দুর্ভিক্ষ: পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়?

সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২০ ৬:২৪ PM | বিভাগ : আলোচিত


 

 

‘চাইল দেন- বাড়িতে কেউ আছেন? খালাম্মা- চাইল দেন! দুইটা চাইল দেন!’

আজ সন্ধ্যার পূরবী রাগিনী যেনো এই ভিখিরিনীর গলার আর্ত স্বর হয়ে আমাদের এ্যাপার্টমেন্টের নিচ তলা থেকে দিব্যি পাঁচতলায় আমার কাণে পৌঁছে গেলো।

হ্যাঁ, দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি আজই প্রথম স্পষ্ট শুনতে পেলাম এবং সেটা আমার বাসাতে বসেই। এমনিতে আমি সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত- ২১ অথবা ২৪ মার্চের পর থেকে একদিনও ঘরের বাইরে বের হওয়া হয়নি। তবু দিন এমনকি ব্যস্ত ভাবেই কাটছে। অন লাইনে ডাচ সমাজবিজ্ঞান কোর্সের পড়া, কাজের আবেদন (যেহেতু শেষ কাজটা নিতে পারিনি), বিভিন্ন পত্রিকায় লেখার ডেটলাইন মেটানো, অসুর গলায় খানিকটা সুর সাধনা, ব্যাক পেইন কাটাতে দু’বেলা হাল্কা ইয়োগা ও ঘরের ভেতর হাঁটাহাঁটি- মধ্যশ্রেণি হিসেবে আমরা এখনো ঘরে বসেই খেতে-পরতে পারছি। কিন্ত কেমন একটা হিম বোধ হলো যখন সন্ধ্যায় শাওয়ার নিতে ঢুকে সহসা শুনি ঠিক আমাদের এ্যাপার্টমেন্টের নিচ তলা থেকে এক দরিদ্র নারী জোর গলায় ‘চাইল’ চেয়ে মিনিট পাঁচেক চেঁচিয়েই চললো। কেউ কি শুনলো তাকে?

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’-এ ১৭৭৬-এর মন্বন্তরের ভয়ানক বিবরণ আছে, ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে ‘ফেন দাও’ আর্তির কথা বইয়ে পড়েছি। জয়নুলের ছবি। মা’র কাছে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের গল্প শুনেছি। তখন বরিশাল অক্সফোর্ড মিশন রোডে বাবার বদলীর চাকরিতে থাকা হতো। এক ভিখিরিনী নারী তার চার/পাঁচ বছরের শিশু সন্তান সহ দুপুরবেলা এসে ভাত চাইলে মা খানিকটা বাড়তি ভাত ও তরকারি দিয়ে সে বারান্দাতেই তার শিশু সহ ভাত খেতে পারে বলে জানায়। কিন্ত ভিখিরিনী তার মাটির সানকিতে ভাত নিয়ে বলে যে সে বাড়ি গিয়ে খাবে। এরপরের দৃশ্যটি মা কোনদিনই ভোলেন নি ও সারাজীবন অবাক হয়ে গল্প করে গেছেন। একটু পরই জানালা থেকে মা দেখতে পান যে সেই ভিখিরিনী খানিকটা সামনে হেঁটে গলির মোড়েই বসে তার বাচ্চাকে না দিয়ে নিজেই সবটুকু খাবার খেয়ে ফেললো। এক হতে পারে ঐ শিশুটি ভিখিরিনীর আপন শিশু ছিলো না। সে হয়তো ভিক্ষায় সুবিধার জন্যই বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বের হতো যেমনটা এখন ভিক্ষুক চক্রের ব্যবসা স্ট্র্যাটেজি বিষয়ে আমরা জানি। দ্বিতীয়ত: হয়তো ঐ দরিদ্র মা এতোটাই ক্ষুধার্ত ছিলো যে নিজ সন্তানকে বঞ্চিত করে পুরো খাবারটাই সে খেয়ে ফেলেছিল... যে ক্ষুধা একজন মধ্যবিত্ত নারী বা মায়ের পক্ষে বোঝা কঠিন।

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে কলকাতার রাস্তায় যখন মানুষ না খেয়ে মরছে, তখন পাশেই দামি খাবারের দোকানে থরে থরে খাবার সাজানো। বৃটিশ পুলিশ কর্মকর্তারা না বলে পারছেন না যে বাংলার জায়গায় পাঞ্জাব হলে চালের গুদাম লুট হতো বা খাবারের দোকান লুট হয়ে যেতো। কিন্ত বাঙ্গালী এতো শান্ত জাতি যে সে ফুটপাথে মরছে কিন্ত পাশেই বড় চালের গুদাম বা খাবারের দোকানে একটি ঢিলও ছুঁড়ছে না। একইকথা জাতিসঙ্ঘে কাজের সময়ে এক সিনিয়র বিদেশী কর্মকর্তা বলেছিলেন। বাংলাদেশের গ্রামে বন্যা বা দূর্যোগের সময়ও মানুষ যত শান্ত থাকে, আফ্রিকায় এটা কল্পনা করা যাবে না।

২০০৭-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় আইনজ্ঞ শাহদীন মালিকের একটি ইন্টারভিউ নিতে গেলে (পরে কোথাও অবশ্য ছাপা হয়নি) বলেছিলেন পৃথিবীর মেগা সিটিগুলোর ভেতর টোকিওর পর কলকাতা ও ঢাকায় অপরাধের হার সবচেয়ে কম। আমি বললাম, ‘তাহলে যে এতো খুন-ধর্ষণ হয়?’ তিনি বললেন, ‘কয়টা? রিওডি জেনিরোতে গেছেন কখনো? সন্ধ্যার পর নগরীর বিভিন্ন পথে বন্দুক হাতে যুবক ছেলেরা ঘুরে বেড়ায়। বিদেশী হয়ে হাঁটতে পারবেন না। কিছু অপরাধ ত’ হবেই। মানুষের ডিএনএতেই আছে। ইতালীতে যান। মাফিয়ারা সেখানে এক/একটা শহর নিয়ন্ত্রণ করে।’

এরপরও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের বাড়িতে চালের বস্তা পাওয়া যাচ্ছে। মনে পড়ছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘চালকুমড়ো’ কবিতাটি। মজুতদার চাল মজুদ করছে জেনে ভুখা জনতা চাল চাইতে গেলে মজুতদার একটি চালকুমড়া দিয়ে বললো, ‘এই নাও ভাই চালকুমড়ো- চালও পেলে কুমড়ো পেলে- লাভটি হলো বড়ো!’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্প আছে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর নিয়েই। সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন যে মানুষ কেনো কেড়ে খায়নি? আজ জামালপুরে মানুষ কিন্ত চাল কেড়ে নিয়েছে। আর সিরাজগঞ্জে একটি দশ বছরের কন্যাশিশু কাজ না পাওয়া দিনমজুর বাবার বকুনিতে অভিমানে আত্মহত্যা করেছে। আমার কী? আমি সুবিধাভোগী মধ্যশ্রেণির মানুষ- পত্রিকাগুলোয় করোনা নিয়ে অনুবাদ জমা দিচ্ছি।


  • ২৫৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা