আমাদের গেছে যে দিন...

শনিবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭ ২:৫৮ AM | বিভাগ : ওলো সই


শীতকাল এলে সন্ধ্যায় আমার দুইখানে যাওয়া বাড়ে। এক হলো ধানমন্ডি লেকের পার, ৩২ এর ওখানে। আরেকটা হলো মাইটি টিএসসি। কারণটা সম্ভবত এই দুইজায়গার চা। আমি চা-খোর নই একদমই, কিন্তু শীতের সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্ট এ বসে কোল্ড ড্রিংকস খেতে ভালো লাগে না আসলে। এই দুই জায়গায় এত ক্যারিকেচার করা চা পাওয়া যায়, কাপের পর কাপ গিলতে অসুবিধা হয় না।

আজ হুট করে একটা জিনিস মাথায় এলো। চা খাচ্ছিলাম তিন বন্ধু, আদতে তিনজন মেয়ে। মাথায় আসায় আশেপাশে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম কোনো মেয়েদের গ্রুপ নেই। মেয়ে যে নেই তা না, অনেক মেয়ে-ই আছে। কিন্তু তাদের সাথে কোনো না কোনো ছেলে আছে। হয় প্রেমিক, কিংবা বন্ধু, কিংবা অন্য কেউ।
কিন্তু মেয়েদের গ্রুপ নেই একটাও।

বন্ধুত্বে লিংগ জিনিসটা কতটা প্রভাব রাখার মতো সে হিসাব আমার আলোচ্য না আসলে, আমি শুধু মেয়েদের বন্ধুত্ব ব্যাপারটা চিন্তা করছি।

ছেলেদের বন্ধুত্বে একটা ব্যাপার আছে, দিন যত যায় এদের বন্ধুত্ব তত বাড়ে, হয়তো দশ পনেরো বিশ বছর পরে এরা নিজের ভাই-এর থেকেও নির্ভরযোগ্য হয়ে যায় অনেক সময়!

এর কারণ যেটা আমার কাছে মনে হয় তারা বন্ধুত্ব সম্পর্কটার যত্ন নেয়। পরস্পরের কাছে একে অন্যকে প্রয়োজনীয় করে তুলে, নির্ভর করে তুলে। কিন্তু মেয়েদের সম্পর্কগুলোয় কেনো যেন একটা সময় এসে সুতোয় টান পড়তে থাকে। কারণটা সম্ভবত সাংসারিক, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিকতার চাপ।

চাইলেই মেয়েরা ব্যাচেলর ট্যুর করতে পারে না।
চাইলেই মেয়েরা একটা লেট নাইট লং ড্রাইভে যেতে পারে না।
চাইলেই হ্যাং-আউট করতে পারে না।
একটা আউটিং করতে পারে না।
খেলা দেখার জন্য বা অন্য কোনো কারণে স্টে-ওভার করতে পারে না অন্য ফ্রেন্ডের প্লেসে।
রাত জেগে মিউজিক ফেস্টে যেতে পারে না।
কি কি করতে পারে না সে লিস্টি বিশাল।
কিন্তু কারণ সম্ভবত একটাই।
নিরাপত্তার অভাব!

কিন্তু আজ আমার মাথায় এলো শুধু নিরাপত্তার অভাবই কি কারণ?
সন্ধ্যা বেলায় টিএসসি-লেকের মতো জনবহুল এলাকায় নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা কিন্তু কম, যে মেয়েরা আড্ডা দেয় না এর আরেকটা সম্ভবত মেয়েদের যত্নহীন বন্ধুত্বের কালচার।
হ্যাঁ, বন্ধুত্বে বাইরে আড্ডা দেয়াটা খুব জরুরি নয়। বন্ধুত্ব থাকতে পারে ফোনে ফোনে, বন্ধুত্ব থাকতে পারে অনেক দিন পর পর দেখা হওয়ায়-ও। কিন্তু বন্ধুত্ব সম্পর্কটার আসলেই যত্ন নিতে হয়, না হলে মরিচা পড়তে পড়তে সেটা একসময় বাতিলের খাতায় চলে যায়।

একবার একটা মেয়েদের গেট টুগেদার এর কথা হচ্ছিলো, শুক্রবার ছাড়া দিন মিলে না। শুক্রবার দিন ঠিক হলো। পরে একজন আসতে পারবে না বলে অপারগতা জানালো, ওই দিন তার পার্টনার তার বন্ধুদের হুট করে দাওয়াত করেছে, তাকে গেস্টদের জন্য রান্না করতে হবে, সে আসতে পারবে না।
হেসে ফেলেছিলাম।

হ্যাঁ, বান্ধবীটি হয় তো তার পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার জন্য যেটা ভাল সেই সিদ্ধান্তটিই নিয়েছে, এই সিদ্ধান্তটিকে জাজ করা উচিৎ নয়। কিন্তু পরে আমাদের জিটুজির ছবি দেখে সে যে আফসোস করেছে সেটাকে আমি জাজ করতে চাই। কারণ এই আফসোসটুকু কিন্তু তার করা উচিৎ নয়, কারণ এই আফসোসের মূল তার প্রায়োরিটি সেটিংস!

ফি বছর যখন আমার মফস্বল শহরে ঈদ লাগে, মৌবন থেকে জিলা স্কুলের মোড় ছাড়িয়ে ছেলেদের আড্ডা আর খা খা করতে থাকা গার্লস স্কুলের সামনটা বন্ধুত্বের এই পার্থক্যটুকু চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

আমার নিজের বন্ধুভাগ্য বেশ ভালো।
স্কুল, কলেজ, মেডিকেল, চাকরীর জায়গা থেকে আমি এত এত বন্ধু/বান্ধবী পেয়েছি (এবং পাচ্ছি) যে মাঝে মাঝে নিজের-ই অবাক লাগে।

বন্ধুত্বে ছেলে/মেয়ের পার্থক্য আমি কখনোই করি না, আর বন্ধুত্ব খুবই চলমান প্রক্রিয়া। এই এখন যে আমার 'বেস্ট ফ্রেন্ড', পাঁচ বছর পরেও যে সে 'বেস্ট ফ্রেন্ড' থাকবে তা-ও নয়।
কিন্ত আমি আজ থেকে বিশ পঁচিশ বছর পরে আমার যত্নহীনতার জন্য হারানো কোনো বন্ধুত্ব নিয়ে আফসোস রাখতে চাই না আসলে। আমার যেন মনে না হয় 'আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে – কিছুই কি নেই বাকি?'


  • ১৬১৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

ডা. রুমানা বিনতে রেজা

মেডিকেল অফিসার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা