আমরা তাহলে কোথায় যাবো?

বুধবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ২:৫০ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


আমরা যারা বিদেশে থাকি, তাদের জীবনযাপনটা অনেকটাই সূক্ষ্ণ তারের ওপর দিয়ে ব্যালেন্স করে হাঁটার মতো। খুবই সাবধানে আমাদের চলতে হয়। একটু ব্যালেন্স হারালেই নিজের তো বদনাম হবেই, সেই সাথে হবে দেশের বদনাম। এই দেশের বদনামের পরিণতি কিন্তু সাংঘাতিক। যেহেতু এদেশের মানুষের কাছে আমরা বিদেশী, তাদের কাছে তাই আমাদের আচরণটাই পরবর্তীতে যারা বিদেশে আসবে, তাদের আচরণ জাজ করার মাপকাঠি। অর্থাৎ, ধরুন আমার ডিপার্টমেন্টের চেয়ার জানে আমি বাংলাদেশী, এখন আমি যদি ডিপার্টমেন্ট এর কোনো সম্পদ চুরি করি, তাহলে আমার বদনাম যেমন হবে, ঠিক তেমনি বদনাম হবে বাংলাদেশের। আর এর কুফল কোনো দোষ না করেও ভোগ করবে পরবর্তীতে আমাদের ডিপার্টমেন্টে পড়তে আসা বাংলাদেশের ছেলেমেয়েগুলো।

আমি কিন্তু কোনো এসাম্পশনের ওপর কথাগুলো বলছি না। এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ডিপার্টমেন্টেরই এক বাংলাদেশী স্টুডেন্টের উদ্ভট আচার আচরণ এবং রিসার্চ শেষ না করে চলে যাওয়ার ফলাফল আমাকে কোনো দোষ না করেও ভুগতে হচ্ছে। পিএইচডিতে আমাকে রিকমেন্ডেশন দেওয়ার জন্যে আমার এডভাইজর আমার কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের দুই মাস আগে থিসিসের ড্রাফট চেয়েছেন। যেটা আজ পর্যন্ত আমাদের ডিপার্টমেন্টের কোনো প্রফেসর করেন নি, আমার নিজের এডভাইজরও করেন নি। এছাড়া যে কোনো কাজে প্রফেসরদের কাছে গেলেই আমাকে শুনতে হয়, তোমার দেশের এই স্টুডেন্ট তো এই করেছে, আশা করি তোমার এরকম সমস্যা হবে না। এটা যে কতো বড়ো একটা চাপ সৃষ্টি করে মনের ওপর, এটা আমেরিকায় পড়াশোনা করছে এরকম যে কোনো গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টই বুঝতে পারবে।

যে মুসলিম জঙ্গীটা "ইসলাম কায়েম করার" জন্য আজ বোমা ফাটিয়ে দেশের "মুখোজ্জ্বল" করলো, এর ফলে বাংলাদেশের জন্য কঠিন দিন আসতে পারে। জানি না এই ঘটনার এখানেই শেষ কিনা। নাকি আমেরিকার আনাচে কানাচে আরো জিহাদ করার প্ল্যান এদের আছে। যদি এরকম হয়, এর মূল ভুক্তভোগী হবে আপামর বাংলাদেশীরাই। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা নাস্তিক, বাংলাদেশী মাত্রই আমেরিকার ভিসা প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মানুষের আমেরিকায় প্রবেশের ব্যাপারে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর ফলে এসব দেশের মানুষজন যে কী বিপদে পড়েছে সেটা একেবারে চোখের সামনে দেখেছি।

এসব দেশের ছাত্ররা পড়াশোনা অর্ধসমাপ্ত রেখে দেশে যেতে পারছে না। নানারকম পারিবারিক সমস্যা, ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যু, বা যে কোনো গুরুতর কারণই থাকুক না কেনো। অনেকে দেশের জমিজমা সম্পত্তি বেচে আমেরিকায় এসেছে কাজ করতে। প্রতি বছর বা দুই তিন বছর পর পর হয়তো দেশে যেতো। এখন তাও পারছে না। দুজন ছাত্র শুনলাম দেশে গিয়েছিলো ছুটি কাটাতে। আর আসতে পারে নি। বাংলাদেশের উপরেও যদি এ ধরণের নিষেধাজ্ঞা কায়েম হয়, তবে আমাদের অবস্থাও একইরকম হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো আর নিজেদের মেধা বিকশিত করার, গবেষণা করার জন্য আমেরিকার মতো গবেষণাকাজের স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিজনেস এবং টুরিস্ট ভিসার অনেক কড়াকড়ি হয়েছে। আমাদের এক ছাত্রের বাবা মা নিজেদের ছেলের বিয়ে এটেন্ড করতেও আমেরিকা আসার ভিসা পান নি। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েরা ফুল ফান্ডিং/ স্কলারশিপ পেয়েও আমেরিকার ভিসা পাবে না।

ধর্মীয় হিংস্রতা হতে যদি মানুষ নিজেদের মগজ রক্ষা করতে না পারে, প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভবিষ্যত হবে ভয়াবহ। দেশে আমরা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবো না। রিলিজিয়াস বাইগটদের যন্ত্রণায় বিদেশে সম্মুখীন হবো রেসিজমের।

আমরা তাহলে কোথায় যাবো? 


  • ৩৬৩৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

বৈশালী রহমান

রিসার্চ এসিস্টেন্ট, নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা।

ফেসবুকে আমরা