সৌদি আরবে নারী শ্রমিক ধর্ষণ বিষয়ে

মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৯ ১১:১১ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


বেশ কয়েকবছর ধরেই সৌদি আরবে আমাদের দেশের নারী শ্রমিকদের পাঠাবার বিষয়ে লেখালেখির সূত্র ধরে, বিভিন্ন বিতর্কের সূত্র ধরে অসংখ্যবার অসংখ্য মুমিন দাবী করেছে, এর সাথে ইসলামের কোনো রকম সম্পর্ক নাই। ইসলাম তো অভিভাবক (মাহরাম) ছাড়া নারীকে সফরের অনুমতিই দেয় না। তাহলে এইসব নারীর সৌদি যাওয়াই তো ইসলাম বিরোধী! নারীকে থাকতে হবে ঘরে। কিন্তু যারা এইসব বলেন, তারা সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠাবার মত ইসলাম বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে কিন্তু আন্দোলন করেন না। ঢাকা ঘেরাও করেন না। ইসলামকে হেফাজত করেন না। কারণ তাদের মসজিদ মাদ্রাসাগুলোর ডোনেশন কিন্তু ঐ সৌদি থেকেই আসে। বাপের নাম তারা কীভাবে উচ্চারণ করে?

এইটুকু অসংখ্যবার পরিষ্কারভাবে আলোচনা হয়েছে যে, ইসলামে দাসীদের সাথে সহবত সম্পূর্ণ হালাল এবং ইসলামসম্মত। নবীর রেখে যাওয়া সুন্নত অনুসারেই মুসলিমরা দাসী গমন করতে পারে। এবং ইসলামে দাসপ্রথাও সম্পূর্ণ হালাল। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা ইহুদি নাসারা কাফের এবং নাস্তিকদের ষড়যন্ত্র এবং কুফরি বলেই ইসলামে গণ্য, কারণ আল্লাহ বা নবী তা নিষিদ্ধ করে যান নি। আল্লাহ এবং নবী যা হালাল করেছেন, তা সর্বযুগে হালাল, যা হারাম করেছেন, তা সর্বযুগে সর্বত্রই হারাম। আল্লাহ এবং নবী দাসপ্রথাকে সম্পূর্ণ হালাল করে গেছেন। এমনকি নবীর নিজেরও দুইজন মতান্তরে চারজন দাসী ছিল, যাদের সাথে নবীর নিয়মিত যৌন সম্পর্ক ছিল। [১]

এর মাঝে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠন, যারা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি কাফেরদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন, তারা দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য জোড়াজুড়ি শুরু করে। নিতান্তই বাধ্য হয়ে, ইংল্যান্ডের চাপে সৌদি সহ কয়েকটি দেশ দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধ করে। [২]

কিন্তু সৌদি আরবের অসংখ্য মুসলমান কিন্তু কোরআন হাদিসই অনুসরণ করেন। তারা কিন্তু জাতিসংঘের উম্মত নয়, নবীর উম্মত। নবীর সুন্নত পালনই তাদের জন্য মূখ্য। কিন্তু তাহলে তারা ইসলামে হালাল কর্ম দাসী সহবত কীভাবে করবে? [৩]

বাঙলাদেশ সহ দরিদ্র দেশগুলো থেকে তারা প্রচুর পরিমানে নারী শ্রমিক নেয় প্রতিবছর। এক একজন নারী শ্রমিকের বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের কমিশন দেয়। এই কমিশনের লোভে বাঙলাদেশ সরকারের অসংখ্য নেতা, কর্মকর্তা হাজার হাজার নারী শ্রমিক পাঠায় সৌদি আরবে।

আর এই অর্থের বিনিময়ে প্রায় কিনে আনা মেয়েদের সৌদি নাগরিকগণ স্বাভাবিকভাবেই দাসীই মনে করে। এবং ইসলামে হালাল সহবত করে। ইসলাম মেনেই, ইসলাম পালন করেই। এই নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমাদেত দেশের মুমিনরা ঐ হতদরিদ্র নারীদেরই দোষ দেয়, কেন তারা মাহরাম ছাড়া বিদেশ গিয়েছে! আসলে নাকি তাদেরই দোষ!

কী ভয়াবহ! সামান্য কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য আত্মীয় পরিজন ছেড়ে যেই নারী সৌদির মত দেশে যান কিছু অর্থ উপার্জন করতে, পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, তাদেরই দোষ? অদ্ভুত এই মুমিনদের মানসিকতা!

সৌদি আরবের একজন প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ আল দাউদ কয়েকবছর আগে বলেছিলেন, কর্মজীবী নারীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন করা উচিত, যেন তারা কর্মক্ষেত্রে আর যেতে উৎসাহী না হয় এবং বাড়িতেই থাকে। কারণ নারীর আসল জায়গা হচ্ছে ঘর। যে সকল নারী বাইরে কাজ করে, তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া উচিত। যেন তারা বাইরে কাজ করতে যেতে ভয় পায়। [৪]

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ আল দাউদ যখন এই বিষয়গুলো টুইট করছিল, এবং তার প্রায় এক লক্ষ টুইটার ফলোয়ারকে কর্মজীবী নারীদের যৌন হয়রানী করতে উৎসাহিত করছিল, সে সময়ে পশ্চিমের অনেক নারীবাদী সংগঠন, নারী অধিকার কর্মী এর তীব্র নিন্দা জানায়। ফলাফল হিসেবে তাদের ভাগ্যে জোটে ইসলামোফোব খেতাব। নারীবাদীরা এতটাই ইসলামোফোবিক যে, বেচারা ভোলাভালা মুমিনদের একটু যৌন হয়রানি করতে দিতে চায় না! পশ্চিমা মানবাধিকার আন্দোলনকারী সাম্রাজ্যবাদীরা খুব দুষ্টু বটে!

মজার বিষয় হচ্ছে, অনেক মুসলিম নারীও এই লোকের টুইটের প্রতিবাদ করে। সে নারীদের ভাগ্যে জোটে 'ইহুদী নাসারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের টাকা খাওয়া দালাল' খেতাব। তারা নাকি ন্যাংটা হওয়ার স্বাধীনতা চাচ্ছে, যা ইসলামী সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের পরিপন্থী!

অধিকাংশ মুসলিম দেশে নারী পুরুষের মেলামেশা, একসাথে পড়ালেখা, একসাথে খেলাধুলো করা, একসাথে পার্টি করা, আনন্দ ফূর্তি করা কার্যত নিষিদ্ধ এবং নিন্দিত। ইসলামিক বা মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ছোটবেলা থেকেই নারীকে আলাদা ধরণের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। নারীর পোশাক আশাক, চলাফেরা, পড়ালেখা ইত্যাদি যখন অন্যদের থেকে আলাদা করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই নারীর প্রতি আর সহজ স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের তৈরি হয় না। তাদের মনে করা হয় ভিন্ন প্রজাতি, যাদের অধিকার ভিন্ন, যাদের সামাজিক মর্যাদা ভিন্ন। নারীর সাথে বন্ধুত্ব, প্রেম, যৌনতা ইত্যাদির চর্চা যেসকল সমাজে নেই, শুধুমাত্র যৌনতা এবং বাচ্চা উৎপাদনের মধ্যে নারীর সবকিছু নির্ধারিত, সেসব সমাজের পুরুষরা স্পষ্টভাবেই নারীর প্রতি এক ধরণের বিদ্বেষ নিয়ে বড় হয়। একে কালচারাল ডিফারেন্স বা সভ্যতার সংঘাত হিসেবে দেখলে হবে না, ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলেও হবে না, স্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

তাহার্রুশ জামা ই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এবং আফ্রিকার মুসলমান বা আরব ভাষাভাষীদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি খেলা। মিশরে তাহরির স্কয়ারে অসংখ্য নারী সাংবাদিক এবং একটিভিস্টকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল। অনেকে ধর্ষিত হন, অনেককে জামা কাপড় খুলে নগ্ন করে ফেলা হয়। এই খেলাটা একেবারেই পরিকল্পনা করে খেলা হয়। একটি নির্দিষ্ট মেয়েকে প্রথমে টার্গেট করা হয়। এরপরে দলবেঁধে তাকে ঘিরে ধরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এরপরে একে একে সবাই মিলে নানা দিক থেকে হাত দিয়ে মেয়েটাকে নাজেহাল করা হতে থাকে। মেয়েটা নানা দিক থেকে আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে শুরু হয় টেনে হিঁচড়ে কাপড় খুলে ফেলা, এবং সবশেষে ধর্ষণ। [৫]

এই খেলার মূল উদ্দেশ্য তাদের মতে খুবই মহৎ! যেন নারী ঘরের বাইরে বেশি না বের হয়, পর্দার মধ্যে থাকে, শালীনতা বজায় রাখে, ইসলামী ইমান আকিদা অনুসারে চলে, সেটা নিশ্চিত করাই নাকি এই খেলার মূল উদ্দেশ্য। মেয়েদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করা, এবং ভীতি তৈরি করাই এদের কাজ।

কিন্তু মেয়েদের আর আটকে রাখা যাবে না। ভয় দেখিয়ে, ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে তাদের হাত পা বেঁধে ফেলার সময় শেষ হয়ে গেছে। আমাদের দেশের মেয়েরা ইউরোপ আমেরিকা জয় করবে। আটকে রাখা যাবে না কিছুতেই।

১] https://www.shongshoy.com/archives/11811
https://www.shongshoy.com/archives/11734
https://www.shongshoy.com/archives/569
https://www.shongshoy.com/archives/13850
https://www.shongshoy.com/archives/10964

২] Among the last states to abolish slavery were Saudi Arabia and Yemen, which abolished slavery in 1962 under pressure from Britain; Oman in 1970; and Mauritania in 1905, 1981, and again in August 2007.
https://en.m.wikipedia.org/wiki/History_of_slavery_in_the_Muslim_world

৩] সুরা আল-মা’আরিজ আয়াত ২৯-৩০
যারা তাদের যৌন-অঙ্গকে সংযত রাখে, কিন্তু তাদের স্ত্রী অথবা মালিকানাভূক্ত দাসীদের বেলায় তিরস্কৃত হবে না।

সুরা আল-আহযাব আয়াত ৫০
হে নবী! আপনার জন্য আপনার স্ত্রীগণকে হালাল করেছি, যাদেরকে আপনি মোহরানা প্রদান করেন। আর দাসীদেরকে হালাল করেছি, যাদেরকে আল্লাহ আপনার করায়ত্ব করে দেন।

সুরা আল-আহযাব আয়াত ৫২
এরপর আপনার জন্যে কোন নারী হালাল নয় এবং তাদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করাও হালাল নয় যদিও তাদের রূপলাবণ্য আপনাকে মুগ্ধ করে, তবে দাসীর ব্যাপার ভিন্ন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপর সজাগ নজর রাখেন।

৪] https://en.m.wikipedia.org/wiki/Abdullah_Mohamed_al-Dawood

৫] https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mass_sexual_assault_in_Egypt


  • ৫৫১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আসিফ মহিউদ্দিন

জার্মান প্রবাসী আসিফ মহিউদ্দীন বাঙলা অন্তর্জালে একজন নিধার্মিক ব্লগার এবং অনলাইন একটিভিস্ট।

ফেসবুকে আমরা