অসাম্প্রদায়িক মননশীলতা

বুধবার, মে ১, ২০১৯ ১:৫৭ AM | বিভাগ : আলোচিত


প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রগতিবাদী, উদারমনা এবং অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরতে হলে সব ধর্মীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিৎ। তা না হলে সব ধর্মকে সমান চোখে দেখা এবং সম মর্যাদায় মূল্যায়ন করার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিৎ। যার যার ধর্ম সে সে পালন করুক। এটা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার মানুষ হয়ে যদি কেউ কোনো ধর্মের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য সেই ধর্মের মতেই নিজেকে প্রকাশ করেন তাহলে তার এই চেতনার ব্যাঘাত ঘটবে বৈকি। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষ ধর্ম। কবির ভাষায় এভাবেই বলতে হয়, 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।'

অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার মানুষ সাম্প্রদায়িক বিষয় আশয় থেকে দূরে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কোনো সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দেওয়া মানেই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার পথকে আগলে ধরা। সবার ঊর্ধ্বে মানুষ সত্য তার উপরে নাই, এই ব্রতে বিশ্বাসী হলে সব ধর্মের বাতাবরণ থেকে দূরে থাকাই বাঞ্চণীয়। বড়জোর সবধর্মের আনন্দ, বিশ্বাসকে শুভেচ্ছা দেয়া যায়। তাই বলে এই নয় যে সেই ধর্মের মতো করেই তার লেবাসে নিজেকে আবৃত করে তাদের মতো হয়ে শুভেচ্ছা দিতে হবে। এতে ধর্মীয় বিশ্বাসকেই উসকে দেয়া হয়। পৃথিবীর সব ধর্মই রক্ষণশীল চিন্তা চেতনায় উদ্ভুদ্ধ। মৌলবাদী বিশ্বাসকে বিলুপ্ত করতে হলে যে কোনো ধর্মীয় ছায়াতল থেকে নিজেকে দূরে রাখাই শ্রেয়।

সারা পৃথিবী ধর্মীয় উন্মাদনায় মেতে আছে। এতে শুদ্ধ পথের যতটা চর্চা হয় তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়। রাজনীতির স্বার্থে আসলে ধর্মটাকে লালন করা হচ্ছে। এই বিষয়ে এখন আর কোনো দ্বিমত নেই। তবুও যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন, তাদের মতো করে ধর্মচর্চা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার মানুষ হয় তাহলে বাস্তবেও তা পালনের চেষ্টা করা এবং সকল কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব ফেলাই হবে একমাত্র করণীয় কাজ।

একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে এই লেখাটার অবতারণা। হিন্দু একটি সনাতনী ধর্ম। এর কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার অনুশাসন বলে গণ্য করা হয়। যেমন, হিন্দুদের সিঁদুর পরা। যা বিবাহিত মেয়েদের চিহ্নিত করার জন্য কপালের উপর চুলের সিথিতে একপ্রকার রঞ্জক পদার্থ দিয়ে রাখা হয়। এতে ধর্মীয় প্রথা যতটুকু না পালন হয় তারচেয়ে বেশি কাজ করে সামাজিক প্রথারূপে। একে তো সিঁদুর দিয়ে নারীকে বিশেষভাবে বিবাহিত বলে চিহ্নিত করছে তার উপর নারীর স্বাধীনতাও খর্ব করা হচ্ছে।

এমন একটি বিষয় এখন হিন্দু ছাড়াও মুসলিমরাও বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে শুধু পরছে না, কারণে অকারণে অনেকেই ফ্যাশন করে পরুক আর ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে পরুক বিষয়টা শেষপর্যন্ত মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকেই উস্কে দিচ্ছে। যেখানে আমরা অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার কথা বলি সেখানে এ ধরণের আচরণ শোভা পায় কি! তাছাড়া হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র ভারতের কলকাতাতেও অনেক প্রগতিবাদী হিন্দু বিষয়টাকে পরিহার করে চলছে সেখানে বাংলাদেশে কিছু মানুষ অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে বিষয়টাকে পরিহাসের রূপ দিচ্ছে। হাস্যকরই বটে!

মুসলিম নারীর হিজাব যেমন হিন্দু নারীর কাছে অগ্রহণযোগ্য, সেখানে হিন্দু নারীর সিঁদুর পরাও মুসলিম নারীর কাছে অগ্রণযোগ্য হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, দুটো বিষয়ই ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রথা। প্রগতির কথা যারা ভাবেন তারা কখনো পেছন ফিরে তাকাবে না, এমনকি কোনো প্রথাতেও আবদ্ধ হবেন না। প্রথা মেনে চলা জীবনযাপন আর যাই হোক সামনের দিকে এগুতে পারেনা। অতএব এক্ষেত্রে যে কোনো মৌলবাদী বিষয় পরিহার করাই হবে মূলকথা।

মানুষে মানুষে সমতার কথা বললে যে কোনো মৌলবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দূরে থাকা এবং ধর্মীয় উন্মাদনার ঊর্ধ্বে উঠে সব ধর্মীয় রীতিনীতি পরিহার করা উচিৎ। মানবতার জয় নিশ্চিত করাই হলো উদার, প্রগতিবাদী মানুষের মূল লক্ষ্য। একে অন্যের ধর্মের প্রতি যতই সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্বের সহমর্মিতা দেখানো হোক না কেনো মূলত সেই ধর্মটিকেই উস্কে দেয়া হয় বেশি। তাই বলছিলাম , উদারনীতি অবলম্বন করতে হলে, প্রগতির পথে চলতে হলে যে কোনো ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার ফল ঠিক সেখানেই প্রতিফলিত হবে।


  • ২৪৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

ফেসবুকে আমরা