আরিফা আক্তার

দুই সন্তানের জননী আরিফা পেশাগত জীবনে স্কুল শিক্ষক।

সন্তান জন্মদানে নারীর সিদ্ধান্তই হোক প্রধান

এক পুরুষ কলিগের একটা মন্তব্য শুনে আমরা শিউরে উঠেছিলাম। তিনি খুব রসালো ভঙ্গিমায় আরেক পুরুষ কলিগকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন এই বলে যে ঘন ঘন বাচ্চা নিবা, যেন বউ ইয়াং থাকতে না পারে! আমরা মহিলা কলিগরা তার বাক্য শুনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিলাম অবাক হয়ে। একজন স্বামী, একজন পিতা, একজন মানুষ এভাবে ভাবতে পারে? নিজের সঙ্গীকে দ্রুত বৃদ্ধ বানানোর এই ভয়ংকর চিন্তা মস্তিষ্কে লুকিয়ে রেখে কীভাবে স্বাস্থ সম্মত জীবন যাপন করে মানুষ?

এই ঘটনাটা শুধু একটা ঘটনা নয়, এটা পুরো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আধিপত্যবাদের চিত্র। নারীকে যে কোনো মুল্য দমিয়ে রাখতে পুরুষতন্ত্র সোচ্চার। নারী সুস্থ থাকলে, নারীর বুদ্ধির সুস্থ বিকাশ ঘটলে, শিক্ষার গুনে গুণান্বিত হলে তা পুরুষতন্ত্রের জন্য আঘাত স্বরুপ। এজন্য সর্বদা নারীকে দমিয়ে রাখার প্রক্রিয়া চলমান। যখন জোর খাটিয়ে নারীকে দমানো সম্ভব হয় না তখন পুরুষ বা পুরুষতন্ত্র আবেগীয় কৌশলের আশ্রয় নেয়। নারীকে আবেগীয় নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায় হলো তাকে সংসার, সন্তান, তথা গৃহকোণের মায়ায় আটকে ফেলা। এজন্য দেখা যায়, সন্তান নিতে নারীকে বাধ্য করতে না পেরে ভালোবাসা নামক কৌশলের আশ্রয় নেয়।

সন্তান নারীর সবচেয়ে বড় আবেগ। তাবৎ তাবৎ বুদ্ধিমান নারী এখানে এসে আঁটকে যায় ভালোবাসায়। নিজের ক্যারিয়ার, শখ, এমন কি শরীরের সুস্থতা বিসর্জন দেয় সন্তানের নামে। সন্তান লালন-পালনে একমাত্র রেসপন্সিবিলিটি নারীর। যতরকমের যুক্তি বা তর্ক করা হোকনা কেনো, সন্তান নারীর দায়িত্ব। নিজের শরীর ভেদ করে যে সন্তানের জন্ম হয় তার প্রতি যে মায়া সে কোনো আইন দিয়ে বোঝানো বা ফেরানো যায় না।

এজন্য পুরুষতন্ত্র নারীর এই দূর্বলতার সুযোগ নেয়। যেনো নারী একটা জায়গায় আটকে থেকে জীবনের অন্যদিক থেকে বঞ্চিত হয়, জীবনকে উপভোগ করতে না পারে। নারীর বহুমুখী প্রতিভা, অফুরন্ত প্রাণশক্তি পুরুষের ভয়ের কারণ। একজন নারীকে সত্যিকার সুপারম্যান হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সবচেয়ে সহজ হয় নারীর এই গুনকে স্বীকৃতি দেয়া। কিন্তু এতে পরে পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যবাদে বাধ সাধবে নারী, এই ভয়ে নারীকে দমিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর তারা। তাইতো পুরুষ চায়, নারী দূর্বল থাকুক, প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পরুক। ছলেবলে কৌশলে নারীকে গৃহকোণে বন্দী রাখতে পারলে তাকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় পুরুষের জন্য।

মাতৃত্ব মোটেও সহজ কোনো বিষয় নয়। একজন নারীর শরীর মনে যে প্রভাব সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে পড়ে তার ভার বহন কতোটা কঠিন তা শুধু নারী ই বোঝে।

সন্তান নারীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসার দায় আর কারো নেই। তাই দায়িত্ব নারী আপনা আপনি কাঁধে নিয়ে নেয়। সুতরাং, নারী সন্তানকে দায়িত্ব মনে করে জন্ম না দিয়ে ভালোবেসে জন্ম দিক। সন্তান লালন-পালন কে উপভোগ করুক। নিজের সুস্থতা, সার্বিক দিক বিবেচনা করে সন্তান পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্ত নিক। অন্যর চাহিদার চাপ মাথায় নিয়ে নয়। ভালোবেসে জন্ম না দিলে দায়িত্ব স্বঠিক ভাবে পালন সম্ভব নয়। একটা সন্তানকে পৃথিবীর জন্য নিরাপদ, মূল্যবান করে গড়ে তুলতে তাকে যত্ন নিয়ে গড়ে তুলতে হয়। সন্তানের সার্বিক দেখভাল যেহেতু নারীকেই করতে হয়, তাই সন্তান জন্ম দেয়া বা না দেয়ার গুরু সিদ্ধান্ত নারীর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হোক।

501 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।