আরিফা আক্তার

দুই সন্তানের জননী আরিফা পেশাগত জীবনে স্কুল শিক্ষক।

একটি নারীবিদ্বেষী, অযৌক্তিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রজন্ম, দায় কার?

আমার চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেকে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই পড়াচ্ছিলাম। দ্বিতীয় অধ্যায়ে নারী ও পুরুষ শিরোনামের বিষয় বুঝানোর সময় ছেলে আমাকে থামিয়ে দিলো। এই অংশের বিষয় ছিলো নারী পুরুষের বৈষম্য না করা। সেখানে লেখা আছে পরিবারের সকল কাজে নারী পুরুষদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নারী পুরুষ উভয়ই সকল কাজের যোগ্য, নারী পুরুষে কোনো কাজে বৈষম্য করা উচিত নয়। ছেলে আমার এখানে এসেই থমকে গিয়ে প্রশ্ন করলো। তার কথা হলো নারী পুরুষের সকল কাজে অংশগ্রহণ এবং উভয়ই সকল কাজের যোগ্য হলে মৃত মানুষের জানাজা বা কবরে কেনো মেয়েরা যায় না!

আমার ছেলেটা বিনাবাক্যে মুখস্থ না করে বিষয় বুঝতে পেরেছে এবং ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও প্রশ্ন করার বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়েছে, এটুকু আশার আলো আমার জন্য। কিন্তু পরেরটুকু শুধুই হতাশার!

একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা জগাখিচুরি তা বুঝতে হলে ধর্ম শিক্ষার বই আর বিজ্ঞান বা বিশ্বপরিচয় বই পাশাপাশি রাখলেই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। একটা ছোট্ট শিশু প্রাথমিক শিক্ষার শুরুতেই ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মতো পরস্পর বিরোধী মতোবাদের মুখোমুখি হয়। তার মনে প্রথমেই দ্বন্দ্ব শুরু হয় শিক্ষা নিয়ে। একেতো পরিবারের বিশ্বাসের চর্চা, তার উপর পাঠ্যপুস্তকে এধরণের বিরোধিতা। শিশুমনে সে কোনটাকে গ্রহণ করবে? দুইটা বইয়ে দুই ধরনের মতবাদ বিদ্যমান। ধর্মবইগুলোতে যে ধরনের শাস্তির বিধিবিধান আর কাহিনি লেখা থাকে তাতে করে শিশুরা শিক্ষার শুরুতেই ভীত হয়ে উঠে মৃত্যপরবর্তী জীবন নিয়ে। যেখানে বিশেষজ্ঞরা শিশুদের যে কোনো ধরনের ভায়োলেন্স থেকে দুরে রেখে আনন্দমুখর পরিবেশে শিক্ষার  কথা বলেন সেখানে ধর্মবইগুলো তাদের কে কঠোর শাস্তি আর নানারকম বিধিনিষেধে জীবন যাপনের কথা বলে। 

শিশুরা স্বভাবতই নিষ্ঠুরতায় ভয় পায়। বইয়ে লেখা এসব শাস্তির কথা তাদের কোমল মনে গেঁথে যায় ভয়ানকভাবে। ফলে তারা অন্যান্য বই পড়লেও সেগুলো শুধু মুখস্থবিদ্যা হিসেবে থেকে যায়, মগজে রয়ে যায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব। তার সাথে পরিবারের চর্চা তো রয়েই যায়। ফলে বড় হয়ে বিজ্ঞান পড়লেও সেটাকে তারা জাস্ট অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে লাগায়। মনে প্রাণে কখনো বিজ্ঞান মনস্ক হয়ে গড়ে উঠেনা। সমতার কথা, বিজ্ঞানের কথা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, ধর্ম আঁকড়ে থাকে মননে। তাইতো আমরা বড় বড় শিক্ষিত ব্যক্তি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, যারা বিজ্ঞান পড়ে, তাদেরকেও (সামান্য ব্যতিক্রম বাদে) অন্ধ বিশ্বাসী হতে দেখি। আমরা অবাক হই এই ভেবে যে, এত পড়েও কেনো কুসংস্কারে ঢেকে থাকে মগজ। আমরা শিক্ষার শুরুতেই শিশুদের দ্বান্দ্বিক বিষয়ের মুখোমুখি করি, শিশুমনে এর প্রভাব ভয়ানক। সারাজীবনের শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে আমাদের পরস্পর বিরোধী শিক্ষা দেয় সেখানে আমরা নিজ জীবন, সমাজ বা রাষ্ট্রে কিভাবে স্বচ্ছতা আশা করি?

একটি দেশের ভবিষ্যৎ হলো তার শিশুরা। দেশ কোন পথে হাঁটবে, প্রগতির পথে না প্রতিক্রিয়ার পথে তা নির্ধারণ করে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি দ্বিমুখী হয় তবে কোনভাবেই জনগোষ্ঠী দেশের অগ্রগতিতে সমানতালে অবদান রাখতে পারবে না।

এক-ই সাথে শিশুরা পৃথিবীতে মানব আবির্ভাবের ধর্মীয় কাহিনি আর বিবর্তনবাদ পড়ে। তো, কোনটাকে তারা সত্য বলে ধরে নেবে? ধর্মগুলো শেখায় নারীর শৃঙ্খলিত জীবনের মাহাত্ম্য অন্যদিকে বিজ্ঞান শেখায় নারী-পুরষের সমানতালে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দ্বিচারিতা কেনো? দেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী পুরুষে বৈষম্য মনোভাব, কুসংস্কার, অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, এগুলোর দায় কী প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ঘাড়ে বর্তায় না?

418 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।