আঞ্জুমান রোজী

লেখক

আমি একজন নারীবাদী

প্রগতিবাদী মানেই একজন প্রকৃত নারীবাদী। অথচ নারীবাদী শব্দটি অনেক প্রগতিবাদী পছন্দ করেন না। প্রগতিবাদীরা নারীবাদ শব্দ শুনতেই অবজ্ঞা, ঘৃণা এবং তাচ্ছিল্যভাব প্রকাশ করতে থাকেন। নিজেকে যতটা প্রগতিবাদী বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন ঠিক ততটাই অস্বস্তিতে ভোগেন নারীবাদী পরিচয় দিতে। প্রগতিবাদ শব্দটি সুশীল সমাজ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকেরা বুক ফুলিয়ে সিনা টানটান করে গর্বভরে উচ্চারণ করেন। কিন্তু নারীবাদী শব্দেই যত আপত্তি। এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় নারী কবি-সাহিত্যিকের মাঝে। অথচ নারীবাদ শব্দের মাঝেই প্রগতিবাদ ভাব ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, 'আমি একজন নারীবাদী' এই শব্দ-বন্ধ উচ্চারণ করতে বাধা কোথায়!

নারীবাদ হলো সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা সর্বক্ষেত্রে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কারণ নারী পিছিয়ে পড়া অন্ধকার সমাজে বসবাস করছে। তাছাড়া জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ নারী। সেই বৃহৎ নারীগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কী ধরণের প্রগতির কথা বলেন প্রগতিবাদীরা? প্রগতি হলো পুরনো জরাজীর্ণতা দূর করে নিত্য নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সেই এগিয়ে যাওয়া নারী-পুরুষের সম্মিলনেই সম্ভব। কিন্তু নারীর পারিবারিক, সামাজিক অবস্থা পরিবর্তন না করে কিম্বা পরিবর্তনের সুযোগ না দিয়ে প্রগতির কথা বলাও ধৃষ্টতা তুল্য। আবার এগিয়ে যাওয়ার পথে নারীর অংশীদারিত্বকে এবং নারীর অবদানকে স্বীকৃতি না দিয়ে তথাকথিত প্রগতিবাদীরা তাদের নিজের মতো করে সময়কে দেখছেন। পরিবর্তন বলতে সামগ্রিক পরিবর্তনটাই বুঝি, যেখানে আমরা প্রগতির পথ খুঁজি। সেক্ষেত্রে নারীর সার্বিক অবস্থা এবং অবস্থানও পরিবর্তন হচ্ছে। অনেকটা নারীর নিজস্ব উদ্যোগে আজকে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ সামাজিকভাবে সেই মানসিকতা আজো দেখতে পাই না, যেখানে একজন প্রগতিবাদী বলবেন, 'আমি একজন নারীবাদী'। অবশ্যই আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা নিয়ে লিখছি। 

নারীবাদ হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার সমতার একটি মতবাদ, যাতে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য বিস্তার রোধে নারীদের সংগঠিত হওয়ার উপর এবং সামাজিক জীব হিসেবে সমঅধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের জন্য সমাজকে নিরাপদ আবাসস্থলে রূপান্তরিত করার উপর গুরুত্ব দেয়। নারীবাদ মতাদর্শ হলো নারীরা রাজনৈতিক, সামাজিক, লৈঙ্গিক, বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে। নারীবাদের কর্মকান্ড বৃহৎ পরিসরে নারীদের অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত। নারী যেখানে বৈষম্যের শিকার, পুরুষের অধস্তন, সেখানে নারীবাদ এ অবস্থার পরিবর্তন সাধনে পরিচালিত। পরিবর্তন কথাটা যখন আসছে তখন নারীবাদ প্রগতিবাদের একটি শর্তসাপেক্ষ বিষয়। নিজেকে প্রগতিবাদী বলবেন, অথচ নারীবাদ বিষয়কে অস্বীকার করবেন, তখন আপনার প্রগতিবাদ চিন্তাভাবনাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

নারী আন্দোলনকারীরা নারীর আইনগত অধিকার (চুক্তির অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, বৈবাহিক অধিকার, ভোটাধিকার), দৈহিক স্বাধীনতা ও অখন্ডতা রক্ষার অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, প্রজনন অধিকার (যথেচ্ছা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করার অধিকার, সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণের অধিকার, উন্নতমানের প্রসূতি চিকিৎসা লাভের অধিকার) অর্জনের জন্য, পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি ও নিগ্রহ থেকে নারী ও কিশোরীর নিরাপত্তার জন্য; সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য, বেসরকারি খাতে চাকরিক্ষেত্রে, ব্যবসা বানিজ্যে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য; কর্মস্থলে নারীর অধিকার, যার মধ্যে মাতৃত্ব ছুটি, সমান মজুরি ও বেতন প্রভৃতি অন্তর্ভূক্ত; সকল মানবাধিকার লাভ করার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সকল স্তরে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্ব দেয়। বস্তুত যেখানে নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান, নারী আন্দোলনকারীরা সেসব জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়। এসব কর্মকাণ্ডে কী প্রগতির কথা পাওয়া যায় না? সব প্রথা ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই যদি প্রগতি হয়, তাহলে নারীবাদ হলো প্রগতির ধারক বাহক। 

প্রগতি অর্থ অগ্রগতি বা উন্নতি। প্রগতিবাদী অর্থ উন্নতগামী চেতনার ধারক। যেসব ব্যক্তি মনেপ্রাণে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনকে সহজে মেনে নেয় ও নবতর অগ্রগতি ও উন্নতির পথে অগ্রসর হয়, তারাই প্রকৃত প্রগতিবাদী। প্রগতি এক চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিনিয়ত পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনকে লালন করে চলেছে। কোনো বিশেষ দার্শনিকের মতবাদের ওপরেও এটা প্রতিষ্ঠিত নয়। সর্বকালের সর্বযুগে প্রগতি নিত্যনতুন মত ও পথ লালন করেছে। নবতর আদর্শকে ধারণ করেছে। পৃথিবীতে যত দিন মানুষ বসবাস করবে তত দিন প্রগতির ধারা অব্যহত থাকবে। সেই ধাবাহিকতায় নারীবাদও আজ অগ্রগতির কথা বলছে। প্রগতিবাদী বললে সার্বিক অর্থেই বিষয়টা বুঝানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে লক্ষ্য করেছি, প্রগতিবাদী বলছে, কিন্তু তারা নারীবাদ বিষয়টা আমলে আনছে না। যা খুবই দুঃখজনক। আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ নিজেদের প্রগতির একমাত্র ধারক-বাহক হিসেবে প্রচার করে থাকেন। অথচ তারা গৎবাঁধা আদর্শের বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করতে পারেন না। তাদের মধ্যে কেউ নিজেকে মার্কসবাদী, কেউ বা লেনিনবাদী এবং কেউ বা মাওবাদী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। নিজেদের চিন্তা-চেতনা-আদর্শের বিপক্ষের ধারক ও বাহকদের তারা ‘প্রগতিবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এমন মানসিকতায় নারীবাদ বিষয়টা একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। 

উন্নত দেশগুলোতে নারীবাদ বিষয়টি প্রকারান্তরে গ্রহণযোগ্যতা রাখে। এমনকি অনেক রাষ্ট্রপ্রধান নিজেকে একজন নারীবাদী বলে পরিচয় দেন। যেমন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো একজন প্রকৃত নারীবাদী। আন্তর্জাতিক কন্যা দিবসে তিনি বলেন, "আমি একজন নারীবাদী। আমি নারীবাদী হতে পেরে গর্বিত।" তিনি আরো বলেন, "ছেলে সন্তানদেরকেও নারীবাদী হিসেবে গড়ে তুলুন। আমি আমার সন্তানদের নারীবাদী হতে উৎসাহিত করছি। কারণ, সারাবিশ্বে নারী ও মেয়েরা এখনও অবহেলিত, সহিংসতা, লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার যা তাদেরকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। ফলে তারা স্বপ্ন অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।" ট্রুডোর কেবিনেট অর্ধেকের মতো নারী দ্বারা বেষ্টিত। আছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো, যিনি নিজেকে নারীবাদী বলে পরিচয় দেন। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছিলেন, "আমাদের সকলের নারীবাদী হওয়া উচিৎ।" মার্কেল নারীবাদীদের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। 

তাছাড়া নারীবাদ তত্ত্বের শুরুতে অর্থাৎ সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতকে অনেক নারীবাদী পুরুষ নারীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা নারীবাদী মতাদর্শকে ধারণ করেন এবং প্রকাশ্যে নারীবাদী হিসেবে পরিচিত হন। সেই সময়টা জুড়ে বেশিরভাগ প্রো-ফেমিনিস্ট লেখকেরই উথান ঘটে ফ্রান্সে। পৃথিবীতে পুরুষ নারীবাদী হিসেবে পরিচিত পারকার পিলসাবারি, ডেনিস দিদেরো, পল হেনরি থিরি দলবাক এবং চার্লস লুই দে মতেস্কু, ফরাসী দার্শনিক মার্কুইস দে কুঁদরসে, হেনরি মেইন, জন স্টুয়ার্ট মিল, এবলিশনিস্ট উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসন, চার্লস লেনক্স রেমন্ড, ন্যাথানিয়েল পিবডি রজার্স, হেনরি স্ট্যানন; উনারা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে ক্ষমতা, প্রতিপত্তিতে প্রভাবশালী ছিলেন। কেউ ছিলেন ইতিহাসবেত্তা, কেউ আইনজ্ঞ, কেউ দার্শনিক, কেউ প্রফেসর বা কেউ রাজনীতিবিদ। আবার আমাদের উপমহাদেশে রাজা রাম মোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনুধাবন করেছিলেন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা। নারীবাদী পুরুষেরা বেল হুকস এর মতো অনেক নারীবাদী লেখকের পাশে দাঁড়িয়েও যুক্তিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন। পারকার পিলসাবারি এবং অন্যান্য পুরুষ নারীবাদী মতাদর্শকে ধারণ করেন এবং প্রকাশ্যে নারীবাদী হিসেবে পরিচিত হন। তারা তাদের প্রভাব প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে নারীদের অধিকার আদায়ের কাজ করেন। 

বাংলাদেশে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সবস্তরে নারীপূরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন।” কথাগুলো সংবিধানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করলেও বাস্তবে সেই অর্থে তা বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও নারীবাদ বিষয়টি বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রগতিবাদীদের উপর বর্তায়। কিন্তু সেই তথাকথিত প্রগতিবাদীরাই কেনো যেন নারীবাদ বিষয়কে এড়িয়ে যান। বিশেষ করে যদি কোনো নারী লেখক নারীবাদের বিপক্ষে দাঁড়ায় বা নারীবাদী বলে নিজেকে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তখন প্রগতির সব পথই বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। এখন বাংলাদেশের তেমনি ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। মানবাধিকারের কথা বললে, প্রগতির কথা বললে নারীবাদ বিষয়টি আসবেই। অতএব, যতই প্রগতিবাদী হোন না কেনো নারীবাদী বিষয়টি না মেনে নিলে বা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলে আপনার চিন্তাভাবনা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। বর্তমান সময় এটাই দাবী করছে। আমি চাই প্রত্যেক প্রগতিশীল মানুষ বলুক, "আমি একজন নারীবাদী।"

627 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।