আমাদের সম্মিলিত লড়াইয়ের গল্প

শুক্রবার, অক্টোবর ১২, ২০১৮ ১২:১৭ AM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


(লেখাটা লিখতে পারলাম দু'দিন পর, সব সামলে ওঠার জন্য এ সময়টুকুর দরকার ছিলো)

দু’টো অহিংস ফেইসবুক পোস্টের জন্য মামলা হয়ে গেলো শিক্ষক মো.মাইদুল ইসলামের নামে। কেউ ভাবতেও পারে না এই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা হতে পারে। আরেকবার গোটা দেশ দেখলো কি বেরসিক জাতি আমরা!

কোটা সংস্কার নিয়ে লেখালেখি করায় এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা পোষণের জন্য হুমকিপ্রাপ্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ার আটদিন পর তথ্য প্রযুক্তি আইনের সাতান্ন ধারায় মামলা করা হয় তাদের এই নিপীড়নকে বৈধতা দানের জন্য। মামলা হওয়ার আট দিন আগে একজন শিক্ষকের হুমকির মুখে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা গুটিকয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়া আর কাউকে মোটেও বিচলিত করে নি।

খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ, নিন্দা জানাতে লাগলেন। অসংখ্য মানুষ এ থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করতে লাগলেন। সর্বপ্রথম ফোন আসলো মেজবাহ ভাই এবং পপি আপার কাছ থেকে। এরপর চট্টগ্রামের আইনজীবী ভুলন দা এবং হাইকোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম ভাইয়ের কাছ থেকে। কি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এই মানুষগুলো তা লিখলে তাদেরকে অল্প শব্দে বন্দি করা হবে, সুতরাং সে চেষ্টা থেকে নিবৃত্ত হলাম।

৬ আগস্ট মাইদুলের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন শুনানি হয় হাইকোর্টে। এর জন্য কাজ করেন অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম, ব্যারিস্টার অনীক, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ড.জাহেদ ইকবাল, অ্যাড. আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি, অ্যাড. রিয়াজ, অ্যাড. রোকন, অ্যাড. হুমায়ূন কবীর, সর্বোপরি অ্যাড. আবেদাসহ অনেকজন আইনজীবী।

মাইদুলের জন্য ছিয়াশি বছর বয়সের একজন সাবেক বিচারকও এসেছিলেন হুহইল চেয়ারে করে, তেষট্টি বছরের আইন পেশার অভিজ্ঞতা নিয়ে! এই আন্তরিকতা, ভালোবাসা প্রকাশ করার মতো না। জামিন হলো মাইদুলের। সবার চোখেমুখে স্বস্তি, একজন মানুষকে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে মত প্রকাশের দায়ে হাজতে প্রেরণ থেকে রক্ষা করার স্বস্তি।

কিন্তু জীবন এরপরও স্বাভাবিক হয় না। আদালত মুক্তি দিলেও আমরা অনিরাপত্তার কারণে ফিরতে পারছিলাম না ক্যাম্পাসে। প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ায় তারা অস্বীকার করেছে যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে থাকি! শিক্ষক সমিতিকেও অনুলিপি পাঠিয়ে জানায় মাইদুল কিন্তু শিক্ষক সমিতির কাছ থেকে একটা জবাব পর্যন্ত পাই নি আমরা। মাইদুলের ক্লাস থাকায় ঝুঁকি নিয়ে অনিরাপদ অবস্থাতেই ফিরতে হয় দেড় মাস পর। এর পরে ক্যাম্পাসে আমাদের দিনগুলো কেমন যাওয়ার কথা এটা জলের মতো পরিস্কারভাবে অনুমান করা যায়।

জামিনের মেয়াদ পাঁচ দিন বাকি থাকতেই ২৪ শে সেপ্টেম্বর নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। অনেকটাই নির্ভার সবাই। মাইদুল ডাকাত নয়, দুর্নীতিবাজ নয়, হাজার কোটি টাকাও লোপাট করে নি। শুধু তার গণতান্ত্রিক অধিকাররের চর্চা করেছে, মত প্রকাশ করেছে মাত্র।

সবাই ভাবছিলো যা সংবিধানসম্মত তার জন্য জেল-হাজত হবার কথা নয়। এর জন্য উচ্চ আদালতকে পাশ কাটিয়ে নিম্ন আদালত একজন যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার মানুষকে হাজতে প্রেরণ করবে এটা ভাবতেও নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিলো। কিন্তু ঘটলো উল্টোটা। জামিন বাতিল করে তাকে হাজতে প্রেরণ করা হলো।

যে মুহূর্তে এ আদেশ এলো মাইদুলকে নির্বিকার দেখলাম। প্রস্তুত ছিলো সে। সে সমাজবিজ্ঞান পড়ায়, এসব তার কাছে জলের মতো পরিষ্কার। তার পরিচিত হাসিমুখ নিয়ে বীরের মতো নিজেই এগিয়ে গিয়ে পুলিশদের সহায়তা করলো। হাজতে গেলো শিক্ষক মাইদুল ইসলাম। 

গ্রেফতারের পরদিন থেকে জামিনের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন প্রতিবাদ চললো। সোশ্যাল মিডিয়ায়, রাস্তায়। নিরপরাধ শিক্ষককে জেলে পাঠানোর জন্য। শিক্ষক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ প্রতিবাদে রাস্তায় নামলেন। চট্টগ্রামে 'উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ' এর সংগঠক হিসেবে প্রাণান্ত কাজ করেছেন সাবেক কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস পপি আপা। কিভাবে ছায়ার মতো সঙ্গে ছিলেন সেটা বাখ্যাতীত। একদিনও কোর্টে আমাকে একা ছাড়েন নি, একমুহূর্তের জন্য একা মনে করতে দেন নি আমাকে। প্রত্যেক দিন চার-পাঁচ বার ফোনে কথা বলেছেন। এখানকার আরেকজন অভিভাবক হলেন মেজবাহ ভাই। সারাক্ষণ ছিলেন আমাদের পাশে। আমি কি করে এত ঋণ শুধবো তাই ভাবছি। এছাড়াও ছিলেন সুশীল সমাজের মানুষেরা। ধন্যবাদ বলতেও অপরাধবোধ হয়। শুধু ভালোবাসা আপনাদের মতো মানুষদের জন্য।

শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, শাহবাগে, চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছে, অনেকবার মানববন্ধন করেছে, কালো ব্যাজ পরে পরীক্ষা দিয়েছে। শিক্ষকমন্ডলী যোগ দিয়েছেন তাতে। সম্মানিত শিক্ষকগণ বিবৃতি দিয়েছেন, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন। সর্বশেষ, রিমান্ডের খবরে শিক্ষকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চলমান ভর্তি পরীক্ষায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে পরীক্ষা নিয়ে প্রতিবাদ জানান।

পরদিনও একইভাবে প্রতিবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ মিছিল করেন। জামিন হওয়ার পরও তাকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেছেন সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ। সারাদিন মুখে কালো কাপড় বেঁধে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। এই প্রতিবাদের ভাষা কত তীব্র সেটা কি আর অবোধ্য! এছাড়াও সারাদেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণ ফোনে সাহস যুগিয়ে গেছেন আমাকে। এ ঋণ শুধবার মতো নয়।

হাইকোর্ট এবং জজকোর্টে আমাদের আইনজীবীরা দিনরাত পরিশ্রম করে যেতে লাগলেন জামিনের জন্য। আইনজীবীদের কথা কি বলবো! তারা কোর্টরুমে মাইদুলের জন্য লড়ছেন, কোর্টের বাইরে মানববন্ধনে যোগ দিচ্ছেন। কথা বলছেন 'ডিজিটাল কামান' এর বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের আইনজীবীদের মধ্যে আছেন অ্যাড ভুলন লাল ভৌমিক, বার কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি সালাউদ্দীন হায়দার চৌধুরী, অ্যাড. আখতার কবির চৌধুরী, অ্যাড. আমীর আব্বাস তাপু, অ্যাড. বিশুময় দেব, অ্যাড. রাজীব বাবু , ইশতিয়াক, শায়রাসহ প্রমূখ আইনজীবি। খুব মজার মানুষ ভুলন দা। ডিজিটাল কামান শব্দটা দাদার কাছেই শোনা। অভিভাবকসুলভ তিনি। মাইদুল গ্রেফতার হওয়ার পর ধমকে দুপুরের খাবার খাইয়েছিলেন আমাকে। তাপু দা'কে মনে হয় নিজের বড় ভাই। বিশুদা ও তাই।

উচ্চ আদালতে তার জামিন শুনানি যখন কার্য তালিকায় তখন নিম্ন আদালতে পুলিশের আবেদনের ওপর রিমান্ড শুনানি চলছে মাইদুলের। উচ্চ আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের সময়ের আইনজীবিগণ ছিলেন তাঁরা আছেন। বিজ্ঞ আইনজীবিরা বলছেন এটা হতেই পারে না। হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলায় নিম্ন আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করতেই পারে না। উপরন্তু এর নথি সরবরাহ করে এক সপ্তাহ সময় চাওয়া হলো রিমান্ড শুনানির কিন্তু নিম্ন আদালত সময় না দিয়ে পরের দিনই রিমান্ড মঞ্জুর করলো। চট্টগ্রামে আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবিগণ এবং হাইকোর্টের আইনজীবিগণ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। এর মধ্যে দু’টো দিনের পুরোটা সময় উচ্চ আদালতে মাইদুলের জন্য জামিনের কাজ করছিলেন সেখানকার আইনজীবিগণ। হাসনাত কাইয়ুম ভাই যখন কোর্টরুমে সারাদিন কাটাচ্ছেন আমাদের জন্য তখন তাঁর মা হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে! আমার সঙ্গে প্রতিদিনই একাধিক বার ফোনে কথা হয়েছে কিন্তু একবারও এতবড় ত্যাগের কথা বলেন নি! সাধারণের পক্ষে এরকম ত্যাগ অসম্ভব। খুব শান্তভাবে কথা বলেন কাইয়ুম ভাই, উনার সঙ্গে কথা বললে সব চিন্তা দূর হয়ে যায়, ভরসা পাওয়া যায় কিন্তু বুঝতে পারি নি তিনি নিজে কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে আরেক আইনজীবি জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দাদার বাবা পৃথিবী ছেড়েছেন। কতগুলো মানুষের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে, অক্লান্ত পরিশ্রমে এই দুঃসময়ে মাইদুলের জামিন করানো গেছে তা বর্ণনাতীত। এর জন্য তাদের ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা কোনটাই বলা যায় না, শুধু ভালোবাসা যায়।

শেষমেষ ৮ অক্টোবর রিমান্ড উচ্চ আদালত থেকে জামিন পায় মাইদুল ইসলাম। মা'কে আইসিইউতে রেখে যিনি কোর্টে সারাদিন বসে থাকেন একজন মানুষের জামিন করিয়ে রিমান্ড থেকে উদ্ধারের জন্য তাঁর ঋণ কি শোধ করা সম্ভব! তাঁকে কিছু বলা যায় না শুধু ভালোবাসা যায়।

সবাই জানি রেহনুমা ম্যাম কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এরমধ্যেও আমার, মাইদুলের খবর নিয়েছেন। 'ম্যাডাম' সম্বোধন বাদ দিতে বলেছেন। এত সমস্যার মধ্যেও কি দৃঢ় আছেন তিনি। অনেক সাহস যুগিয়েছেন আমাকে আমাদের রেহনুমা আপা।
গতকাল মাইদুলকে কারাগারে দেখতে এবং সংহতি প্রকাশ করতে ঢাকা থেকে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী শিক্ষক রুশাদ ফরিদী স্যার। অনেক গল্প করলেন মাইদুলের সঙ্গে। তিনিও ঋণী করে গেলেন।

পুরো সংগ্রামে অনেক যোদ্ধা আমাদের সহযাত্রী হয়েছেন। মাইদুলের এক বড় ভাই ভীষণ সাহায্য করেছেন আমাকে নির্দেশনা দিয়ে, সাহস দিয়ে। মাত্র তো ক'জনের নাম বলা গেলো, এরকম আরো অনেক যোদ্ধা আছেন যারা ঝুঁকি নিয়ে আমাদের পাশে থেকেছেন, আন্দোলন করেছেন যাদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। একজন পুরোনো বন্ধু নির্বাক থেকেছেন তো তার বদল শত শত প্রতিবাদী মুখ স্বপ্রণোদিত হয়ে যোগ দিয়েছেন আমাদের সঙ্গে। বিপদ আমাদের একত্রিত করে একটি বৃহৎ পরিবার তৈরি করে দিয়েছে যার ভিত্তি শুধু ভালোবাসা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার শক্তি।

এ তো গেলো জামিনের গল্প। মামলা থেকে মাইদুল ইসলামের মুক্তি ঘটুক, শীঘ্রই শহিদুল আলমের কারামুক্তি হোক। সহযোদ্ধাদের ধন্যবাদ জানানো যায় না, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না, শুধু ভালোবাসা যায়। প্রত্যেকের জন্য অফুরান ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।


  • ৪৮৩ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

রোজীনা বেগম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স করেছেন।

ফেসবুকে আমরা