খান আসাদ

সমাজকর্মী

আমরা কি সহিংস নারীত্ব চাই, নাকি শান্তিপুর্ন পুরুষত্ব চাই?

ইংরেজিতে সেক্স ও জেন্ডার আলাদা শব্দ, বুঝতে অসুবিধা হয় না। একটি শারীরিক, অন্যটি সামাজিক। কিন্তু বাংলায় জেন্ডারের যুতসই শব্দ নেই। তবে, নারী ও নারীত্ব, এই দুই শব্দের পার্থক্য বাংলাতেও আছে।

শারীরিকভাবে নারী হিসেবে আমার নানীর তস্য নানীর সাথে আমার কন্যার কন্যা সন্তানের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু "নারীত্বে", মানে ব্যাক্তিত্বে বা সামাজিক ভূমিকায় বিশাল পার্থক্য আছে। শত বছরের ব্যাবধানে এদের নারীত্ব আলাদা। নারীত্ব মানে, আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক ভূমিকা।

তাহলে আমরা নারীর আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক ভূমিকা তথা নারীত্ব নিয়ে কথা বলছি। হোমোসেপিয়েন্স নারীর শরীর হয়তো সামান্য বিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নারীত্ব বিবর্তিত হয়েছে দ্রুত লয়ে।

নারীত্ব সামাজিক। নারীকে কি আচরণ করতে হবে, ব্যাক্তিত্বের প্রকাশ কিভাবে হবে, তাঁর সামাজিক ভূমিকা কি হবে, - এই সব কিছুই ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে সমাজের কাছ থেকে বুঝতে হয় এবং দেনদরবার করতে হয়। সমাজে আধিপত্যাকারী শ্রেণির (পুরুষ ও নারীর) প্রত্যাশা নারীর প্রতি কি, সেটা দ্বারাও নারীত্ব প্রভাবিত হয়।

নারীর এই যে আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও ভূমিকা বা অন্যকথায় নারীত্ব, তা গড়ে ওঠে সামাজিকায়ন প্রক্রিয়ায়। সমাজ থেকে সে কি মূল্যবোধ, বিশ্বাস, ধ্যানধারণা শিখছে বা শিখতে বাধ্য হচ্ছে, সেটাই নারীত্ব নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে একটি গবেষণা কাজে গিয়ে, আমাদের সমাজে নারীত্ব ও পুরুষত্বের শিক্ষা পরিবার থেকে কিভাবে ঘটে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। একটি বিষয় খুব কৌতূহলোদ্দীপক ছিলো। ছেলেটিকে যখন প্রতিযোগীতা, দৃঢ়তা, বলপ্রয়োগের ন্যায্যতা, অন্য কথায় সহিংসতার পক্ষের মূল্যবোধ শেখানো হচ্ছে, ঠিক বিপরীত মূল্যবোধ, যেমন সহযোগিতা, সহনশীলতা, যত্নশীলতা, অর্থাৎ শান্তির পক্ষের মূল্যবোধগুলো দেয়া হচ্ছে মেয়ে শিশুকে।

আমরা সবাই বুঝি, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে, নারীকে "শান্তির" মূল্যবোধ তাঁকে শোষিত বঞ্চিত ও পুরুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার সামাজিক প্রয়োজনে। কিন্তু, এবং কিন্তু, এর পরেও কথা থেকে যায়। যদি মানবিক ব্যক্তিত্ব বিবেচনা করি, তাহলে, আজকের এই সহনশীল, সহযোগিতা ও শান্তির মূল্যবোধ নিয়ে গড়ে ওঠা নারীত্ব একটি প্রগতিশীল ঘটনা, কারণ এটি শান্তির মূল্যবোধকে নারীত্বের শিক্ষায় বাঁচিয়ে রাখছে।

ইদানিং, নারীদের আচরণ বদলের অনেক ঘটনা দেখছি। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ছাত্রনেতার গুণ্ডামি। কয়েকদিন আগে, শাহবাগে এক নারীর প্রাক্তন প্রেমিককে ছুরিকাঘাত। এর বাইরে, একটি "নারীবাদী" ধারাও দেখছি, যারা নারীকে "সহিংস" হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

যেখানে প্রয়োজন ছিলো, ছেলে শিশুদের প্রচলিত নারীত্বের মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া। ফেমিনাইজেশন অফ বয়েজ। ছেলেটিকে সহনশীলতা, যত্নশীলতা, সহযোগিতা ও শান্তির শিক্ষা পরিবার ও স্কুল থেকে দেয়া। সেখানে কিন্তু উল্টোটা হচ্ছে। নারীকে সহিংস হিসেবে দেখার একটি প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে।

আমরা কি সহিংস নারীত্ব চাই, নাকি শান্তিপুর্ন পুরুষত্ব চাই? আশাকরি, নারীবাদীরা প্রশ্নটা নিয়ে ভাববেন।

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।