আসল কথা হচ্ছে -আমি মহিলা মানুষ

শনিবার, মার্চ ১০, ২০১৮ ৪:৪৭ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


সকাল বেলা বাচ্চাদের কে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে জ্যাম ঠেলে মিরপুর আসতে আসতে মাথা টা এমনিই নষ্ট হয়ে যায়... তার উপর যদি কেউ উটকো কেওয়াজ করে তো মাথার তার ছিড়ে যায়... গত ৮ তারিখে বাচ্চাদের স্কুল থেকে ফেরার পথে টেকনিকেলের মোড়ে পূর্বাচল গ্যাস ষ্টেশনে গেছি গ্যাস নিতে, গ্যাসের প্রেশার কম বলে সবগুলো লাইনে গ্যাস দিচ্ছে না, গাড়ীর লাইন জমে যাচ্ছে। আমাদের গাড়ীটা কোনোরকমে লাইন পেলো, আমি গাড়ীর বাইরে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি করছি আর দেখছি যে গাড়ী সিরিয়াল পেলেও গ্যাস পাচ্ছে না। গ্যাস যে দিচ্ছে সে আমাদের গাড়ী দাঁড় করিয়ে দুইটা সি এন জি কে গ্যাস দিলো যা নিয়মের বাহিরে, সি এন জি গুলোকে আলাদা লাইনে গ্যাস দেয়া হচ্ছিলো। সি এন জি ড্রাইভার দুইজন তাকে টাকাও দিলো এক্সট্রা। একজন টাকা না দিয়ে চলে যেতে গেছিলো, তাকে পেছন থেকে ডেকে নিয়ে ঝাড়ি দিয়ে তার থেকেও ৪ টাকা নিয়ে নিলো...!

আমি খুব ভদ্রভাবে জানতে চাইলাম ওই সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে- আপনি যে গাড়ী দাঁড় করিয়ে রেখে সি এন জি কে গ্যাস দিলেন… এইটা কি এখন নিয়ম হইছে? আপনাদের কর্তৃপক্ষ কি এই সাময়িক নিয়ম করে দিছে যে দুইটা সি এন জি কে গ্যাস দিবেন তারপর একটা গাড়ী কে গ্যাস দিবেন- এমন কিছু কিনা? সেই লোক আমার উপর খেই খেই করে উঠে বললো- হ দুইটা সি এন জি রে গ্যাস দিছি তো কি হইছে? আমি বললাম, আপনি তো তার থেকে আলাদা টাকা নিলেন, টাকা নিয়ে তাকে গ্যাস দিলেন আগে আর আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। কেনো?

সেই লোক আরো বেশী খেই খেই করে উঠে বললো যে, টাকা নিছি আপনার কি? আপনারে কি তারা বিচার দিছে? তারা ইচ্ছা করে টাকা দিছে- আপনার কি? আপনি অফিসে টাকা দিয়া ফাইল ছাড়ান যেমন তেমন তারাও টাকাও দিছে...!

মাথার ভেতর তখন প্রচন্ড পাগল পাগল লাগতেছে, মারার জন্য হাত নিশপিশ করতেছে তারপরও বললাম, আমি টাকা দিয়ে কাওকে দিয়ে কাজ করাই না, টাকা নিয়ে কারো কাজ করেও দেই না... জিজ্ঞেস করলাম, এইভাবে টাকা নিয়ে আগে গ্যাস দিতে বলছে আপনার মালিক?

সে আবারো খেই খেই করে বললো যে, হ মালিক অনুমতি দিছে, আপনি টাকা লেনদেন করেন না? আপনিও তো বিভিন্ন অফিসে গিয়ে টাকা দিয়ে ফাইল ছাড়ান...! আপনি ঠিকই টাকা দেন...!

মারলাম না, কিন্তু নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণও করতে পারলাম না, দিলাম চিৎকার তারপর ভদ্র গাইল... তার সামনেই টাকা কালেক্ট করার লোক বসে আছে, তারা এসব টাকার লেনদেন দেখছে এবং হয়তো ভাগও নিচ্ছে তাই চুপ করে থাকে... আমার চিৎকার তো থামতে চায় না, সার্ভিস প্রোভাইডার লোকটা মনে হয় একটু ভয় পেলো এবং চুপ করলো...

টাকা দিতে গেলাম যেই ছেলেটার কাছে তার কাছে জানতে চাইলাম, আপনারা নাকি অনুমতি দিছেন এমন অন্যায় ভাবে গাড়ী লাইনে দাঁড় করিয়ে টাকা নিয়ে সি এন জি কে গ্যাস দেয়ার জন্য? 

সে এই কথার উত্তর দিলো না বরং যেই কথা বললো তাতে সেদিন ঐ ছেলের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু সেখানেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলাম এবং দিলাম গালি... ছেলেটা আমাকে বললো -মহিলা মানুষ হয়ে আপনি এতো চিৎকার করলেন কেনো?- দিলাম গালি আর ইচ্ছা মতো চিল্লাইলাম... ওরা আমার সাথে আর কোন ঝগড়া করলো না, চুপ করে গেলো।

একে তো অন্যায় করতেছে তার উপর তর্ক করতেছে তার উপর বলতেছে আমি ঘুষ লেনদেন করি...! নিজেদের অন্যায় গুলোকে চাপা দেয়ার জন্য, জায়েজ প্রমাণের জন্য তারা আমাকে ঘুষখোর/ ঘুষদাতা উপাধি দিয়ে দিচ্ছে... ভাবতেছে ওরা নিজেরা হারাম খাচ্ছে অন্যায় করছে এবং বাকী সবাইই ওদের মতোই...চোরের মা'র গলা সব থেকে উঁচুতে বড়...

আসল কথা হচ্ছে -আমি মহিলা মানুষ। আমি মহিলা মানুষ বলেই ওদের এত দুঃসাহস হয়েছে... ভেবেছে মহিলা মানুষ তো কিছু বুঝে না, কিছু বলতে পারে না এবং মহিলা মানুষের তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার বা চিল্লায়া কথা বলার কোনো অধিকার নাই...

মহিলা মানুষের পেটের ভেতর জন্ম নিয়ে, তার শরীরের রক্ত খেয়ে, তার বুকের দুধ খেয়ে, বুকের ওমে বাঁচতে শিখে, তার জিম্মায় লালিত পালিত হয়ে হাত পা লম্বা হওয়ার পর পুরুষগুলোর মনে হয় যে, তারা এখন একেকটা চ্যাটের বাল হয়ে উঠেছে তাই মহিলা মানুষ তার পা'র তলে থাকবে, নীচু গলায় কথা বলবে, সমস্ত অন্যায় অপরাধ মুখ বুজে সহ্য করে নিবে...

আমার তো ঐ শুয়রের বাচ্চাকে পায়ের নীচে ফেলে পারাইতে মন চাইছিলো, ঐ হারামজাদার চেয়ারে আগুন লাগায়া দিতে মন চাইছিলো কিন্তু কিছুই করতে পারি নাই। শুধু চিৎকার কইরা উচিত কথাগুলো বলছি আর গাইল দিছি আর কইছি গলার নলি টাইনা ছিড়া ফালামু। শালার পুরা সমাজটাই তো এই রকম।

সমাজের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই তো এইভাবেই ভাবে... একটা দুইটা নলি টাইনা ছিড়লে আর কতটুকুই বা পরিবর্তন আসবে? তবে হ্যাঁ, নলি টাইনা ছিড়লে খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হইলেও দৃষ্টান্ত স্থাপিত হইতো, মানুষের ঘুমে একটুখানি ব্যাঘাত ঘটতো - নলিটা টাইনা ছিড়লাম না কেনো সেই কষ্টে দুইরাত ঘুমাতে অসুবিধা হইছে আমার। আমি তো সেই বান্দা যে আবদ্ধ বাক্সে আটকে পরে মরতেছে জেনেও শেষ ধাক্কাটা দিয়ে মরি তারপরও লিটারেলি আমি ওদেরকে পা'র নীচে পারাইতে পারি নাই, ওদের নলি টেনে ছিড়তে পারি নাই। এই সমাজ এই রাষ্ট্র চারপাশের মানুষ আমাকে আবদ্ধ করে মেরে ফেলেছে আসলে। শুধু স্বপ্ন দেখি, মৃত এই আমিটাই একদিন এইসব হারামজাদাদের পায়ের তলে ফেলে পিষে ওগুলোর গলার নলি টেনে ছিড়ে ফেলতে পারবো!


  • ৪৫৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শামীম আরা নীপা

এক্টিভিস্ট

ফেসবুকে আমরা