আঙ্গুর নাহার মন্টি

যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন

আমাদের জন্য আমরা হয়ে উঠার শপথ নেয়ার সময় এখন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি দুই সফল নারী সাংবাদিককে সম্মাননা দিয়েছে আজ। তাদের এই অভূতপূর্ব উদ্যোগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। ডিআরইউ’র সদস্য হিসেবে আমি গর্বিতও। ভাল লেগেছে এমন দু’জন সাংবাদিক এই সম্মাননা পেলেন যারা কাজ, মেধা, যোগ্যতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে ইতিমধ্যে সাংবাদিকতায় ও নেতৃত্বে মাইলফলক রচনা করেছেন।দুই সফল সাংবাদিকের একজন সিনিয়র সাংবাদিক Mahmuda Chowdhury আপা। আশির দশকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। রিপোর্টিং নারীরাও যে ভালো পারে ওই প্রতিকূল সময়ে তিনি কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয় টানা প্রায় তিন দশক ধরে এমন কোনো বিট নেই যেখানে তিনি কাজ করেন নি, এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি রিপোর্ট করেন নি। কূটনৈতিক বিটেও তিনিই দেশের প্রথম নারী রিপোর্টারও। সাংবাদিকতায় নেতৃত্বেও বেশ এগিয়ে ডিআরইউ’র স্থায়ী সদস্য ও সাবেক এই সহ-সভাপতি। আর একজন Farida Yasmin আপা তো ইতিমধ্যে ইতিহাস রচনা করেছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের ৬২ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে। ইত্তেফাকের মতো পত্রিকায় শিফট ইন চার্জের দায়িত্ব পালন করছেন বছরের পর বছর। আর তাদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দিয়েছেন আরেক ইতিহাস রচনাকারী, জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

সম্মাননা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গণমাধ্যমে নারীর কর্মপরিবেশ নিয়েও আলোচনা হয়। সেই আলোচনা শেষ হয় পুরুষের সহযোগিতার আহ্বানে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুধু গণমাধ্যমেই না; পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে্ও। আমি এমন দিনে পৃথক টয়লেট, টয়লেটে স্যানিটারি ন্যাপকিন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, হয়রানির প্রতিবাদসহ আমার অধিকারগুলো বিশেষ সুবিধার আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার কথা যেমন বলবো, তেমনি আত্ম-সমালোচনাও করবো। আমার অনুজদের জন্য কিছু করতে না পারার অনুশোচনায়ও দগ্ধ হওয়ার দিনও যে আজই।

আমরা মেয়েরা যারা এই পেশায় আছি তারা মাহমুদা আপা ও ফরিদা আপার তুলনায় একদিকে অনেক মসৃণ পথ পেয়েছি, অন্যদিকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও পাচ্ছি। গণমাধ্যমে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি হাতে গোনা হলেও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও মূলধারা সাংবাদিকতায় সেই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে! কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। আমি খুঁজি, খুঁজে বেড়াই গত কয়েক দশকে নারী সাংবাদিকদের জন্য এগিয়ে দেয়া নিঃস্বার্থ হাত! খুঁজি ঐক্যের ভিত।

অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই গণমাধ্যমে আমরা সংখ্যায় ধীর গতিতে হলে বেড়ে চলেছি। আমার অভিজ্ঞতার দুই দশকে আমি মাতৃসম মাহমুদা আপা আর বড় বোন ফরিদা আপার মতো অনুজদের প্রতি বাড়িয়ে থাকা হাত কয়টা বাড়তে দেখেছি? হাতে গোনা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া নারী সাংবাদিকরা অথবা আমার মতো মিড ক্যারিয়াররা নারী সহকর্মীর পাশে কতোটা বলিষ্ঠভাবে দাঁড়াতে পারছি? নিজের কথাই তো বলতে পারি না আমরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারী সাংবাদিকরা পদমর্যাদা ও বেতনে পুরুষ সহকর্মীর থেকে পিছিয়ে আছি। পুরুষের চেয়ে একাগ্রতা ও অফিসে সময় বেশি দেয়া সত্ত্বেও নারী সাংবাদিকের চাকরি পরিবর্তনে সমস্যা। আর চাকরি গেলে তো মহাসমস্যা। পুরুষ সাংবাদিকদের মতো সহজে নারী সাংবাদিকের চাকরি মিলতে দেখি কমই। অনেক মেধাবী নারী সাংবাদিক যেমন, মাহমুদা আপার কথাই বলি। তিতা সত্য হচ্ছে, তিনি গণমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছেন; অথচ তার সমসাময়িক পুরুষ সাংবাদিকরা একেকজন রিসোর্স পার্সনে পরিণত হয়েছেন। আমরা কি কখনো ভেবেছি, মাহমুদা আপার মতো সিনিয়র নারী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি! সিনিয়র নারী সাংবাদিকদের এমন বাস্তবতা আমাকে শংকিত করে, আমাকে ক্ষুব্ধ করে!

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পদে ফরিদা আপাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। এবারে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে সেই অনুপ্রেরণার ইতিবাচক প্রভাবও দেখেছি। ৭৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৬ জনই নারী। একদিকে বেশ আশা জাগানিয়া। আরেকদিকে হতাশাও আছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, নিজেদের প্রস্তুত করার কথা। সেটি নিউজরুমের দক্ষ কর্মীই হোক, আর সাংবাদিক নেতা হিসেবেই হোক। আমরা যে ফরিদা আপাকে দেখে অনুপ্রেরণা পাই, সাহস পাই, ভরসা পাই; আমরা আবার সেই ফরিদা আপাকে নির্বাচনে হারানোর ষড়যন্ত্রে থাকি, জয়ী হওয়ার পর তাকে নানাবিধ সংকটে ফেলে কাজ করতে বাধা দিই। আর এতে নারী সাংবাদিকদের ঐক্যের সম্ভাবনাগুলো ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে বীর দর্পে এগিয়ে চলে পুরুষতান্ত্রিকতা। এর মূলে একটাই কারণ। আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সেই পুরনো ফাঁদেই প্রতিনিয়ত পা ফেলে হাঁটছি। নারীর বিরুদ্ধে নারী গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছি। নারীর বিরুদ্ধে নারী অবস্থান নিচ্ছি। তবে সুবাতাসও বইছে। তাইতো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে আমাদেরই অনেক পুরুষ সহকর্মী নারী সাংবাদিকদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করছেন, সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনে পাশে থাকছেন। এই বাস্তবতা আমাকে আলো দেখায়, আশা দেয়; সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি দেয়।

আমি সাংবাদিক না নারী সাংবাদিক- নিজের কোনো কর্মক্ষেত্রেই এই ভাবনা আসে নি। কিন্তু সাংবাদিকতায় নারীর অবস্থান আমাকে উদ্বিগ্ন করে। গত কয়েক দশকে সাংবাদিকতায় নারীর অগ্রযাত্রায় মাইলফলক স্থাপনকারী মুন্নী সাহা দিদির মেধা, যোগ্যতা আর কঠোর পরিশ্রমে আজকের অবস্থান যেমন অনুপ্রেরণার। তেমনি বিস্ময়ে হতবাক হই, নারী সহকর্মীকে বস হিসেবে মানতে না পারার অক্ষমতা দেখে।

আবার অনেক নারী সহকর্মীর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে দিনরাত কাজ করেও চাকরি হারানো আমাকে অসহায় করে দেয়। হতাশ হই চতুর্থ স্তরের কর্মীকে নিজ সহকর্মীর যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায়। অবাক হই, অসংবেদনশীল আচরণের প্রতিবাদে সহকর্মীদের সোচ্চার হতে না দেখে। তবে এটা বেশ বুঝি, আমার জন্য আমি না হয়ে উঠতে পারলে যে আমাদের জন্য আমরা হতে পারবো না কখনো। তাই আমার প্রতিবাদই হবে আমার প্রতিরোধ। নিজের মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়টি একমুহুর্তেও জন্যও ভুলে যাওয়া যাবে না। অন্য নারী সহকর্মীকে নিজের মতোই সম্মান করতে হবে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। মানুষের আবরণে দানবের আচরণ লুকাতে অক্ষম সহকর্মীর মুখোশ উন্মোচণ করে দিতে হবে, যাতে অন্যরাও শিক্ষা পায়।

আমাদের সহকর্মীর পাশে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। নিজের অফিসের সহকর্মীর সহায়তা না পেলেও দমে যাওয়া যাবে না। সাহসী হতে হবে। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে হবে। যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেয়া যাবে না। নিজেকে গড়ে তুলতে হবে নিজেকেই। মনে রাখতে হবে, না জানাটা সমস্যা নয়, জেনে নেয়ার চেষ্টা না করাটা অনেক বড় সমস্যা। আবারও বলছি, সহকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির জন্য নারীর বিরুদ্ধে নারীকে ব্যবহার করার পুরনো অপকৌশলের চর্চা এখনও চলছে। তাই এ ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না কোনক্রমেই। বরং যখন নারী সহকর্মীরা একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে যাবে, তখন মুখ থুবড়ে পড়বে সব ষড়যন্ত্র ও বিভাজন থিওরি। আর তখনই নারী-পুরুষের সব ভেদাভেদ ছিন্ন করে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠা শুরু করবো আমরা।

বি. দ্র. মাহমুদা আপা ও ফরিদা আপা শুধু নারী সাংবাদিক নয়, সাংবাদিক সমাজের অভিভাবক। গত কয়েক দশকে পাশে থেকে, মানসিক সাপোর্ট দিয়ে তারা সাংবাদিকদের ভরসার অন্যতম আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছেন। এই দুই অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে অভিনন্দন। তাদের জন্য অনেক শুভকামনা ও ভালবাসা।

ফটো ক্রেডিট: Zannatul Bakiya Keka এবং Rinvy Sharmeen

735 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।