দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিন, প্রতিটি ক্ষণ নারীকে বুঝতে হবে

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৯ ৭:৫৩ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


গতকাল নারী দিবস চলে গেলো ও একটা বছর ঘুরে ফের একটা ৮ মার্চ, ফের একটা আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এতে নারী রূপী মানুষগুলোর কতটা কী যায় আসে, তা বলা মুশকিল। তবে আরও একটা উৎসবের আমেজে, ব্যবসাটা কিন্তু মন্দ হচ্ছে না। গিফ্ট শপ থেকে শাড়ির দোকান, বাজারটায় একবার চক্কর কাটলেই ক্রয়-বিক্রয়ের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্ধেক আকাশের জন্য শুধু এই একটা দিন বরাদ্দ করে নারী তথা মানবজাতির কোন কল্যাণটা হয় শুনি?

সত্যি বলতে কি, কিছুই হয় না। যেসব মেয়ের গতকালও বঞ্চনার শিকার হয়েছে, আজ, এমনকি আগামী কালটাও তাদের একই অবজ্ঞায় কাটবে। যাবতীয় গোঁড়ামি আর সমাজের অনুশাসন ছেড়ে গোটা সমাজের সার্বিক ও প্রকৃত শিক্ষার বন্দোবস্ত পাকা না করলে মানবাধিকার রক্ষা অসম্ভব। তাই নামমাত্র নারী দিবস পালন না করে আমাদের সকলেরই সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।

বস্তুত, যে সমাজ, যে পৃথিবীতে মানবাধিকার সুরক্ষিত, সেখানে আলাদা করে নারী দিবস পালনের কোনও প্রয়োজনই হবে না। কারণ, এই উৎসব অপ্রয়োজনীয়, অবান্তর। শুধুমাত্র নারী দিবস পালন করেই যদি মেয়েরা সমান অধিকার পেয়ে যেতো, তাহলে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও নিজের জন্য একটা সহজ সিদ্ধান্ত নিতে তাদের এত ভাবতে হতো না। একলা পথ চলতে গিয়ে এতো নিজেদের দ্বিধাগ্রস্ত মনে হতো না।

আজও যখন কোনো একটা মেয়ে অফিস থেকে বাসায় ফেরে গভীর রাতে, এখনও বাড়ির লোকের দুশ্চিন্তা কাটে না। ‘ঘরের মেয়ে’ সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরলে তবেই তাদের মনে শান্তি আসে। পরিবারের এই উদ্বেগ মাঝেমধ্যে বিরক্তিকর মনে হলেও তা যে অকারণ নয়, তা অতি বড় নারীবাদী বা বিপ্লবীর পক্ষেও অস্বীকার করা অসম্ভব। কারণ, রাত করে বাড়ি ফেরা মানেই তো ফাঁকা রাস্তায় একটা মেয়ের এগিয়ে চলা। আজও বহু ‘মানুষে’র কাছে মেয়েদের এই স্বাধীনতা অস্বাভাবিক ঠেকে। তাই কটুক্তি থেকে গায়ে হাত, বাদ যায় না কিছুই। এরপর যদি মেয়েটা ভয় পায়, তাহলে তো সমাজের ভারী মজা। কিন্তু সে যদি রুখে দাঁড়ায়? তাহলেই কানে আসবে সেই চিরাচরিত ‘ঐতিহ্যের বুলি’- মেয়ে মানুষের অত বাড় ভালো নয়। এদেশের মেয়েদের জন্য আজ অবধি সেটুকুও বরাদ্দ হয়নি। কারণ, একটা মেয়ে সম্পূর্ণ একা একা এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াবে, তাও আবার হয় নাকি? মেয়েরা কি এসব করতে পারে.!

সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আজও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) মেয়েদের শুধু বংশধর তৈরির যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। এমনকি, নারী কখন তার সন্তানের জন্ম দেবে, আর কখন দেবে না, সেটাও ঠিক করে তার পরিবার। জন্মদাত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এখানে কোনও মূল্যই পায় না। আর তাই ‘পুত্রলাভের’ আশায় অশক্ত শরীর নিয়েও বছর বছর সন্তানের জন্ম দেওয়া, কন্যাভ্রূণ হত্যার মতো ঘটনা এখনও এদেশে বিরল নয়।

আমাদের সমাজে কন্যাসন্তান আজও বোঝা। কারণ, মেয়ে হওয়া মানেই তো তাকে সোনা-রুপোয় মুড়ে বিদায় করতে হবে। না হলে শ্বশুর ঘরে তার ঠাঁই হবে কী করে? তাই মেয়ের জন্মের পর থেকেই তার বিয়ের জন্য সঞ্চয় শুরু করেন বাবা (মায়েরা আজও অধিকাংশ সময়েই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়)। স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে ‘বাঁচে’ তার পরিবার। কিন্তু বিয়ে যদি অল্প বয়সে না হয়? তাহলেই গোল বাঁধে। শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। মেয়েকে বিয়ে না দেওয়ার ‘আসল কারণ’ খুঁজতে তৎপরতা বাড়ে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের। আসলে পুরুষের ছায়া ছাড়া কোনও মেয়ের প্রকাশ্যে বেঁচে থাকলে আজও অবাক হয় আমাদের সমাজ।

পুরুষ জাতি সম্পর্কে একটা চালু প্রবাদ আছে। তারা হল সোনা সমতুল্য। তাই বাঁকা, ট্যারা, ভাঙা- যাই হোক না কেনো, তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু নারীকে হতে হবে সর্বাঙ্গীন সুন্দর। না হলে বিয়ের বাজারে তাকে চালানোই দায় হয়ে যাবে। আর বিয়ে না হলে যদি সে কোনও শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে? তখন তো গোটা পরিবারেরই মাথা কাটা যাবে। পুরুষ পারে। তার ইচ্ছা হলে একাধিক নারী শরীরের কামনা করাটা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তা বলে একটা মেয়ের তো সেটা মানায় না!

এখনও সমাজে নারীকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়।এই যে গতকাল ৮ই মার্চ চলে গেলো। শুধু এই একটা দিন নারীকে, নারী হিসাবে মানবজাতির সামনে তার অধিকারগুলো গুরুত্ব সমাজে বুঝানো হয়। তাছাড়া অন্য কোনো দিন নারীকে সমাজের সামনে এত সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয় না। ৮মার্চ আসলে আমরা সবাই নারীবাদী হয়ে যাই। সবাই নারীকে নিয়ে কথা বলি এবং নারী বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেই। অন্য কোনোদিন নারীর বিষয়গুলো বা তার অধিকার নিয়ে আমরা কেউ কথা বলি না বা গুরুত্ব দেই না। শুধু এই দিনে নারীকে রানী হিসাবে নতুন করে সমাজের সামনে তুলে ধরি।

কেন ভাই আমরা এই রকম কেনো..?

শুধু নারী গুরুত্ব নিয়ে এই একটা দিন আমরা কথা বলি অন্য কোনোদিন বলি না কেনো..? নারীরা কি আমাদের সমাজের অংশ নয়! তারাও তো আমাদের সমাজেরই একটা অংশ। আমরা পুরুষদের নিয়ে যতোটা কথা বলি, নারীদের নিয়ে ততোটা কথা বলি না কেনো? তাদেরও পুরুষের মতো সমান অধিকার আছে সমাজে। আমরা কেনো তাদেরকে নিয়ে কথা বলি না? আমরা কেনো তাদেরকে এত গুরুত্ব দেই না।

ভাই একটি গাড়ি যখন রাস্তা চলে তখন তার প্রথম চাকাটি যদি বড় হয় আর পিছনের চাকাটি যদি ছোট হয় সে গাড়িটি যেমন সঠিক ভাবে চলতে পারে না এবং সামনের দিকে সঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারে না। নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেই বিষয়টি ঠিক এরকম। নারীকে আমরা যদি পিছনের চাকা ধরি, আর পুরুষকে যদি সামনের চাকা ধরি তাহলে দেখা যাবে আমাদের সমাজও সঠিক অগ্রসর হতে পারছে না। এভাবে চললে আমরা, আমাদের সমাজকে কোনো দিন উন্নতি চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারবো না। তাই আমাদেরকে পরিবর্তন করতে হবে সমাজ ব্যবস্থাকে। এখন আপনি বলবেন, ভাই আমি সমাজে ছোট মানুষ আমি কিভাবে সমাজ পরিবর্তন করবো। আমি বলতে চাই আপনাকে সমাজ পরিবর্তন করতে হবে না। আপনি আপনার স্থান থেকে সমাজ পরিবর্তনের অংশ হিসাবে নিজে বদলে যান। আপনি নারীকে গুরুত্ব দিন। তার সমঅধিকারের ব্যপারে কথা বলুন এবং অন্যকে নারীর গুরুত্ব বোঝান। অন্যকেও বলুন সে যেনো আপনার মত এরকম অন্যকোনো একজনকে নারীর গুরুত্ব নিয়ে বিষয়গুলো বোঝায়। তাহলেই হবে। এরকমভাবে ধাপে ধাপে সমাজ পরিবর্তন হবে।

তাই আমি বলতে চাই, ৮ মার্চের এই দিনটি শুধু নারীর গুরুত্ব বা তার সমঅধিকার ব্যপারে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ নারীর গুরুত্বকে বুঝতে হবে। নারীর অধিকার আদায়ের ব্যপারে আমাদেরকে সোচ্চার হতে হবে। নারীকে সবসময়, সর্বক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে আমাদের সমাজ বদলে যাবে। আমাদের সমাজে নারীদের একটা অবস্থান তৈরি হবে আশা করি....!!!


  • ১৫০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আসমাউল মুত্তাকিন

শিক্ষার্থী, মানারাত ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ

ফেসবুকে আমরা