল্যাটিন ও গ্রীক ব্যকরণে মেয়েদের অধিকার ছিলো না কিংবা উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্তও মেয়েদের ছিলো না বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার? গ্রীকভাষা শিখতে চাওয়ার অপরাধে এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিংকে যখন পারিবারিক জীবন হতে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছিলো? ভার্জিনিয়া তাঁর ‘A Room of One’s Own’- এ তাই প্রচন্ড আক্ষেপ আর দরদ দিয়ে এঁকেছেন এক কাল্পনিক চরিত্র। শেক্সপীয়ারের বোন জুডিথ শেক্সপীয়র; ‘জুডিথ জন্মালো আর ভাই উইলিয়াম শেক্সপীয়রেরই সমান প্রতিভা, কল্পনা আর পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাকে স্কুলে যেতে দেয়া হয় না। ল্যাটিন ব্যকরণের বই হাতে নিলে সবাই তাকে ধমকায়, বলে রান্নাঘরে ‘স্ট্যু’টা ফুটছে কিনা সেটা দেখতে। আর একটু বড়ো হলে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু সে প্রতিবাদ করে সে বিয়ে করবে না। ক্রুদ্ধ পিতা তাকে চাবুক মেরে শেকলে আটকে রাখেন। রাতে সে তার তিল তিল করে জমানো পেনীগুলো একটি পুঁটলিতে বেঁধে গ্রাম ত্যাগ করে। অবশেষে লন্ডনে আসে সে। থিয়েটারের ম্যানেজারকে জানায় যে সে নাটক বিষয়ে আগ্রহী। মোটা ও প্রৌঢ় ম্যানেজার বিদ্রুপ ভরে হাসে। অতঃপর সে খুব ‘তরুণী বলেই তাকে আশ্রয় দেয়। অসম্ভব প্যাশনেট সেই তরুণী কবি অবশেষে ম্যানেজারের অবাঞ্ছিত সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে এক শীতরাতে আত্মহত্যা করে। কোনো চৌরাস্তার মোড়ে তার লাশ পাওয়া যায়।”

শেক্সপীয়রের সময় হতে পৃথিবী এগিয়ে গেছে শ‘চারেক বছর। সার্বিক সময় তবু কতোটুকু বদলেছে? অড্রেন রিচ তাঁর আত্মাজীবনীমূলক গ্রন্থ ÒOn Lies, Secrets and Silence”- এ স্মরণ করেন তাঁর প্রথম দিকের বিবাহিত জীবনে সন্তান লালনসহ অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিভাবে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলেন লেখালেখির জগৎ থেকে। বাচ্চার ন্যাপি বদলাতে বদলাতে, দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে শেষ করেন ORION নামক তার সাড়া জাগানো দীর্ঘ কবিতা। কবির নিজের ভাষ্যে: “আমি তখন খুব কম লিখছিলাম, কিছুটা ক্লান্তির কারণে, সেই নারীসূলভ ক্লান্তি- চাপা ক্ষোভ এবং আপন স্বত্বা হতে বিচ্ছিন্নতা এর কারণ, কিছুটা নারীজীবনের অসংলগ্নতা থেকে এর জন্ম। মানুষের জীবন সর্বক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্যান্টাসি ও নিস্ক্রিয় দিবা-স্বপ্নে ভরা, যা খুব বেশি কর্মপরায়নতা দাবী করে না- কিন্তু কবিতা বা কাহিনী লিখতে হলে, এমনকি ভালভাবে চিন্তা ভাবনা করতে হলেও, ফ্যান্টাসি নয়- প্রয়োজন হয় মনের স্বাধীনতা- প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, চ্যালেঞ্জ করার স্বাধীনতা, দিনকে রাত ভাবা বা ভালবাসাকে ঘৃণা করার মতো মানসিক ক্রীড়া করতে পারা, কেননা, লেখা হলা পুনর্নামায়ন। কিন্তু নারী হয়ে সনাতনী নারী ভূমিকা পালন কল্পনা শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ সংঘাতে লিপ্ত হয়।’ (চলমান)

(প্রথম পর্ব এখানে)

(দ্বিতীয় পর্ব এখানে)


  • ২৪৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট