আল্লাহ্‌র নামে যে কোনো কিছু করা সম্ভব

বুধবার, জুলাই ৩, ২০১৯ ৪:২৭ AM | বিভাগ : মুক্তচিন্তা


কয়েক বছর আগে আমি এক ব্লগারের সাথে দেখা করতে জেলখানাতে গিয়েছিলাম। জেলখানার সামনে দেখি শত শত মানুষ। দেখে মনে হচ্ছিলো, ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঙলাদেশের খেলা হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি মানুষই খুব উত্তেজিত, আবার কেউ কেউ খুব বেশি নীরস। জেলখানার প্রবেশের পর আমি যখন আমার পরিচিত ব্লগারের নাম উচ্চারণ করলাম, তখন আশেপাশের সবাই আমার দিকে এমন একটি দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো যেনো আমি দাউদ ইব্রাহীম কিংবা শামীম ওসমান বা দুর্ধর্ষ কোনো সন্ত্রাসী- যাকে এই পৃথিবীর সকল গোয়েন্দা বিভাগ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তখন বাঙলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিলো না। যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় যে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা অকল্পনীয় নয়। আমার সারা শরীরে যেভাবে তল্লাশি চালানো হয়েছিলো তা শুধু অস্বস্তিকরই নয় এবং বিরক্তিকরও বটে। কিন্তু অন্য মানুষজনকে সেভাবে তল্লাশি করেনি।

তখন হঠাৎ করেই দুইতিনজন চিৎকার করে বলছিলো- নাস্তিকের ফাঁসি চাই, নাস্তিকের ফাঁসি চাই। আমি কেঁপে উঠেছিলাম। সমস্যা কী? – তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম।

তারা আমার প্রশ্ন পাত্তাই দেয়নি। খুব আনন্দসহকারে নাস্তিকের ফাঁসি চাই নাস্তিকের ফাঁসি চাই বলে হাসিঠাট্টা করছিলো। আমি নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা কারা? নিরাপত্তাকর্মী জানালো, একজন ধর্ষণের মামলার দোষী সাব্যস্ত আসামী এবং আরেকজন দুই খুনের আসামী এবং আরেকজন মাদক ব্যবসায়ী। এই তিনজন আসামীর সাথে হয়তো তাদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব বা কোনো সন্ত্রাসী দেখা করতে এসেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে দেখলাম তাদের খুব ভাল সম্পর্ক। আন্ডারওয়ার্ল্ড যেভাবে চলে তারাও সেভাবেই আছে।

নিরাপত্তাকর্মীর সামনেই এক আসামী আমাকে বলল, নাস্তিকের লগে দেহা কর-তে আসছোস ক্যা? আমি সেই আসামীর দিকে তাকিয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেই। ঐ আসামী নিজ থেকেই বলল, যে আল্লাহ্‌রে বিশ্বাস করে-হ না, তারে মাইরা ফেলাই ভাল।

আমার খুব বিরক্ত লাগছিল। অপেক্ষা যেনো শেষ হচ্ছিলই না।
কথা কইতে পারস না? বোবা নি? - আসামী আমার উদ্দেশ্যে বলল।
আমি খুব বিরক্তির সাথে তাকে বললাম, আপনি হচ্ছেন খুনি। একজন খুনি অপরাধীর কোন অধিকার নেই কারো বিশ্বাস নিয়ে নিয়ে কথা বলার।
সেই আসামী উত্তর দিল, -আমরা শুধু খুন আর ধর্ষণই করসি, এইঠা এমন কিচ্ছু না, আল্লাহ্‌রে নিয়া তো কথা কই নাই।

আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে নিরাপত্তাকর্মী আমার উদ্দেশ্যে বলল, হ, ঠিকই বলছে।

এই কথা শুনে আমি কি অবাক হবো? নাকি কষ্ট পাবো? এরা আমাদের দেশের নিরাপত্তা কর্মী? পুলিশের প্রশাসনের কর্মরত সদস্যবৃন্দ!

সত্যি বলতে, আমি আসামীর উপর যতোটা ক্ষুব্ধ হই, তারচে’ বেশি রাগান্বিত হই নিরাপত্তাকর্মীর ‘হ, ঠিকই বলছে’ কথাটি শুনে। আমার কষে তার ডান গালে একটা চড় মারতে ইচ্ছে করেছিলো। কিন্তু হাত তোলা সমর্থন করি না বিধায় চুপ ছিলাম। আমি যদি কোনো রাজনীতিবিদ বা তাদের সুপুত্র হতাম, তাহলে হয়তো একটা চড় মারতেই পারতাম, রাজনীতিবিদ বা তাদের সুপুত্র হলে আমার বিবেকবোধও থাকতো না।

এতো বছরের জীবনে আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সাথে মিশে ও তাদের সম্বন্ধে জেনে এটাই বুঝেছি, আল্লাহ্‌র নামে যে কোনো কিছু করা সম্ভব। আপনার শুধু বলতে হবে আপনি ‘আস্তিক’ কিংবা ‘আপনি আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস রাখেন’। আপনি আস্তিক, আপনি বিশ্বাসী, আপনি আল্লাহ্‌য় ভরসা রাখেন- এইসব বললে আপনি যতোই বাজে কাজ করুন না কেনো, যতোই মন্দ, খারাপ, জঘন্য অপরাধ সংগঠিত করুন না কেনো আপনার পক্ষে কোটি কোটি মানুষ অবস্থান নিবে। এই ভয়ংকর ভাইরাস মানুষের বিবেককে নিহত করে ফেলেছে।


  • ২৫৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অনন্য আজাদ

ব্লগার।

ফেসবুকে আমরা