আমার লাশের স্বত্বাধিকার আমি লিখে দিয়ে যাবো

সোমবার, জুন ৪, ২০১৮ ৪:৪৩ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ যখন ক্যান্সারে ভুগেছেন তখন পুরোটা সময় তার পাশে থেকেছে তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন। মারা যাওয়ার আগ অব্দি তার ছেলেমেয়েরা কেউ তার খোঁজ নেয় নি। হা এখানে জটিলতা ছিলো। বাবা তাদের মায়ের সাথে অন্যায় করায় তারা বাবার সাথে যোগাযোগ রাখে নি।

একেবারেই অস্বাভাবিক না। অস্বাভাবিক কখন? যখন তারাই মানুষটা মারা যাওয়ার সাথে সাথে তার লাশ নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু করে দিলো। তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে মিডিয়ার সামনে এসে বললো, আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। তখন সমস্ত রোষ গিয়ে পড়ল তাদের বাবার পছন্দের মানুষটির উপর। শাওন তাদের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার পরও তারা ক্ষমা করতে পারে না। পারার কথা না। কিন্তু যে শাওন তাদের শ্রেষ্ঠ বাবাকে শেষদিন অব্দি যত্নে আর ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রেখেছে সে শাওন কে উপেক্ষা করে তারা বাবার লাশের মালিকানা নিয়ে টানাটানি শুরু করলো। এমনকি লেখকের নিজের জানিয়ে যাওয়া ইচ্ছের কথাকে উপেক্ষা করে তারা নিজেদের পছন্দমতন জায়গায় লেখককে শায়িত করতে চেয়েছিলেন। এটা কতটা ভালোবাসা ছিলো আর কতটা অধিকারের আর মালিকানার লড়াই ছিলো?  

না, আমার মূল প্রসঙ্গ লেখকের পারিবারিক জীবন নয় একেবারেই। এটা শুধুমাত্র একটা উদাহরণ যে একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার পছন্দ, ইচ্ছে কতটা নগণ্য হয়ে যায়, সে কতটা জড়বস্তু হয়ে ওঠে, কতটা তার আত্মীয় স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীর সম্পত্তি হয়ে ওঠে!

একটি মেয়ে ঠিক যখন তার ছাত্রজীবন শেষ করে সফল ক্যারিয়ারের দিকে হাঁটার কথা, স্বপ্নপূরণের সময় তার, পুরো পৃথিবীটা যখন তার হাতে বিজিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক সেই সময়টা সে শুনতে পেলো, তার মায়ের ক্যান্সার। সীমিত সময় সেই মানুষটির হাতে, যার আর কোনো চিকিৎসা নেই। আকাশ ভেঙে পড়লো তার মাথায়। সব কিছু ফেলে সে মায়ের সর্বোচ্চ চিকিৎসার জন্য মাকে বিদেশ নিয়ে গেলো। সে ভাবে নি যে এই মানুষটা তো থাকবেই না, আমি আমার ক্যারিয়ার এর দিকে মন দেই। মানুষটা বাঁচবে না জেনেও সে সব রকম চেষ্টা করে যেতে থাকলো, যদি দুটো দিন ও বেশি কাছে ধরে রাখা যায়। মা হয়ে গেলো তার সন্তান। সন্তানের মতো করে প্রতিটা মূহুর্তে মাকে খাওয়ানো, গোসল করানো, পায়খানা প্রসাব পরিষ্কার করা, সব করতে লাগলো। যতটা সময় বেশি মায়ের কাছে থাকা যায়। ঠিক করলো, যদি মা বিছানায় পড়ে থাকে তাহলে তাই থাক। শুধু বেঁচে থাকুক। সারাজীবন সে শিশু মাকে নিয়েই কাটিয়ে দেবে। কিন্তু মায়ের শেষ দিন ঘনিয়ে এলো। এবং এখন ঘর আত্মীয় স্বজনে ভরে গেলো। একলা মেয়েটা যখন মাকে নিয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে মরণঘাতী রোগের সাথে, মাকে যে কোনো মুহুর্তে হারিয়ে ফেলার ভয়ের সাথে লড়াই করছিলো তখন এরা কেউ ছিলো না। ঠিক শেষ সময় যখন মানুষটার কথা বন্ধ হয়ে গেছে তখন আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর মানবিকতা, ভালোবাসা, প্রেম, মহব্বত, অধিকারবোধ, কর্তব্যবোধ সব উতলে উঠলো। তারা আকাশবাণীতে জানতে  পারলো, মেয়েটি প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাসী নয়, তাই মেয়েটির মা আজ মরণাপন্ন। সমস্ত দোষ ই মেয়েটির। মেয়েটির এই অপরাধের শাস্তিই তার মা ভোগ করছে। তারা মেয়েটির এই পাপস্খলনের দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিলো। কারণ মানবিকতা তাদের সর্বাঙ্গে কিলবিল করে। তারা মরণাপন্ন মানুষটির মেয়েটির থেকেও আপনজন হয়ে উঠলো। মানুষটিকে ঘিরে বসে গেলো তারা। যদি বিশ্বাসীদের ছোঁয়া পেয়ে মরণাপন্ন মানুষটি বিছানায় উঠে বসে! আর যদি মারাই যায় তবে মানুষটির অবিশ্বাসী মেয়েটির জন্য তাকে যাতে নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে না হয় সেটা অন্তত তারা নিশ্চিত করেই ছাড়বে।

তারা আকাশবাণীতে শুনতে পেলো, মেয়েটি বিশ্বাস না আনা পর্যন্ত, মেয়েটি তাদের পয়গম্বরের কাছে মাথা নত না করা অব্দি পয়গম্বর কথা দিতে পারছেন না যে তার মাকে নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারবেন কিনা। শুভাকাঙ্ক্ষী স্বজন ও প্রতিবেশীর দল মেয়েটিকে তাদের পয়গম্বরের নিকট মাথা নত করিয়েই ছাড়লো। তবু মেয়েটি একবার তার মাকে ছুঁয়ে দেখতে পারলো না। কেননা এই শেষ সময়ে এখন তো মানুষটির প্রতি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তার স্বর্গের টিকিটটা যেন কোনো ভাবেই মিস না হয় তা খেয়াল রাখা। অষ্টপ্রহর তাকে ঘিরে চলতে লাগলো বিশ্বাসীদের স্বর্গলোলুপ কণ্ঠের তাণ্ডব নৃত্য।

শেষ মূহুর্তে মেয়েটি যখন একবার তার মাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে চেয়েছিলো, একবার মায়ের হাতের চামড়া ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলো, শেষবারের মতো মায়ের চুলের গন্ধ নিতে চেয়েছিলো তখন তাকে তার মায়ের কাছে কেউ ভিড়তে দেয় নি। মায়ের কথা বন্ধ হয়ে গেছিলো। মা জোর করে বলতে পারে নি, আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দাও। পৃথিবীতে তার শেষ মূহুর্তটুকু সে তার সবচেয়ে আপনজন, তার কলিজার টুকরা, যাকে সে অনিশ্চিত জীবনে ফেলে যাচ্ছে, আজ যার প্রত্যেক সাফল্যে তার সাথে সাথে হাটার কথা ছিলো, যাকে নতুন জীবনে প্রবেশ করতে দেখে সে সুখ পেতো, সেই মেয়েটার মুখটুকু সে দেখতে পায় নি। তাকে আত্মীয় আর পাড়া প্রতিবেশীর মাঝে হাহাকার করতে করতে মরতে হয়েছে। সে কাউকে বলতে পারে নি তার এখন কাকে পাশে প্রয়োজন। মানুষটা মারা যাওয়ার সাথে সাথে সে সত্য সত্যই জড়বস্তু হয়ে গেলো। পবিত্রতার নাম করে তাকে নামিয়ে নেয়া হলো বিছানা থেকে। গোসল করিয়ে পবিত্র করানো হলো। তারপর আর মেয়েটিকে মায়ের কাছে যেতে দেয়া হলো না।

কল্পনা করুন হে বিশ্বাসীর দল। কল্পনা করুন আপনার মা মারা গেছেন। আপনি মায়ের জন্য স্বর্গের টিকিটের ব্যবস্থা করতে চান। আপনার চারিপাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিশ্বাসীর দল আপনাকে কিছুতেই পয়গম্বরের সাথে আলাপ করতে দিচ্ছে না। কল্পনা করুণ সেই ক্ষণ। কারণ তারা বিশ্বাস করে ঈশ্বর নেই। তাই আপনাকে ঈশ্বরের শরণাপন্ন হতে দিচ্ছে না। কারণ তারা বিশ্বাস করে এটা মূর্খামি, অনর্থক কাজ, তাই তারা আপনার মাকে নিয়ে কোনো ধর্মীয় আচার পালন করতে দিচ্ছে না। কল্পনা করুন সেই মূহুর্ত। কেমন বোধ হচ্ছে? যে মেয়েটির কাছে শেষ মূহুর্তে মা কে একবার ছুঁয়ে দেখাটাই জীবনের পরম প্রাপ্য ছিলো, সেই মেয়েটিকে মায়ের মুখটাও ভালমতো দেখতে দেয় নি আপনাদের সমাজ। কি অপূরণীয় ক্ষতি আপনারা মেয়েটির করেছেন তা বোঝার মতন মগজ আপনাদের পয়গম্বর আপনাদের দেয় নি।

আমি লিখে রেখে যাবো আমার লাশের আশে পাশেও কাকে কাকে ভিড়তে দেয়া হবে না। আমার একমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি আমার শরীর এবং আমার মন। আমার লাশের উপর কোনো নোংরা লোকের পোদ্দারি আমি করতে দেবো না। আমার লাশের  স্বত্বাধিকার আমি লিখে দিয়ে যাবো। আমি যাবো না তোমাদের স্বর্গে। তোমাদের পয়গম্বরকে আমি বলে দেবো আমি তোমাদের মতো নোংরা মানুষের সাথে থাকতে চাই না।     


  • ৫৩০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

চৈতি সাহা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

ফেসবুকে আমরা