আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই অরিত্রিদের বাঁচতে দেয় না

শুক্রবার, ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ ১০:৩০ AM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


অরত্রীর মৃত্যু আত্মহত্যা না। এইটা হত্যা।

এই হত্যার দায়ভার আমাদের শিক্ষা কাঠামোর। যে কাঠামোর সফল ধারক এবং বাহক ভিকারুন্নেছার প্রধান শিক্ষিকা। বিষয়টা কি এমন অরিত্রী দূর্বল মনের ওই জন্য আত্মহত্যা করেছে ? না একদমই ঠিক না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি আমাদের স্কুলে এবং কলেজে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন একবার করে মরে যাওয়ার কথা ভাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা ৮। প্রতি বছর এসএসসি এবং এইচ এস সিতে ফেল করে কতজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে তার সঠিক হিসাব কয়জন রাখি?

গত মাসেই ময়মনসিংহের এক ছাত্রী অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। গত দুই দিনে ফেইসবুকেই যে পরিমাণ শিক্ষক দ্বারা নিগ্রহের ঘটনা সামনে উঠে এসেছে তাতে শিক্ষকতা একটি মহান পেশা এইটা আর বলতে পারছি কি?

নাম করা স্কুল কলেজগুলা হচ্ছে ক্ষমতার কোষাগার। ভিকারুন্নেছা, হলিক্রস এই সব স্কুলে গোপন কোটা ব্যবস্থা থাকে সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশেষ ছেলে মেয়েদের পড়া শোনার জন্য। সরকারি নিয়মেই এক শ্রেণিতে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাস করতে পারবে না। ভিকারুন্নেসায় ৯০ থেকে ১১০ জন ক্লাস করে স্বাভাবিক ভাবেই। অতীতে পরিমলের মতো যৌন নিপীড়ক শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তারপরও শিক্ষার্থীর পাশে তাদের পাওয়া যায় নি।

আমাকে ঢাকা শহরের একটা স্কুল দেখান যেই স্কুলের কোনো শিক্ষক প্রাইভেট পড়ান না বা কোচিং এ পড়ান না। আমাকে ঢাকা শহড়ের একটা স্কুল দেখান যেইখানে শিক্ষার্থীকে মানসিক নির্যাতন করা হয় না। কোথাও কোনো জাবাব দিহিতার চল দেখেছেন? হয় আমরা জেনেও না জানার ভান করি অথবা আশে পাশে এত অন্যায় দেখে এইগুলাকে আমাদের দুধ ভাত মনে হয়। আর এককভাবে ভুক্তভোগী অভিভাবকরা একা একা অপমান হজম করতে না পেরে সন্তানের উপর রাগ ঝাড়ে, অপমান ট্রান্মফার করে। অরিত্রী মোটেও আত্মহত্যা করে নি। অরিত্রী যেন মরে তার জন্য আশে পাশে সমস্ত আয়োজন করাই ছিলো। মেয়েটা শুধু সবার চাওয়া বাস্তবায়ন করেছে।

শিক্ষা বিজ্ঞানে একজন শিক্ষার্থী যখন অকৃতকার্য হয় তার দায়ভার সরাসরি শিক্ষকের, এবং এর পরের দায়ভার প্রতিষ্ঠানে প্রধান হিসেবে প্রধান শিক্ষকের। এর কোনো ব্যতয় নাই। একজন শিক্ষার্থীর না পারার পিছনে সমস্ত দায়ভার শিক্ষকরে। সারা দুনিয়ায় সমস্ত শিক্ষা বিজ্ঞানে এইটা স্বীকৃত। এইবার শিক্ষক কারণদশার্তে পারেন একহাজার একশ একটা। কিন্তু ছাত্র না পারলে এই ব্যার্থতা শিক্ষকের। এখন আমাদের দেশের নকলের যে প্রকোপ সেইটা আসে ছাত্র ছাত্রীরা পারে না সেই যায়গা থেকে। পারলে নকল করবে কেনো? পারে না কারণ তাদের সেইভাবে পড়ানো হয় না তাই। বিষয়টা খুবই সহজ। এত জটিল কিছু না। সারা বছর আমি পড়াতে পারবো না। অথবা আমি শিক্ষক যেন ভালো ভাবে পড়াতে পারি সেই ব্যাবস্থা স্কুল আমাকে করে দিবে না অথচ বছর শেষে আমি আশা করবো আমার ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষার সময় সব পারবে। বিষয়টা কি মামদোবাজী না? 

একটা শিক্ষা ব্যাবস্থার দুইটা অংশ থাকে শিক্ষা কাঠামো আর শিক্ষা সংষ্কৃতি। কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্র যা যা আয়োজন করে রেখে দিয়েছে আমাদের শিখার জন্য তা। আর সংষ্কৃতি হচ্ছে আমাদের মা, বাবা, শিক্ষক, আমি, আপনি মন্ত্রী, মিনিষ্টার উনারা শিক্ষা নিয়ে যা ভাবেন এবং চর্চা করেন তা। শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে শিক্ষক সংখ্যা, পাঠ্য পুস্তক, শিক্ষকদের পড়ানোর তরিকা, কারিকুলাম, পরীক্ষা পদ্ধতি এইগুলা পড়ে। আর সংষ্কৃতির মধ্যে পড়ে স্যার ছেলেরে আপনার কাছে দিয়ে গেলাম, মাংস আপনার হাড্ডি আমার, এই কবিতাটা মুখস্ত বলো, বাবা মা কিছু শেখায় নি, তু্ই তো একটা উল্লুক কিছু্ই পারিস না, বেঞ্চের উপর দাড়া, কান ধর, টিসির ভয়, ভাবী আপনার মেয়ে ফেল করলো? এইগুলা সবই সংষ্কৃতির আওতা ভুক্ত। আমাদের শিক্ষা কাঠামো এবং সংষ্কৃতি দুইটাই বলে অরিত্রী তোদের মুক্তি নাই, তোরা মরে যা। অবশেষে অরিত্রী মরিয়া প্রমান করিলো আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা ওদের বাচঁতে দিবে না।


  • ৪৩৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

দিলশানা পারুল

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে পড়াশোনার পাশাপাশি লম্বা সময় ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে যুক্ত ছিলেন দিলশানা পারুল। দশ বছর বামপন্থি রাজনীতির সাথে ‍যুক্ত ছিলেন, তারপর দশ বছর এনজিওতে শিক্ষা গবেষনা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় এডুকেশন সেক্টরে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি অনলাইনে লিখালিখি করেন।

ফেসবুকে আমরা