আঞ্জুমান রোজী

লেখক

নারীজন্ম কি পাপের জন্ম?

নারীজন্মই হলো পাপের জন্ম। সমাজ-সংসার জন্ম থেকেই নারীকে পাপিষ্ঠা বলে ধরে নেয়। সমাজের তথাকথিত পাপ বলতে যা বোঝায় তার পুরোটাই হলো নারীর কারণ।  সে সমস্ত পাপ যাতে না করে তার থেকে বিরত রাখার জন্য জন্ম থেকেই নারীকে সাবধান করে দেয়া হয়। এ সমস্ত বিষয় আশয়ের সঙ্গে শিক্ষার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নারী যতোভাবেই মেধায়, মননে, শিক্ষায় বলীয়ান হোক না কেনো, নারীকে সর্বকালে, সর্বযুগে মূল্যায়ন করা হয় ঐ তথাকথিত পাপগুলো সে করেছে কিনা তার ভিত্তিতে।

নারীর পাপের ফিরিস্তি দেয়া আছে সব ধর্মে, আছে সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার মধ্যে। সেই সমস্ত পাপের ফর্দের মধ্যে যদি নারী পরে যায়, তারমানে সে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পরে যায়। সমাজ-সংসার নারীর এ সমস্ত পাপের ব্যাপারে এতোই নজরদারি করে যে, নারী তখন স্বাভাবিক জীবন যাপনে অনভ্যস্ত হয়ে ওঠে। নারী এক সময় বুঝতেই পারে না তার যে একটা জীবন আছে, আছে ভালোলাগা, মন্দ লাগা; এসবের কোনো অনুভূতিই তার মধ্যে কাজ করে না। নারী হয়ে উঠে তখন সমাজ-সংসারের ক্রিড়নক। এমন নির্লিপ্ত শান্ত স্বভাবের নারীকেই বলা হয় লক্ষী।

সংবেদনশীল নারী কখনই লক্ষী হতে পারেনি। তাদের অনুভূতি এতোই প্রখর যে তাদের ব্যক্তিসত্তা সেখানে সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে।  যা দেখে সমাজ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নারীকে তখন কুলাঙ্গার, পতিত, এমন আরো কদর্য ভাষায় আক্রমণ করে। অথচ একই পাপ যখন কোনো পুরুষ করে তখন তার সাতখুন মাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা কথা সমাজে বেশ প্রচলিত যে, পুরুষরা একটু আধটু এমন করেই থাকে। অবশ্য সমাজে পুরুষের জন্য পাপ বলতে যা বোঝায়, তাও অনেক সময় সমাজ-সংসার ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। তাদের জন্য আইনও বাঁকা হয়ে যায়। আর যদি পুরুষ বুঝতে পারে সে পাপ করেছে, তাহলে তার জন্য রয়েছে ধর্মীয় বাতাবরণ, যেখানে কিছু দোয়া কালাম আওড়িয়ে ভাবে পাপমুক্ত হয়ে গেছে। তাছাড়া, সমাজ-সংসার তো তাকে সোনার টুকরা ভাবে, তাকে কি উপেক্ষা করা যায়! ঠিকই তাকে বুকে আগলে নেয়। কিন্তু নারীর ব্যাপারে বিষয়গুলো বিরাট প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়।

নারীকে কারা পাপিষ্ঠা বলছে? বিশেষ করে নজর দিলেই লক্ষ্য করবেন, অধিকাংশ পুরুষ বলছে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলছে আরো কিছু নারী। এখন কথা হচ্ছে, নারীকে এমন নির্দিষ্ট নিয়মনীতির মধ্যে বেঁধে রাখার যে সিস্টেম বানানো হয়েছিলো, তার উদ্দেশ্য কী ছিলো? নারী পুরুষের জন্ম তো একই উপায়ে হয়, তাহলে নারী পুরুষে এতো ভেদাভেদ কেনো? কেনো নারীকে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকতে হয়? তার বিপরীতে পুরুষ অরক্ষিত অবস্থায় থাকলেও কোনো সমস্যা নেই। এই নারী-পুরুষের মধ্যে নিয়মনীতি দিয়ে যে বিভেদ তৈরি করে রেখেছে, তাতে কি সমাজে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে? নারী তো ঠিকই ফুঁসে উঠছে। সোচ্চার হচ্ছে তার অধিকার আদায়ে। শিক্ষাদীক্ষায়, মেধায় মননে, ব্যক্তিত্বে দিকে দিকে নারী জেগে উঠেছে।  তাদেরকে পাপী বলে এই সমাজ-সংসার আর কিছু করতে পারবে বলে মনে করি না।

নারী ঠিকই তার নিজস্বতা, যোগ্যতা দিয়ে উঠে আসছে। নারীপুরুষের অনুভূতিতে শারিরীক কেমিষ্ট্রিগত পার্থক্য ছাড়া মেধা, মননে, বুদ্ধিমত্তায় নারীও পুরুষের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। বরঞ্চ বলা যেতে পারে কোনো কোনো অংশে নারী পুরুষের চেয়ে বেশ অগ্রগামী। এখন নারী তার একার জীবন যেভাবে পরিচালনা করতে পারে, তেমনি সংসার, রাষ্ট্রও পরিচালনা করতে পারে। এতোকিছুর জলজ্যান্ত প্রমাণ দেয়া সত্বেও নারীকেই পুরুষের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। পুরুষের কর্তৃত্বে নারীকে ছোট হয়ে থাকতে হয়। সামাজিক সব অন্যায়ের জন্য তাকে পাপিষ্ঠা ভাবা হয়। এখনো নারীর দিকে আঙ্গুল তুলে বলা হয়, এসবই নারীর কারণে ঘটে। সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছেও এখনো পুরুষজাতি নারীকে দোষারোপ করছে, বলছে পাপিষ্ঠা। এমন মানসিকতার কারণ কী?

আমি এখানে নারী বলতে পৃথিবীর তাবৎ নারীর কথা বলছি। উন্নত বিশ্বের গুটিকয়েক দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশেই নারীর অবস্থান অমানবিক। যেখানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করে। নারীর পাপের ফিরিস্তি নিয়ে যুগ যুগ ধরে সচেতন অনেকেই বিচার, বিশ্লেষণ, ব্যাখা দিয়ে আসছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে গবেষণা করছে। উনিশ শতকের গোড়া থেকে নারীবাদীরা এসবের প্রতিবাদ করে আসছে। অবশ্যই আমরা নারীকুল তার কিছুটা ফল ভোগ করছি। এই আমি দু'শো বছরের আন্দোলনের রেশ ধরে আজ এখন এভাবে লিখতে পারছি। তারপরও, আজও কেনো মনে হয় আমি এখনো সেই মধ্যযুগীয় নারী হয়ে আছি? কেনো সমাজ আমাকে পাপিষ্ঠা বলে? কেনো বলে?

পৌরুষের  মিথ্যা অহমিকায যারা নারীর প্রতি সহিংস হয, দাবিয়ে রাখতে উদ্যত হয, তারা নপুংসক, কাপুরুষ। এরাই সমাজকে বীতশ্রদ্ধ করে রেখেছে। নারীকে বানিয়ে রেখেছে পাপী।  তাদের কাছে নারী মানে অস্পৃশ্য, নিম্নবর্গীয় অচ্ছুৎ কিছু। যদি এমনই পুরুষ সমাজ ভাবতে থাকে, তাহলে নারীও তার আসল স্বরূপ নিয়ে বেরিয়ে আসবে। আসছে অলরেডি। তাই বলছি, নারীজন্ম যদি পাপই হয়, তাহলে সে আরো পাপ করুক। পাপেই হোক নারীর শক্তি। সেই শক্তিতে জেগে উঠুক তারা, হোক শৃঙ্খলমুক্ত।

364 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।