আঞ্জুমান রোজী

লেখক

আফগান বোরখা বনাম বাংলাদেশ

পর্দা প্রথা বা ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে জীবনযাপন করা মানুষগুলো নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই এবং থাকার কথাও না। কে কিভাবে জীবনযাপন করবে, সেটা যার যার ব্যক্তিগত শিক্ষা, আদর্শ এবং মানসিকতা বলে দিবে।  আমার এমন মানসিকতা থেকে সামাজিক  মাধ্যমে বিতর্কিত এক বিষয় নিয়ে  একটি পোস্ট দিয়েছিলাম শুধুমাত্র জানার জন্য যে আসলে বিষয়টা কী? অর্থাৎ কিছুদিন ধরে একটি বিষয় সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে, যেখানে মা ছেলে ক্রিকেট খেলছে এবং মা'কে দেখাচ্ছে বিশাল বস্ত্রখণ্ডে আবৃত অবস্থায়। এমনভাবেই আবৃত  যে তাকে শুধু কাপড়ের বান্ডেল মনে হচ্ছে। এরমধ্যে যে এক নারীর অস্তিত্ব আছে তা বিশেষভাবে না দেখা পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই। আমার প্রশ্ন হলো, যেখানে একটি মানুষের অস্তিত্ব বোঝা যায় না সেখানে এমন পরিধেয়কে কিভাবে স্বাভাবিকভাবে দেখি? তার উপর বিরাট এক প্রশ্ন, এমন পরিধেয়তে নারীটি কতটুকু স্বাচ্ছন্দবোধ করছে? যেখানে বাংলাদেশের আবহাওয়া কোনো অবস্থাতেই অনুকূলে নয়!

মা ছেলেকে নিয়ে ক্রিকেট খেলছে দৃশ্যটা খুবই সুন্দর। তারচেয়ে আরো বেশি ভালো লেগেছে এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও নারীটি ছেলের সঙ্গে খেলে সাহসিকতা দেখিয়েছেন। এখানে তাকে অবশ্যই আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বিশেষভাবে চোখে পড়লো তার ড্রেস। যেটাকে অনেকেই বলছেন বোরখা। এটা কেমন ধরণের বোরখা? যেখানে নারীটিকে আপাদমস্তক সম্পূর্ণ ঢেকেই ফেলেছে! আমি যদিও দেখি অনেককে কভার করতে কিন্তু এমন উদ্ভট পরিধেয়তে আবৃত করতে কখনই দেখিনি। যা করে আফগানিস্তানের এবং আরবের নারীরা। কথিত এই বোরখা বাংলাদেশে প্রচলন হলো কেমন করে, এটা আমার মাথায় আসছে না।

বাংলার মুসলিম নারীরা সবসময় পর্দা করে আসছে। জন্ম থেকেই দেখে এসেছি। কিন্তু এমন বোরখা দ্বারা আবৃত অবস্থায় আমি কাউকে দেখিনি। তাই প্রশ্নটা ফেইসবুকে আমার পেজে ছবি সহ রেখেছিলাম ঠিক এইভাবে, "এটা কি ড্রেস? ভেবে ভেবে কোনো আগামাথা খুঁজে পাচ্ছি না। বোরখার মতো তো লাগছে না! এত্তো কাপড় জড়িয়েছে শরীরে!? উনি কি বাঙালি নাকি অন্যকিছু!?" এমন প্রশ্ন দেখে আমার ফেইসবুকে যেন এটমবোম ফুটলো। আর সেই  বোমটা ফুটালো অধিকাংশ পুরুষেরা। যদিও প্রশ্নটা ছিল নারীর পোশাক নিয়ে সেক্ষেত্রে নারীর মাথাব্যাথার চেয়ে পুরুষের মাথব্যাথা দেখে যারপরনাই অবাকই হই নাই শুধু, পুরোদমে হতাশই হয়েছি। নারীর পোশাক নিয়ে পুরুষের এই যে হম্বিতম্বি ভাব দেখলাম, এখানে এটাই প্রমাণ করে দিলো নারী কি পোশাক পরবে সেটি পুরুষ দ্বারা নির্ধারিত হবে। এছাড়া আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করে আসছি। মওলভিরা ওয়াজে যখন কুৎসিত এবং অশ্লীল  ভাষায়  নারীদের গালিগালাজ করে তখন এই মমিন মুসলমান ভাইয়েরা কোনো প্রতিবাদ করে না। খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার।  অথচ এরাই আমাকে তুলা ধুনা করলো।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। এই যে তথাকথিত বোরখা, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে আবহাওয়াগত কারণে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা রাখে! কভার তো আরো অন্যান্য ভাবে করা যায়! আমি দেখেছি যারা আপাদমস্তক কভার করেন তাদের অনেকেই এজমা রুগি। কারণ, কাপড়ের  ভেতর গরমে ভিজেটিজে একাকার হয়ে থাকে। এই অবস্থায় যখন ফ্যানের বাতাস বা এসির ঠাণ্ডার মধ্যে আসে তখন সে ঘর্মাক্ত অবস্থা থেকে নিজেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করে। তখন লক্ষ্য  করবেন, দিনের পর দিন চলতে চলতে একসময় সেই নারীটি কিভাবে শ্বাসকষ্টের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টা বাড়ির কেউতো বুঝেই না, এমনকি যে নারীটি কভার করছে সেও আমলে আনে না৷ কারণ, সে তো ধর্মের জন্যই নিজেকে উৎসর্গ করছে। এতে সে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে। কিন্তু যখন সে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে তখন তাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু একবারও ভাবে না যে নারীটি এভাবে অসুস্থ হলো কেমন করে! তাছাড়া এমন বোরখা পরা নারী যখন ঘর্মাক্ত অবস্থায় অন্যের পাশে যায় তখন তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়ে আসে, তা যে অন্যের সমস্যা করতে পারে সেইসমস্ত কভার করা নারী কি কখনো ভেবে দেখেছে?

তারপর আছে, এই যে লম্বা লম্বা পায়ের গোড়ালির নিচ পর্যন্ত গড়ানো বোরখা পরে বাইরে যাচ্ছে, তাতে সে বাইরের সমস্ত ধূলাবালি নিয়ে ঘরে ঢুকছে। এমন দৃশ্যও আমি দেখেছি। এই বিষয়টাকে কিভাবে দেখবেন? এতে যে সে রোগজীবাণু বয়ে আনছে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? কভার কি আরো অন্যভাবে করা যায় না যেখানে নিজেকে স্বাস্থ্যসম্মত এবং সেইসাথে অন্যকেও সুস্থ রাখতে পারে? অন্যের সমস্যা করে এমন ধর্মীয় অনুশাসনের কি মূল্য আছে? যেখানে ধর্মেই বলে, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। সেখানে জুব্বা ধরণের বোরখা পরে নিজেকে আবৃত করে অপরিস্কার অপরিচ্ছন্নতা থাকাটাই হলো একধরণের প্রহসন।

এমন মানসিকতা থেকেই আমি আমার ফেইসবুকে পোস্টটা দেই। এতে অনেকেই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ন্যাক্কারজনক আক্রমণ করে। অনেকে এই বিষয়ে সুস্থ আলোচনার নামে তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠি নিয়ে আমাকে অপদস্ত করার চেষ্টা করে।আমার ব্যক্তিত্ব,  শিক্ষা, মানসিকতা, কৃষ্টি সবকিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাতে আমি পরিস্কার বুঝে নিলাম, নারীর কোনো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে কথা বলা যাবে না। কারণ, এখানে নারীর স্বাধীনতাকে দেখা হয় পুরুষের আঁতে লাগার মতো করে। উপযাচক হয়ে পুরুষরাই দলবদ্ধভাবে সবসময় আক্রমণ করে আসছে। তাদের আক্রমণের তোড়ে অনেক নারীবাদীকে ফেইসবুক ডিএকটিভেট করতেও বাধ্য করে। এসমস্ত পুরুষের শিক্ষা শুধু তাদের পেশীতে বহন করে। আর এদের খুশী করতে কিছু নারীও তাদের সঙ্গে সংঘবদ্ধ অবস্থায় থাকে। যার কারণে, সমষ্টিগতভাবে নারীর জীবনের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আরেকটা বিষয় দেখেছি, আমার অনেক পুরুষবন্ধু আছেন যারা প্রগতির কথা বলেন, নারী স্বাধীনতার কথা বলেন, অথচ এমন ক্রাইসিসে তারা কেমন যেন নিরব ভূমিকা পালন করে। তাতে কি বুঝে নিবো না যে তারা একই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মানুষ?

আফগান স্টাইলের বোরখা দেখে আমার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছে, সেই নারী কি বাঙালি নাকি অন্যকিছু? কারণ, বাঙালি কৃষ্টি,সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যতে এমন পোশাক নেই। তাতে অনেকে ক্ষেপে বলেছেন, পোশাক যার যার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে আমি কি আমার অস্তিত্ব, সত্তা সবকিছু জলাঞ্জলি দিবো?  আমি যদি আমার শিকড় ধরে না এগুতে পারি তাহলে আমার পরিচয় কি? আমি সবার উপরে মানুষ হলেও এই বিশ্বয়ানের যুগে প্রতিটি মানুষের আইডিন্টেটি আছে। আর সেই আইডেন্টিটি হলো আমার শিকড়। তা আমি কিভাবে অস্বীকার করি? আমি প্যান্ট জিন্স যাই পরি না কেন, আমাকে মানুষ চিহ্নিত করতে পারে আমি কি, কেমন এবং কি আমার পরিচয়। কিন্তু ঐ আপাদমস্তক আবৃত পরিধেয় কোনো নারীকে কিভাবে চিহ্নিত করবে? নাকি, বাংলাদেশের নারী চায় না তার নিজস্ব কোনো আডিন্টেটি থাকুক? এটা আমি কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করবো না। কারণ, প্রতিটি নারীর ভেতরেই সুপ্ত একটা বাসনা থাকে। পর্দা প্রথা নারীর ইচ্ছায় না অনিচ্ছায় তাও এখানে বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। ধর্মীয় অনুশাসনের নামে আর কতকাল নারীকে শিকল বন্দী করে রাখা হবে? ধর্মপালন তো আরো অনেক নারীই করে। তারা সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ এবং শালীন সই পোশাক পরেই ধর্মপালন করছে। যা দেখে এসেছি যুগ যুগ ধরে। তাহলে এখন এমন কি হয়ে গেলো যে ধর্মের নামে পুরো লেবাসই চ্যাঞ্জ হয়ে গেলো!

মধ্যপ্রাচ্যে  নারীপুরুষ  সকলেই জুব্বা ধরণের  বিশাল  কাপড় পরে। এমন ধরণের কাপড়ের পরিধেয় ইসলাম আসার অনেক আগে থেকেই প্রচলন। অতিরিক্ত গরম থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখার জন্যেই এই পোশাকের ব্যবস্থা।  তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আবহাওয়াতে জলীয়বাষ্প নেই যে তারা ঘর্মাক্ত হবে।  কিন্তু বাংলাদেশের  আবহাওয়াতে জলীয়বাষ্প আছে। আমরা মোসুমী অঞ্চলের মানুষ। এখানে অতিরিক্ত গরমে ঘর্মাক্ত হতে হয়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের নারীদের এজাতীয় বোরখা পরা কতটুকু যৌক্তিক?  আবহাওয়াগত কারণে সম্পূর্ণই অনুপযোগী।

মা ছেলের ক্রিকেট খেলা অবশ্যই আনন্দের।  আমি চাই সকল মা এভাবে সন্তানকে নিয়ে খেলুক। কিন্তু কি পোশাকে খেললে মা'রা স্বাচ্ছন্দ্যে এবং আরামে খেলতে পারবে সেদিকটাও বিশেষ নজর দেয়া উচিৎ। এধরণের বোরখা পরে  সাঁতার দেয়া যাবে কি? অতএব,  যে পোশাক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেই পোশাক পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়।

অবশ্যই কে কি পোশাক পরবে সেটা  তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। কিন্তু এমন পোশাক কেন পরবে যা তার স্বাস্থ্যসম্মত তো নয়ই এমন কি পরিবেশ বান্ধবও নয়। গরমের দেশ বাংলাদেশে কিভাবে এত্তো বড় বোরখা নারীরা সামাল দিচ্ছে তা ভাবতেই অবাক লাগছে। মাথাতেই আসেনা এর মধ্যে কিভাবে নিঃশ্বাস নেয়! বাঙালি কৃষ্টি, সংস্কৃতি,  ঐতিহ্যের কথা বাদ দিলেও এমন বোরখা একজন নারীর কাছে কতটা সহনীয় এবং আরামদায়ক  তা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার ও বিশ্লেষণ করা হোক।

আপাতত  আমার এক কবিবন্ধু তুষার গায়েনের স্ট্যাটাস দিয়ে শেষ করছি, "বৈরী প্রকৃতি থেকে আত্মরক্ষার কারণ ছাড়া যে পোশাক মানুষকে আপাদমস্তক মুড়িয়ে বন্দি করে, তা মানব বিরোধী এবং মানবসভ্যতার যাত্রাপথে অন্তরায় !"

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।