আঞ্জুমান রোজী

লেখক

#metoo এবং নারী

প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী পুরুষ পুরুষের মতো, নারী নারীর মতো। পুরুষের সহজাত প্রবৃত্তি কখনো নারীর মতো না আবার নারীর সহজাত প্রবৃত্তিও পুরুষের মতো না। অবশ্য ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া নারী এবং পুরুষের প্রবৃত্তি সম্পূর্ণই আলাদা। এক্ষেত্রে নারীকে তার নিজের বিষয়ে বেশী সচেতন হতে হয়। পৃথিবীর আদি থেকেই নারী পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত। প্রকৃতি এমন করেই নারী পুরুষকে তৈরি করেছে যে পুরুষের বিষয়টাই হলো নারীকে হাতের মুঠোয় এনে তার স্বাদ, স্বার্থ চরিতার্থ করা। সেটা হতে পারে আবেগের ঘনঘটা দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে নারীকে করায়ত্ত করা বা হামলে পড়ে ধর্ষণ করা। সেক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা কি হওয়া উচিৎ! নারী যদি কোনো পুরুষের ক্রীড়নক হতে না চায়, তাহলে তাকে কি করতে হবে !

প্রথমেই নারীকে বুঝে নেওয়া উচিৎ তার নিজের রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো। তারপর আসে শিক্ষা। শিক্ষা নারীকে সচেতন করে। সেই সাথে বুঝিয়ে দেয় 'নারী তুমি তোমার নিজের, কারোর নও।' এসব বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হলে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবারের মা, খালা, ফুফু, নানী, দাদী এদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এরাই প্রথমে একটি মেয়েশিশুকে বড় হতে হতে বুঝিয়ে দেয় কিভাবে তাকে চলাফেরা করতে হবে। কিভাবে নিজেকে পুরুষের কুনজর থেকে আড়াল করবে! কতটা রেখে ঢেকে চললে পুরুষের অনাকাঙ্খিত আচরণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে! এই শিক্ষাগুলো দিতে হবেই। আমরা যতবড় আধুনিক সমাজে বাস করি না কেনো নারীর ভেতরের বিষয়গুলো নারীকে বুঝিয়ে দিতে হবেই। নাহলে পুরুষের ব্যাঘ্র থাবা থেকে কোনো নারীই রক্ষা পাবে না।

ধর্মীয় অনুশাসনে বেঁধে দেওয়া হয়েছে নারী কিভাবে চলবে! ধর্মীয় অনুশাসন মানে আল্লাহ বা ভগবানকে ভয় পেয়ে নিজেকে ঠিক রাখার যে মানসিকতা। এই মানসিকতা আসলে কোনো পরিত্রাণ এনে দিতে পারে না। আল্লাহ, ভগবানকে ভয় পাওয়ার চেয়ে বড় কথা হলো নিজের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং বিচার, বিবেক বুদ্ধিতে ও অনুধাবনের শক্তিতে নিজের ব্যাপারে একটা নারীর স্বচ্ছ ধারণা থাকা উচিৎ। পুরুষের কাজ পুরুষ করেই যাবে। সেই আদি থেকে বলতে গেলে পুরুষ একই রকম আছে। পুরুষ যতটা না মানুষ, ঠিক তার সমতূল্য পশুও সে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে নারীকেই সচেতন হতে হবে।

আমরা তিনবোন। আমার মায়ের কড়া শাসন আর কড়া নজরে বড় হয়েছি। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের হিসেব ছিলো আমার মায়ের কাছে। এমন কি পিরিয়ড ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তার তারিখটাও পর্যন্ত মনে রাখতেন। আমরা বড় হতে হতে শাসনের নমুনাও বদলে যেতে লাগলো। কাজিন ভাইরা আমাদের বাসায় যখন তখন আসতে পারতো না। আসলেও ড্রয়িংরুম পর্যন্ত ছিল তাদের গণ্ডি। আমাদের কারো বাসায় একাকী গিয়ে থাকার অনুমতি ছিলো না। এমনকি নানু বা খালার বাড়িতেও না। এতে আমার বাবারও কড়া নির্দেশ ছিলো। বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটাই স্বাভাবিক। যেই সমাজ যা দাবী করে। এই সমাজ একদিনে পরিবর্তন হবে না। তবে হ্যাঁ, ধীরে ধীরে নারীর ভেতর সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই সচেতনতা বৃদ্ধি মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। যাচ্ছেতাই জীবনযাপন নয়। সবকিছুর একটা নিয়ম আছে৷ সেই নিয়মের মধ্যে জীবনকে সচল রাখা সম্ভব।

আমরা কড়া নিয়মকানুনের মধ্যে বড় হয়েছিলাম। অনেক বিরক্ত হয়েছিলাম, রাগ করেছিলাম। অনেক সময় মিথ্যা বলেও আমার মায়ের কাছে পার পেতাম না। কিভাবে যেন সব বুঝে ফেলতেন। এর মূল কারণই ছিলো, মায়ের ধ্যানে, জ্ঞানে ও মানে বিরাজ করতাম আমরা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব ভাবলে আমার মাথা ঘুরে যায়। কিভাবে যে আমরা মার্শাল লয়ের ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি! কিন্তু আজ দিন শেষে মনে হয় আমার জীবনটা আর এলোমেলো নয়। অন্তত নিজেকে গুছিয়ে চলার ক্ষমতা অর্জন করেছি। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মায়ের। এমন কি আমার মেয়েকে নিয়েও সেভাবে ভাবতে হয় নি। স্কুল থেকেই ওদের সেভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়।

অনেক মেয়েকে দেখেছি, পুরুষের সাথে কথা বলার সময় ঢলে পড়ে। গায়ে গায়ে ঘেঁষে আদিখ্যেতা দেখায়। কাউকে কাউকে তো দেখেছি পুরুষের পাশে বসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতে। এমন অবস্থায় সেই পুরুষটি কি করবে! যেখানে পুরুষ নারীকে দেখা মাত্র নিউরনে তেতে উঠে সেখানে এভাবে গায়ে পড়ে উস্কে দিলে বিষয়টা কি দাঁড়ায়! এমন নারীর সংখ্যাও কম না। এমন বেলেল্লাপনা মেয়েদের জন্য অনেক সভ্য, ভদ্র মেয়েরা যারা নিজ যোগ্যতায় সম্মানের সাথেে এগিয়ে যেতে চায়, তারা লজ্জায় মুখ থুবড়িয়ে পড়ে থাকে। এ সমস্ত মেয়ে যখন মা হয় তখন তাদের কাছ থেকে তাদের মেয়েরা কি শিখে বা শিখবে! এরাই নারীর চলার পথে এবং নারী জাগরণের পথে প্রধান অন্তরায়।

আজ #metoo নামে সারা পৃথিবীব্যাপী যে শোরগোল শুরু হয়েছে, তাতে কি রেজাল্ট আসবে জানি না, তবে এইটুকু বলতে পারি ছিন্নভিন্ন আন্দোলনে কোনো গণসচেতনতা বৃদ্ধি পায় না। শুধু হ্যাস ট্যাগ মেরে metoo লিখে আমার গোপন কথা ফাঁস করে দিয়ে পুরুষটিকে বড়জোর লজ্জা দেয়া যায় বা বেশি হলে মামলা মোকাদ্দমা করে শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু এতে কি পুরুষ সমাজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসবে? যেখানে নারী নিজেই সচেতন না। নারী নিজেই জানে না সে কতটুকু নারী, আর কতটুকু মানুষ! বাস্তব জ্ঞান বিবর্জিত যত আন্দোলনই হোক না কেনো আল্টিমেট রেজাল্ট কিন্তু জিরো। যে সমস্ত পরিবার নিয়মকানুনের ধার ধারে না, সে সমস্ত পরিবারের মেয়েদের করুণ অবস্থা হবে এটাই স্বাভাবিক। বাস্তব সত্য তো এমন অনেক আছে আমাদের চোখের সামনে! #metoo আন্দোলন পুরুষ সমাজকে একটা ধাক্কা দেবে সত্যি কিন্তু নারী যদি নারীর জায়গা থেকে সচেতন না হয় তবে সব উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বাধ্য।

"মি টু'র বিষয়টা অবশ্যই গুরুত্ব রাখে। বাইরের জগত আর ঘরের জগত তো এক নয়। তবে প্রতিটি মানুষের জীবন শুরু হয় ঘর থেকে। শিক্ষাও পায় ঘর থেকে।ঘরের জগতেই অনেক মেয়েকে শিশুবয়স থেকে বয়োবৃদ্ধি পর্যন্ত হেনস্তার শিকার হতে হয়। সেই ঘর থেকেই যদি মেয়েশিশুটির বেড়ে উঠা পর্যন্ত নিজেকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানসিকভাবে গড়ে তোলা যায় তাহলে মেয়েটি পরবর্তীতে সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে। সেইসাথে প্রতিহত করতে পারে অসামাজিক সব কার্যকলাপের। আজকের মি টু'র আন্দোলন সারা পৃথিবী জুড়ে। ঘরের আন্দোলনও জোরেশোরে হওয়া উচিৎ। নাহলে ঘর আর বাইরের আন্দোলন এক হয়ে গেলে সবকিছু বুমেরাং হয়ে যাবে। আমার এই লেখাটা সেই প্রেক্ষিতে লেখা।"

667 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।