‘আনন্দময়ী’ স্ট্রেস রিলিফ হোম: নাহিদ সুলতানার স্পার্মবিহীন শিশু সন্তান

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৩, ২০১৭ ২:০৫ PM | বিভাগ : আলোচিত


স্ট্রেস শব্দের সাথে পরিচয় নাই এমন মানুষ পৃথিবীতে দুই প্রকার: একঃ যাদের আইকিউ ৪০ এর নিচে, যারা বুদ্ধি ও মানসিক প্রতিবন্ধী বা ক্লিনিক্যালি কোনো প্রকার মানসিক আবেগ বুঝতে অক্ষম; দুইঃ যারা বোধিপ্রাপ্ত বা মহাপুরুষ বা মুনি ঋষি, অর্থাৎ দুঃখে যিনি অনুদ্বিগমনা, সুখে যিনি স্পৃহাশূণ্য, যাহার অনুরাগ ভয় ক্রোধ আর নাই, অর্থাৎ যিনি কন্যাকুমারীর মাথায় ঢিস্টিং ঢিস্টিং ধ্যানে বইসা থাকা একজন ঢিস্টিং ঢিস্টিং স্তিতধী মুনি!

তা আমি যেহেতু ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুন্ড তাহে ভারি, বাংলার কই যেন নারীমূর্তিধারী- এবং দুইয়ের এক গ্রুপেও পড়ি না, তাই আমি স্ট্রেসে আক্রান্ত হই। চাকরি নিয়া হই, ডেডলাইন নিয়া হই, ঘর বাড়ি আউলা ঝাউলা দেখলে হই, পার্টনার আমারে গোপন কইরা আমার বন্ধুর স্ত্রীর সাথে পরকীয়া করলে হই, শারীরিকভাবে অসুস্থ হইলে হই, গ্যাসের দাম বাড়লে হই, ডাক্তার আমারে বাঁইচা থাকার জন্য ছয় মাস সময় বাইন্ধা দিলে হই, কোনো রান্নায় লবণ বেশি হইয়া গেলে হই, ঢাকার রাস্তায় জ্যামে আটকায়ে এ্যাপয়েন্টমেন্ট মিসের সম্ভাবনা দেখলে হই, নিজের ইনকাম থিকা ৪০ পার্সেন্ট ট্যাক্স কাইটা রাখা হইলে হই, ফেইসবুকে মেয়েরা আমারে নিজেদের সেক্সুয়াল এ্যাবিউজের গল্প বললে হই, রাত দুইটায় সিগারেটের প্যাকেটে দুইটা সিগারেট অবশিষ্ট থাকতে দেখলে হই, বাপ মেয়েরে ধর্ষণ করছেন এমন কেইসে কাজ করতে হইলে হই, ব্যাংকে টাকার হিসাব মিলাইতে না পারলে হই, এক বছরের বেশি সময় ধইরা শার্লক সিরিজের পরবর্তী এপিসোডের জন্য অপেক্ষা করতে হইলে হই, পছন্দের শ্যানেলের ড্রেসের নিজের মাপমত ‘সাইজ’ খুঁইজা না পাইলে হই।

জন হপকিন্সের কোনো একটা গবেষণায় পড়ছিলাম, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ তার জীবদ্দশায় যত প্রকার অসুস্থতার ভিতর দিয়া যান, তার ‘অন্ততঃ’ ৫% থাকে মানসিক সমস্যা। এবং তার ৯০% সমস্যা শুরু হয় স্ট্রেস দিয়া। মজার ব্যাপার হইতেছে, বেশিরভাগ মানুষ এই মানসিক সমস্যারে আমলে নেন না। আমার মা একটা মশা কামড়াইলেও আমার বাপের কাছে গিয়া বেচারাথারিয়ামের মত মুখ কইরা অভিযোগ করেন মশা তার গায়ের নরম কোমল চামড়া ফুলায়ে নীল বানায়ে ফেলছেন, অথচ তিনিই যে ভয়ংকর ভাবে ও-সি-ডি আক্রান্ত, সেইটা তিনি পাত্তাই দেন না। মশার কামড় উনার কাছে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিস-অর্ডারের চাইতে বড়। শুধু আমার মা না, বাংলাদেশে লোকজন ন্যাংটা হইয়া চৌরাস্তার মোড়ে গিয়া ট্রাফিক কন্ট্রোল করার আগ পর্যন্ত স্বীকার করেন না তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ।

আমি স্ট্রেসরে ছোট কইরা দেখি না। আমি আমার বন্ধু নাহিদ সুলতানার কাছে কৃতজ্ঞ যে উনিও স্ট্রেসরে ছোট কইরা দেখেন না।

নাহিদ সুলতানার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হইতেছে উনি আমার মত স্ট্রেসরে বড় কইরা দেইখা আমার মত চুপচাপ বইসা থাকার বেহুদা পাবলিক না। উনি স্বপ্ন দেখতে পারেন, উনি বিভীষণ স্টাইলে ভূতের ঘাড়ে ছাতার বাড়ি মাইরা সেই স্বপ্নরে বাস্তবায়নও করতে পারেন।

‘আনন্দময়ী’ নাহিদ সুলতানার স্পার্মবিহীন শিশু সন্তান। ‘আনন্দময়ীঃ স্ট্রেস রিলিফ হোম’ এর কনসেপ্ট বাংলাদেশে তো অবশ্যই, সম্ভবতঃ পৃথিবীর মধ্যেই এই প্রথম। এই ‘হোম’-এ মানুষের দৈনন্দিন স্ট্রেসরে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সমাজের কানে লাগানো বিস্ফোরণের সামনে রূপচাঁদ পক্ষীরে সাক্ষী রাইখা আপনার গাইনের গীত শোনা হবে। পৃথিবীতে স্ট্রেস রিলিফের বহু রিসোর্ট আছে সন্দেহ নাই, প্রচুর আশ্রমও আছে যেইখানে গিয়া আপনি মেডিটেশান ফেশান প্রাণায়াম ট্রানায়াম ইত্যাদি কইরা আবার আপনার রিয়াল লাইফে ফেরত গিয়া ‘আয় তবে সম্মুখ সমরে’ বইলা আপনার প্রত্যহ পরিশ্রমের ও অনিদ্রার আবল্যবশতঃ অজ্ঞানপূর্বক অতীতে লাফায়ে পড়তে পারেন, কিন্তু আনন্দময়ীই একমাত্র যে আপনার পোঁটলার প্যাঁচ খোলাইয়া আপনার কথা শুনবে এবং সেই মোতাবেক আপনারে ‘রেমেডি’ দিবে। অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে। (তবে সেই সংক্রান্ত বিষয়ে আমারে জিগায়ে লাভ নাই, আমি আনন্দময়ীর সেল্‌স্‌ ডিভিশানের মধ্যে নাই!)

গত ৩ নভেম্বর গাজীপুরের বনখৈরাতে নাহিদ আমারে দাওয়াত দিছিলেন। নামের মতই অদ্ভুত সুন্দর জায়গা বনখৈরা। পূর্ণিমার রাতে সেইখানে চিতাবাঘ আসেন। দিনের বেলা লাল মুখের বান্দরেরা পিছনের বনস্থলী এবং গাড়ির বনেটের উপর ঘুইরা বেড়ান। সেইখানে আমরা সারাদিন এবং সূর্য ডুবলে সারারাত চারদিকের সমস্ত আলো নিভাইয়া শ্যাওলাধরা পুকুরের পাড়ে বইসা মদ খাইতে খাইতে লাকী আক্তারের ভাওয়াইয়া গান এবং তার কোরাসে প্রলম্বিত অর্গ্যাজমের মতো একটানা নেকড়ের ভৌতিক ডাক শুনতে শুনতে আনন্দময়ী ক্যামন হইতে পারে তা নিয়া উচ্চ হাসিতে, অজস্র খুশিতে, অনর্গল আলাপে ব্যস্ত ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন সোহেল ভাইয়ের এগারোজন কুকুর।

ও, সোহেল ভাই হইলেন সেই ব্যক্তি যিনি আনন্দময়ীরে তার ৮ বিঘা জমি এমনি এমনি দান করছেন। উনি মজার মানুষ। শুধুমাত্র কুকুর এবং মুক্তিযুদ্ধ এবং ভূপেন হাজারিকা এবং আঞ্চলিক জোকস নিয়া উনার সাথে তিন দিন একটানা তূরীয় আনন্দে আড্ডা দেওয়া যায়। যদিও ছবির কেন্দ্রে দাঁড়াইয়াও উনি বিচ্ছিন্ন থাকেন সবার থিকা। উনার জন্য ভালোবাসা।

এই এ্যালবামে আনন্দময়ীর ছবি নাই। এই এ্যালবামে শুধুই দিনের আলোয় আমাদের নিজেদের হাহাহিহির ছবি এবং সেলফি দেওয়া হইলো। কারণ, জানেনই তো, ‘ওয়ান সেলফি আ ডে, কিপ্‌স্‌ ইয়োর স্ট্রেসেস এ্যাওয়ে!’ বন্ধু বিচ্ছেদের মতো ঘন কালো অন্ধকারের গান তাই আনন্দময়ীর অংশ হবে না। তাই আমাদের জাতীয় সংগীত হবে, ‘ও স্ট্রেস ডিয়ার, ভ্রাতা সব কাম হিয়ার/ স্ট্রেস রিলিজ হবে গার্ডেনে, হাত ধরে বান্দর ও কুকুর সনে/ বেড়াইবো নির্জনে, দিবানিশি হৃদয় চিয়ার!’

প্রিয় নাহিদ, তোমার জন্য ভালোবাসা। তোমার এবং তোমার আনন্দময়ীর পথচলা স্ট্রেস-ফ্রি হোক, অনেক অনেক শুভকামনায়-


  • ২১২৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নাদিয়া ইসলাম

নারীবাদী

ফেসবুকে আমরা