আস্তিক্য-নাস্তিক্য যখন পিছু ছাড়ে না : প্রসঙ্গ ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২২, ২০১৮ ৫:৫৪ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


প্রিয় লেখক,

আপনার ওপর হামলা হয়েছিলো! নাস্তিক্যের অপরাধে! সেদিন থেকে শুরু করে আজ যখন আপনি সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন আমাদের মাঝে, এখন পর্যন্ত আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাস প্রসঙ্গে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার যেন শেষ নেই! কলামিস্টরা তড়িঘড়ি করে কলাম লিখতে শুরু করলেন। কিছু ব্যক্তিরা মুহুর্তেই আপনাকে নিজেদের ‘গোত্রভুক্ত‘ করে ফেললেন। কেনো? কারণ আপনার ওপর নাস্তিক্যের অপবাদ দিয়ে হামলা করা হয়েছিলো। তাই সমাজে কিছু ‘ঈশ্বরে অবিশ্বাসী‘ ব্যক্তিরা, ধর্মান্ধদের ওপর, এমন কি বিশ্বাসীদের ওপরও তীব্র ঘৃণা আর নিন্দা ছুড়ে দিয়ে তর্কে-লেখায়-ষ্ট্যাটাসে মেতে উঠেছিলেন। তেমনি নামাজ/কুরআন পড়া বা না পরা মুসলিমরাও নিজেদেরকে মুমিন বান্দা হিসেবে প্রমানে অপরপক্ষের ওপর চড়াও হয়েছিলো। আর সেই সময়ে আমরা বিহ্বল আপনাকে যদি হারিয়ে ফেলতে হয় সেই ভয়ে, তখন আমরা ব্যস্ত কিছুক্ষণ পরপর আপনার স্বাস্থ্যের আপডেট নেয়ায়।

তখন সুশীল সমাজের অনেক বিখ্যাত কিংবা অখ্যাত ব্যক্তি যারা কিনা নিজেদের মুক্তচিন্তক হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন আপনার জন্য ব্যাকুল হয়ে পরেছিলেন। আজ যখন আপনি সুস্থ হবার পথে, তখন তারাই এবার আপনার বিপক্ষে ব্যঙ্গ করছে! বলুন তো এবার কেনো এই ব্যঙ্গ ও সমালোচনা? এবার তারা আর আপনাকে নিজেদের ‘গোত্রের‘ বলে মনে করছেন না বরং আপনাকে নিয়ে বিশেষভাবে লজ্জিত ও বিব্রত! কেনো? কারণ আপনি ও আপনার পরিবার বলেছেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনি বেঁচে আছেন এবং সুস্থ হবার আশাও করছেন। হায় হায়, জাত গেলো জাত গেলো বলে, একি আজব কারখানা! আপনি তো ঈশ্বরের কথা বলে নিজের ‘জাত‘ মেরে দিলেন! বিজ্ঞানে ও যুক্তিবাদে আপনার বিশ্বাস ও জ্ঞানের অপরিসীমতা নিয়ে যারা আপনার পক্ষে সাইবার জগতে ঝড় তুলে দিলেন, তাদের আপনি এভাবে অপদস্থ করে দিলেন! কি সর্বনাশের কথা। এবার তো আপনি এদেরকেও নিজের বিরোধী পক্ষ বানিয়ে দিলেন! তারা কিন্তু এমনও বলেছেন যে, ডাক্তারদের ধর্মঘট করা উচিৎ কারণ আপনি বলেছেন যে, আপনাকে সারিয়ে তুলেছেন আল্লাহ! কী উপায় হবে এখন?

আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আপনার ভক্তরা এটুকু পড়েই আমাকে গালি দিতে শুরু করবে। আবার যারা আপনার ভক্ত নয় তারাও গালি দিতে থাকবে। তবে আমি বলছি কি, আপনি আসলে কাদেরকে পথ দেখাবেন? আপনি বলেছেন বিভ্রান্তদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক। কারা সেই বিভ্রান্ত? আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, কুরআন পড়ে না বুঝে  কিংবা না পড়ে যারা বিভ্রান্ত, তারা ধর্মান্ধ, তাদের চিন্তা পরিধি শিকলে বন্দি। আবার যারা নিজেদেরকে নাস্তিক বলে মুক্তচিন্তুক বলে দাবী করছেন, তারা মুক্তচিন্তার দোহাই দিয়ে যে বিশ্বাসে নিজেদের আবদ্ধ করছেন যা কিনা তাদেরকেও অন্ধ করে রেখেছে! নয় কি?

আমি হতাশ! এই আস্তিক্য-নাস্তিকের প্রোপাগান্ডায় নিজেকে কুলষিত মনে হচ্ছে, ক্লান্ত বোধ করছি। আপনিই বলেন মুক্ত চিন্তা কি? আপনিই বলেন, মুক্তচিন্তায়ও যদি গোঁড়ামিই চর্চিত হবে, তবে আর বিশ্বাসী/অবিশ্বাসীদের অথবা গোঁড়া/মুক্তচিন্তকদের মাঝে পার্থক্য কোথায়? মুক্তচিন্তকরা যদি অন্যের চিন্তা বা বিশ্বাসকে সম্মানই দিতে না শিখে, মেনেই নিতে না পারে, ব্যঙ্গ করে অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসীদের মতোই, তবে তারা কিভাবে এই সমাজের চিন্তাকে বদলানোর আশা করেন? যখন কেউ ধর্মে  বিশ্বাস দেখে ব্যঙ্গ করে দৃঢ় প্রত্যয়ে জানতে চান যে, ইসলামে আল্লাহ একটি কাল্পনিক চরিত্র নয় সেটি প্রমান করতে পারবো কিনা, তখন আপনি কি তার এই বিভ্রান্তি দূর করতে পারবেন যে, আল্লাহ যে কাল্পনিক কোনো চরিত্র, সেটি তিনি প্রমাণ করতে পারবেন কিনা? 

কেনো কেউ এটা বুঝতে পরে না যে, আস্তিক্য ও নাস্তিক্যর অবস্থান আসলে একই দড়ির ওপরে? কেনো তারা বোঝে না যে, দু’দলই এমন কিছু বিশ্বাস করছে যেটা তাদের অজানা, যেটা শুধুমাত্র বিশ্বাসের ওপরেই ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে? কেনো তাঁরা বোঝে না যে, তাদের কোনো পক্ষেরই এই ক্ষমতা নেই তাদের নিজেদের বিশ্বাসকে প্রমাণ করার? কেনো যার যার বিশ্বাস, তার তার কাছে এই সত্যটিকে আমরা সম্মান করতে পারি না? আপনি কিসে বিশ্বাস করেন কি করেন না, সেটি কি একান্তই আপনার ব্যক্তিগত বিষয় নয়? 

প্রিয় স্যার,

আপনি এমন এক সমাজের পরিবর্তন করার জন্য নিজের জীবন সপে দিয়েছেন, যেখানে কিনা আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস নিয়ে ভরা সভাতে কৈফিয়ত দিতে হয়। সেই সমাজ যেখানে অন্য অনেকের মতোই আপনার বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের ওপর নির্ধারিত হয়, আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি মেরে ফেলা হবে! সেই সমাজ যেখানে ‘প্রগতিশীলরা‘ ধরেই নেন যে, আপনি ইসলাম ধর্মে কতটা বিশ্বাস করেন সেটির প্রমাণ দেবার জন্য আপনার কুরআন পঠনের প্রসঙ্গেও আলোচনা করতে হয়। কেনো এবং কোন প্রসঙ্গে আপনি এই মন্তব্য করেছেন যে ‘প্রগতিশীল‘রা এটাই বুঝতে পারেন না, তারা কিভাবে বিপ্লব ঘটাবে ঘুণ ধরা মানসিক কাঠামোতে এটা নিয়ে আমি বিভ্রান্তি আছি! সেই সমাজ যেখানে অন্যায়, জামাতী সংগঠন আর যুদ্ধ-অপরাধীদের নিয়ে কথা বললেই অনেকের মতো আপনাকেও নাস্তিক বলে প্রচার করা হয়! সেই সমাজ যেখানে ক্ষমতার কর্ণধাররাই বলেন যে, হামলাকারীরা জাহান্নামে যাবে! অথচ কবে সে জাহান্নামে যাবে এই অপেক্ষায় না থেকে এধরনের সকল হামলা এবং হত্যা মামলাগুলো সুরাহার ও অপরাধীদের শাস্তি দেবার কোনো আভাস আদৌ দেখা যায় না!!

স্যার, এটি সেই সমাজ যেখানে আপনি আস্তিক কিংবা নাস্তিক, যাই হোন না কেনো বিরোধী পক্ষ তৈরি হবেই আপনার। কারণ আপনি বদল চাইছেন, সেটা শুধু কলমে নয়, স্বশরীরে মাঠে নেমে। অন্য আর দশজন মুক্তচিন্তকদের মতো রোমান্টিসিজমের বশে নয়, বরং বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে। সমাজের মাথাগুলোই যখন গভীর বিভ্রান্তিতে তখন আপনি কাকে রেখে কার বিভ্রান্তি দূর করবেন? কাকে রেখে কাকে নিজের শত্রুর তালিকা থেকে ছাটাই করবেন? পিঠ বাঁচিয়ে চলা আপনার অভ্যাস নয়, তাও বলি, যা কিছুই করবেন, শুধু মনে রাখবেন আপনাকে এই দেশের খুব প্রয়োজন। আমাদের জন্য, আমাদের সন্তানদের জন্য আরও অনেক বছর আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে।


  • ৫২৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল

নৃবিজ্ঞানী ,গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও অনলাইন লেখক

ফেসবুকে আমরা