কুমার দীপ

কবি-প্রাবন্ধিক-গল্পলেখক কুমার দীপ পেশায় একজন শিক্ষক।

এই মুহূর্তের নারীভাবনা : হয়তো অরণ্যে-রোদন

যাদেরকে আজকের মানবজাতির পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়, সেই নিয়ানডার্থাল কিংবা হোমো এরিকটাস অথবা হোমো এরিকটাসের বংশধর হোমো সেফিয়েন্স- এদের প্রত্যেকেরই আবির্ভাবের প্রায় ৫০ হাজার বছর পরে; যে যুগে মানুষ আগুনের বিবিধ ব্যবহার রপ্ত করেছিল, চামড়া-শন দিয়ে পোশাক বানাতে শুরু করেছিল, সেই প্রস্তর যুগেরও প্রায় ২০ হাজার বছর পরে; সভ্যতার অগ্রগতির অবিশ্বাস্য শিখরদেশে উপনীত হয়েও- সেই সভ্যতারই অন্যতম সূত্রধর-সহযোগী নারীকে ভাবতে হচ্ছে তার অস্তিত্ব নিয়ে! ভাবতে হচ্ছে তার নিরাপত্তা ও নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে! তাও আবার বাঘ-সিংহ কিংবা অন্য কোনো হিংস জন্তু-জানোয়ার নয়, তারই সহযোগী পুরুষ সম্প্রদায়কে প্রতিপক্ষ হিসেবে বাধ্যত দাঁড় করিয়ে! এইসব হিংস্রতা থেকে নিস্তার পাওয়া বা দেওয়ার জন্য পাতার পর পাতা লিখতেও বাধ্য হচ্ছেন মানবতাবাদী মানুষেরা!

 

কিন্তু কার জন্যে লিখবো? যার জন্যে লিখবো, সে হয়তো এই মুহূর্তে কোনো সালেহাকে লাঞ্ছিত করবার প্রস্তুতি নিচ্ছে; যার জন্যে লিখবো- সে হয়তো পথের কোনো যাত্রীবাহী ভ্যান বা মোটরসাইকেল থেকে কোনো মালতীকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নিচ্ছে পাশের বাগানে বা নির্জন বাসায়, তাঁর চূড়ান্ত সর্বনাশ করবে বলে; যার জন্যে লিখবো- সে হয়তো রাতের বাসের হেলপার, কন্ডাক্টর কিংবা ড্রাইভার, একাকী রূপাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার আগেই খেয়ে ছিবড়ে অতঃপর ঘাড় মটকে ফেলে দিচ্ছে পথের পাশের জঙ্গলে! কার জন্যে লিখবো? যে লোকটা নিজের মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাইরে বের হয়ে অন্যের মেয়ের দিকে অশালীনভাবে তাকায়; যে লোকটা নিজের স্ত্রীকে ঘরে বন্দি রেখে বাইরে পরকীয়া করে ফেরে; যে ছেলেটা বোনকে সাবধানে থাকতে বলে অন্যের বোনের দিকে লোলুপ হাত বাড়ায়, যে লোকটা নিজের মেয়েটিকে পাশববৃত্তির বাইরে রাখতে পারে না, তার জন্যে? তাদের জন্যে? সে বা তারা কি এসব পড়বে? পড়লেও গায়ে মাখবে? যে লোকটা সমাজের উচ্চ সম্মানজনক স্তরে বসে বসে নারীশরীরের অবৈধ স্বাদ নিচ্ছে; পয়সা আছে বলে যে লোকাট নারীকে কেবল ভোগ্যপণ্য হিসেবেই ভাবছে; যে লোকটা ধর্মের লেবাস পরে নিরন্তর সেবাপ্রাপ্তির ছলে রমণীমোহন রাম রহিম হয়ে উঠছে- সেই লোকটা বা লোকগুলো তো কখনই আমার বা আমাদের এই ধরনের রচনা পড়বে না। পড়লে মানবেই বা ক্যানো? নীতিকথা মেনে বিবেকবান হওয়া কিংবা মানবিক হয়ে ওঠার মানেই তো হলো- জীবনটাকে অভোগ্য রেখে দেওয়া ! যাদের কাছে জীবনের মানেই হলো ভোগ-বিলাস আর শরীরী উন্মাদনা, তাদের জন্যে এইসব লেখালিখি ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত। কিন্তু বনের পাখির অভ্যাস গান গাওয়া; কেউ শুনুক বা না শুনুক, সে গাইবেই। তেমনি যুক্তি, দর্শন, সভ্যতা বা মানবতা যাদের আরাধ্য, তারা লিখবেনই; কেউ পড়ুক বা না পড়ুক। তাছাড়া, নদীতে স্রোত প্রবাহিত হলে, কেউ না কেউ তো দেখবেই। কারো না কারো অন্তরে সে তো স্রোতস্বিনীর মর্মগাথা উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবেই। এই ভেবেও তো আমরা অক্ষরগুলোকে মানবিক করে তুলতেই পারি।

নারী জাগরণের অগ্রদূতী রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন অনেক আগেই বলেছিলেন, আমাদের এই সমাজটা একটি গরুর গাড়ির (গো-শকট ) ন্যায়। গাড়ির দুটো চাকা, যার একটিকে ধরা যেতে পারে পুরুষ, অন্যটিকে নারী। কোনো একটি চাকা যদি সুন্দর ও স্বাভাবিক হয়, অন্যটি যদি ছোটো বা বাঁকা হয়; গাড়িটি তবে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। গাড়িটির চলবার জন্যে যেমন দুটো চাকাই সমান দরকার, সমাজের স্বাভাবিক অগ্রগতির জন্যে নারী-পুরুষেরও তেমনি সমান ভূমিকা দরকার। সমান ভূমিকার জন্যে চাই সমান অধিকার, সমান অর্জন। তারপর বহু সময় গড়িয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি বাইরে বেরিয়েছে নারী। শুধু ঘরে নয়, বাইরেও পরিচয় দিচ্ছে নিপুণতার। বহুদূর এগিয়েছে মানবসভ্যতা। তবু মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে- সভ্যতা এগিয়েছে, কিন্তু মানব কি এগিয়েছে? যদি এগিয়েই থাকে, তবে এতো হানাহানি আর অসূয়াবৃত্তির মহড়া বেড়েই চলেছে ক্যানো? এমন অসহিষ্ণুতা যে, মুহূর্তের প্রতিহিংসা থেকে জন্ম নিচ্ছে খুনি-ধর্ষক-লুণ্ঠক। অন্যদিকগুলোতে না হয় এই মুহূর্তে নাইবা তাকালাম, যাদের নিয়ে লিখতে বসেছি- সেই নারীরা কি আজও সমানত্বের মর্যাদা পেয়েছে? নারী-পুরুষ কেউই হয়তো নিরাপদ নয়, যে কেউই সকালে বাইরে বের হয়ে বিকেলে বা সন্ধ্যায় ঘরে নাও ফিরতে পারে। পুরুষের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা নারীর আছে, কিন্তু নারীর সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কি পুরুষের আছে? পথদুর্ঘটনা-ছিনতাই-গুম-হত্যা এসবের বাইরে নারী যে তার রক্তমাংসের শরীরখানির জন্যে পাশের-সামনের-পিছনের প্রায় সমস্ত পুরুষের কাছে লিপ্সাবৃত্তির সামগ্রী হয়ে উঠছে; অনেকের নিকট থেকেই নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত পাচ্ছে; কেউ কেউ তাকে নিরাপত্তাহীন করেই ছাড়ছে, কখনও কখনও জীবন দিয়েই বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে- নারী কতটা নিরাপত্তাহীন! এসব কি পুরুষের আছে? একই ক্লাসে অধ্যয়ন করছে, সহপাঠী ছেলেগুলো তাকে অন্যভাবে দেখছে; কোনো কোনো শিক্ষকও তার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন! একই অফিসের পুরুষ সহকর্মীটি বার বার তার দিকেই ক্যানো তাকাচ্ছেন? একই রাস্তায়, একই মৌসুমে নারী-পুরুষের চলনের কী তফাৎ! একা পুরুষ ফিরতে পারে ঘরে, একা নারীর ফেরার সম্ভাবনা যে ক্রমশই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে! মেয়েকে বাইরে পাঠিয়ে বাবা-মা সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকেন; বোনকে এগিয়ে দিয়ে এসে ভাইকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতে হচ্ছে। যার মেয়ে নেই, বোন নেই, মেয়ে স্বজন নেই; তিনি যদি মানবিক হন, তাকেও প্রতিনিয়ত ভাবতে হচ্ছে- কী জানি আজ কোন খবর আসে? কোথায় আবার কোন তিশা-সীমা-তনুরা ধর্ষিত ও নিহত হচ্ছে!

শুধু কি বাইরে? ঘরেও কি বিপদ নেই? ভারতবর্ষ থেকে সতীদাহ নামক বর্বরতা প্রত্যাহারের প্রধান পুরুষ, সে যুগের আধুনিক মানুষ রামমোহন রায় ঘরে ঘরে নারীদের দুর্দশা দেখে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বিবাহের সময়ে স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গ করিয়া (বলিয়া) স্বীকার করেন, কিন্তু ব্যবহারের সময় পশু হইতে নীচ জানিয়া ব্যবহার করেন’। ব্যবহারের এহেন নমুনা তখন যেমন ছিলো, এখন তেমন নেই বটে; কিন্তু একেবারেই কি কমেছে? তখন যেটা স্থূল ছিলো, প্রকট মনে হতো; এখন সেটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সূক্ষতা পেয়েছে বৈকি, কিন্তু মিলিয়ে যায়নি একেবারে (যেসব পরিবারে মিলিয়ে গেছে বা যাচ্ছে, মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত আছে বা হচ্ছে; সেই অল্পসংখ্যক পরিবার নিশ্চয়ই এই মন্তব্যের বাইরে) অনেক পরিবার থেকেই মেয়েকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তুই মেয়ে, ও ছেলে; ওর আর তোর মধ্যে অনেক তফাৎ। কোনো কোনো পরিবার তো স্পষ্টতই বুঝিয়ে দেয়- মেয়েরা কেবল মেয়ে বা মহিলা, মানুষ নয়। অনেক পরিবার নারীকে বাগে রাখা বা রক্ষা করবার অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে শাস্ত্র আর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দেশাচারকে। বিধবা বিবাহের প্রচলনে সংগ্রাম করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর দেখেছিলেন, শাস্ত্র আর দেশাচারের দোহাই দিয়ে এই সমাজ নারীর প্রতি কী বর্বরতাই না দেখিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে! নারীর শিক্ষা, সমানাধিকার, সামাজিক মর্যাদা এসমস্ত বিষয় নিয়ে সকল সমাজে লড়াই একেবারে কম হয়নি। প্রথম বাঙালি আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবী কিংবা প্রথম আধুনিক বাঙালি নারী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী থেকে শুরু করে রোকেয়া-সুফিয়া কামাল-নূরজাহান বেগম প্রমুখেরা অনেক চেষ্টাই করেছেন; অনেক পুরুষ সমাজচিন্তকও সহযোগী হয়েছেন; তাঁরা সকলেই কম-বেশি সফলও যে হয়েছেন তার প্রমাণ আজকের সমাজে বিদ্যমানও বটে। তথাপি এই সমাজটাকে সত্যিই সভ্য করে তুলতে চাই, মানবিকরূপে দেখতে চাই, উন্নত হিসেবে দাবি করতে চাই- তাহলে নারীকে কেবল নারী নয়, মানুষ হিসেবেই সমান অধিকার দিতে হবে; সমমর্যাদায় জীবন অতিবাহিত করবার যাবতীয় নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। পথে বের হয়ে কোনো বোন, কোনো মেয়ে বা কোনো স্ত্রীই যেন লাঞ্ছনার শিকার না হয়, কারো জীবনপ্রদীপ যেন অকালেই নিভে না যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারা করবে? যেহেতু শারীরিক শক্তিতে এবং ক্ষমতার প্রতিপত্তিতে পুরুষরাই এগিয়ে; যেহেতু এই সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতা-ইতিহাস সকল কিছুই নিয়ন্ত্রণের প্রায় একচ্ছত্র মালিকানা পুরুষের করায়ত্ত হয়েছে; তাই পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। যদি তা না হয়, তাহলে এইসব লেখা-যোখা আলোচনা-সমালোচনা এ-কেবল অরণ্যে-রোদন বলে পরিগণিত হবে।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।