আঞ্জুমান রোজী

লেখক

নারী অধিকার আদায়ের পাশাপাশি উদার মানসিকতা দেখানো হোক

নারী দিবস নিয়ে লিখতে বসে খুব এলোমেলো লাগছে। কোন বিষয় ছেড়ে কোন বিষয় নিয়ে লিখবো, সেটা ভেবে অস্থির হচ্ছি। এতো সমস্যা চারদিকে, ঘরেবাইরে; মানবিক-মৌলিক বিষয় একেবারেই নাই যেখানে, সেখানে একটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকতেই হয়। আর নারী যদি নিজেই নিজের সমস্যার কারণ হয়, সেক্ষেত্রে নারী সমস্যার বিষয়গুলো আরো জটিল হয়ে ধরা দেয়।

ধর্মে নারীকে সর্বাবস্থায় অথর্ব অচল করে তুলে ধরেছে। মেধা, শিক্ষায়, বুদ্ধিমত্তায়, শারিরীক কারণে নারী এক দুর্বল প্রাণী এই মানসিকতায় পুরুষগণ বেশ উজ্জীবিত। তারা নারীকে এভাবেই ভাবতে ভালোবাসে! কোনো নারী তার অধীনে আছে এটা ভাবতেও পুরুষগণ খুব গর্ববোধ করে। জন্ম থেকেই পুরুষকে নারী সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা দিয়ে বড়ো করা হয়। সেই ধারণা নিয়ে যতোবড় শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেনো, পুরুষের কিন্তু নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তেমন একটা বদলায় না। যতোই সামাজিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বলি না কেনো, মানবতার বিষয়ে নারী পুরুষের ভেদাভেদ বেশ দৃশ্যমান। এই ভেদাভেদের কারণে শিক্ষিত সচেতন নারী যুদ্ধ করে যাচ্ছে নিজ অস্তিত্বের বিকাশ ঘটানোর জন্য। যদিও অনেকক্ষেত্রে এর বিপরীত চিত্র মারাত্মক আকারে দেখা যায়।

তাছাড়া, ভালোবাসার প্রাপ্তি বা ভালোবাসার অধীনস্থ অন্য এক বিষয়। সেখানে কে কাকে কীভাবে সমর্পণ করবে এটা যার যার অনুভূতি। কিন্তু এই দুর্বল বিষয়কে অবলম্বন করে যদি কেউ কারোর উপর খবরদারি করে বা কর্তৃত্বের খড়্গ হাতে নিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তখনই বিপত্তিগুলো ঘটতে থাকে। এমন ঐশী রূপ অধিকাংশ পুরুষের ভেতর সদা জাগ্রত। নারী তখন অসহায় অবস্থায় ধর্মীয় কারণে এবং সামাজিক বিধি ব্যবস্থার কারণে পুরুষের স্বৈরাচার রূপ মাথা পেতে নেয়। মাথা পেতেই যদি নেয় তাহলে সেসব নারীর কোনো অভিযোগ থাকার কথা নয়। যার যার জীবন তার তার কাছে। কে কীভাবে সুখি হবে বা সুখ খুঁজে নিবে, এটা তার ব্যক্তিগত অভিরুচি। কিন্তু যখন দেখি সেই নারীটি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করে সঙ্গী পুরুষটির পিছন থেকে ছুরি মারার জন্য জিঘাংসার রূপ নেয় বা তার নামে আড়ালে আবডালে আজে বাজে কথা বলে বেড়ায়, তখনই সমস্যাগুলো আরো জটিল আকার ধারণ করে।

কিন্তু সময় বদলেছে। নারী প্রমাণ করে দিয়েছে যে নারীও পারে তার একক সত্তার স্ফুরণ ঘটিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে। শিক্ষা, মেধা, বুদ্ধিমত্তায় নারীও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তারপরেও নারীকে পুরুষের বগলদাবা হয়ে থাকতে হবে কেনো? কেনো নারী তার ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয় দিবে? সামাজিক রীতিনীতি বা ধর্মীয় দোহাই দিয়ে নারী আর কতোকাল মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে? নারীর ভেতরেও আছে মননশীলতা, আছে সৃষ্টিশীল প্রণোদনা। নারী কি ইচ্ছে করলেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না?

যদিও বলা হচ্ছে, নারীর সমস্যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে উদ্ভুত। কথাটা চূড়ান্তরূপে সত্য। যার কারণে, পুরুষের কর্তৃত্ব আর নিয়ন্ত্রণের থাবা থেকে নারীমুক্তির কথা অনেকভাবেই বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীপুরুষ ভেদাভেদে সমতার কথা। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে লক্ষ্য করছি ভিন্ন এক চিত্র। অবশ্য এই চিত্রও পুরুষতান্ত্রিকতার ধারাবাহিকতার রূপ। তারপরেও নারী সংক্রান্ত নিজস্ব সমস্যার কিছু কথা আছে বা কিছু কথা আসে।

নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমতার কথা যতো জোরেশোরে বলা হোক না কেনো, এখনো অধিকাংশ নারী পুরুষের উপর নির্ভর করে চলে; তাদের নিজেদের মেধা এবং অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্বেও কেউ বাবার উপর, কেউ জীবনসঙ্গী পুরুষটির উপর। এখনো সেই সব নারীর মজ্জাতে গেঁথে আছে যে স্ত্রী লালন পালনের দায়িত্ব স্বামীর। এই দায়িত্বটাকে জোর গলায় প্রতিষ্ঠা করে স্বামীর কাছ থেকে যা কিছু সম্ভব তা আদায় করা৷ আদায়ের ব্যাপারে অধিকার খাটিয়ে যে প্রক্রিয়া চলে তা কখনো কখনো বেশ অমানবিকও মনে হয়। অথচ এই শ্রেণির কিছু নারী গলা ফাটিয়ে নারীমুক্তি, নারী অধিকারের কথা বলে।

বিবাহিত নারী পুরুষের জীবনযাপন হবে সমতার জীবনযাপন। অর্থাৎ সবকিছু সমানসমান। সমানসমান ভাগাভাগি করে চলার মানসিকতা পরিলক্ষিত হবে। যদিও ধর্মীয় রীতিনীতিতে নারীর অবস্থান ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে, যা সামাজিক বিধিব্যবস্থার অনুষঙ্গ হয়ে আসছে। ধর্মীয় এবং সামাজিক ব্যবস্থাগুলো নিয়ম আকারে আছে বলেই বিষয়টা হয়তো অনেকেই মনেপ্রাণে মেনে চলে। আর ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন নারীর পুরুষনির্ভর এমন জীবনযাপন লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু ধর্মীয় বিশ্বাস অধিকাংশ নারী ঝেরে ফেলতে পারছে না তাই এ ধারাটাও বহাল তবিয়তে আছে। এমন নারীর বিশাল অংশ আবার নারী অধিকারের কথাও বলছে। যা সত্যিই হাস্যকর।

বিবাহ বিচ্ছেদের পর দেনমোহরের টাকা আদায়ের জন্যও অনেক নারীকে দেখেছি কোর্ট-কাছারি করে প্রাণপাত করছে। যে মানুষটা তার জীবনের সঙ্গে নেই, সেই মানুষের কাছ থেকে আর কী আশা করতে পারে? নাকি আশা করাটাই সমীচীন? আমি অবশ্য এই বিষয়টা বুঝি না৷ আবার এক্স স্ত্রী হিসেবেও পুরুষটির সহায় সম্পত্তির পূর্ণ ভাগ পাওয়ার জন্যও অনেকে লড়াই করে। ইসলামের রীতিনীতিতে সেই আদ্দিকালে অসহায় নারীর জন্য এই ব্যবস্থা করেছিলো। এখনো সেই ব্যবস্থা চলছে। সমাজে অধিকাংশ নারীর অবস্থা তৃতীয় শ্রেণির মতো। সেই অধিকাংশ নারীর জন্যেই না হয় দেনমোহরের ব্যবস্থা থাকুক, যতোদিন পর্যন্ত তারা তাদের অস্তিত্বের অবস্থান না বুঝতে পারছে বা স্বাবলম্বী না হচ্ছে, ততোদিন না হয় এই বিধিব্যবস্থা তারা মেনে নিক। কিন্তু যাদের সামর্থ আছে, যারা একক প্রচেষ্টায় চলতে পারে তারা কেনো এসব বিধিব্যবস্থা বা রীতিনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় বা আদায় করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে?

নারী অধিকার, নারীমুক্তি, নারী ক্ষমতায়ন এবং নারী সমতায়নের কথা যতোই বলাবলি, লেখালেখি বা মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ করা হোক না কেনো, যতোদিন পর্যন্ত নারী তার ব্যক্তিত্ব শান না দিচ্ছে ততোদিন কোনোকিছুর মুক্তি আসবে না। ব্যক্তিত্বে বলীয়ান, কর্মে সোচ্চার না হলে কোনোদিনও নারী তার নিজস্বতা প্রকাশ করতে পারবে না, হতে পারবে না আত্মবিশ্বাসী। সেই সাথে শিক্ষা, মেধা, মননশীলতার জায়গা পরিস্কার না থাকলে নিজের সম্পর্কে আস্থাও অর্জন সম্ভব নয়। তাই যতোই নারীমুক্তির আন্দোলনের কথাই বলা হোক না কেনো, নারীর পশ্চাৎপদ মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নারীবাদী বিষয়টা অধরাই থেকে যাবে।

573 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।