নির্যাতিত নারীদের জন্য আলোকবর্তিকা পারুল

মঙ্গলবার, মে ১২, ২০২০ ৭:২৪ PM | বিভাগ : সাম্প্রতিক


সম্প্রতি আমরা দেখেছি, একজন সাংবাদিক যিনি অন্যের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতন-প্রতারণাসহ সমাজের প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লিখে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করতেন। তিনি নিজেই এখন সংবাদের শিরোনাম।

সাজিদা ইসলাম পারুল, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রাক্তন নারী বিষয়ক সম্পাদক। তিনি নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হয়ে থানায় “যৌতুক, প্রতারণা ও ভ্রুণ হত্যার” মামলা করেছেন। অভিযুক্তের নাম – রেজাউল করিম প্লাবন।

পারুলকে আমরা যারা কিছুটা হলেও চিনি, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করি যে, “পারুলের সাথে চরমতম নির্যাতন না হলে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসতে পারতেন না।”

পারুল দেখতে যেমন সরল, মনেও তেমন। ও কারোর অমঙ্গল করাতো দূরে থাক সে কারোর অমঙ্গল কল্পনাও করতে পারে না। এমনি একজন মানুষ। অনেকেই তোমার মতো সরল ভালো মানুষদের এই যুগে ভালো চোখে দেখেন না ! তাদের মতে, এই যুগে পারুলের (পারুলদের) এমন সরলতা মানায় না, এমন ঠিক না, তেমন ঠিক না সহ নানারকম মুখরোচক সমালোচনা করেই চলেছেন। তাদের সমালোচনাও তোমাকে আরও সুন্দর ও ভালো মানুষ হওয়ার নানা রাস্তা দেখাবে। তাই, কোনো সমালোচনায় থেমে যেও না, ভয় পেয়ো না কিংবা মন খারাপ করো না। এইসব কিছুই – তোমাকে আরও ভালো হতে সাহায্য করবে।

পারুল যেহেতু নারী ও শিশু বিষয়ক রিপোর্টিং করেন, তাই নানা সময় নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে পারুলের কাছে এসেছেন। আর পারুল, তার সাংবাদিকতার বাইরেও সেই সব নারীর জন্য যতরকম সহযোগিতা করা যায়, নীরবে করেছেন ও পাশে থেকেছেন। সেইসব নির্যাতিত নারীদের আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভর হতে সহযোগিতাও করেছেন।

এখন তিনি নিজেই এইসব ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। দেশে থাকতে, প্রায়ই ওকে দেখতাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (DRU) কিংবা বিভিন্ন এসাইনমেন্টে। খুব একটা কথা হতো না। কিন্তু সবসময়ই ভীষণ মিষ্টি হাসির আদানপ্রদান হতো। একদিন ওকে আমি DRU বাগানে জিজ্ঞেস করেছিলাম। “মেয়ে বিয়ে করবা না?”- সেই মিষ্টি মেয়েটা বলেছিলো -“নাহ, আপু করবো না।” কারণটা এখানে আর নাইবা বর্ণনা করলাম।

পারুল খুব সুন্দর গান করে, মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুবাদে নাচে ও অভিনয়ে দারুণ দক্ষ। তার লেখার হাত খুবই চমৎকার। মনের মধ্যে কোনো ধরনের কুটিলতা নেই। সব মিলিয়ে আমরা সবাই ওকে খুব পছন্দ করি।

প্রবাসে আসার পর মেসেঞ্জারে মাঝে মধ্যে ওর সাথে কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে, যেবার ও DRU নির্বাচন করলো, তখন বেশ ঘন ঘন কথা হতো।

এইবার ওর সাথে ঘটে যাওয়া “প্রতারণা ও নির্যাতনের” ঘটনার পর যখন কথা হলো। আমি আরও মুগ্ধ হয়েছি। ওর সরলতা এখনও আছে, কিন্তু – ওর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়েছে। এই আত্মবিশ্বাসই ওকে – এমন বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে সহযোগিতা করবে।

সত্যি পারুল, তুমি আমাদের সকলের আলোকবর্তিকা। তুমি ঠিকই জানো, কখন কতটা শক্ত হতে হয় বা নরম হতে হয়। তোমার সাথে ঘটে যাওয়া সকল প্রকার নির্যাতন, নিপীড়ন, প্রতারণা’র বিচার হোক। তোমার এই ন্যায়বিচার প্রাপ্তিটা অন্য সকল নির্যাতিত নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

প্লাবন এই পর্যন্ত যতজন নারীর সাথে প্রতারণা করেছে, সেইসব নারীসহ অন্য সকল নির্যাতনের শিকার মানুষের আশীর্বাদ ও ভালোবাসা তোমার জন্য রয়েছে। তাই নিজের লক্ষ্যে অটল থেকো।

এই সময়ে তোমাকে অনেকভাবে টলানোর চেষ্টা চলবে বিভিন্ন মহল থেকে। তোমার মনোবল ও আত্মবিশ্বাস টলানোর তালিকায় পাবে, পরিবারের মানুষ, পেশার মানুষ সহ চেনা-অচেনা অনেককেই। কারণ, আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ- “আত্মবিশ্বাসী বা সাহসীদের” ভয় পায়। তাই তখন, যতো প্রকার আজেবাজে গালিগালাজ থেকে শুরু করে তোমার চরিত্র সহ নানা ধরণের বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে। কিন্তু, তুমি অটল থেকো। জেনে রেখো – তোমার চেয়ে সুন্দর, সাহসী ও ভালো মানুষ সমাজে এখন খুবই কম।

আমরা এখন “পাশে আছি”- বলে দূরে দাঁড়িয়ে নিপীড়িতের কষ্টে আত্মতৃপ্তি নেওয়া জাতি। আমরা এখন ঠিক কোন বিষয়ে বেশি লাইক পাবো, হাততালি পাবো, কিংবা বিখ্যাত হবো ভেবে “পাশে থাকা” মানুষ। তাই, পাশে আছি বললেও যেনো – যুদ্ধটা তোমাকেই করতে হবে।

এই দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতির মূল হাতিয়ার হচ্ছে – তোমার শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও তোমার সততা। তাই, নিজের সুস্থতার দিকে খেয়াল রেখো।

আসলে, নারী নির্যাতন এখন “নীরব ঘাতক”। এর বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সবার হয় না। তাই নীরবে এখনও সহ্য করে চলেছে। এই বিষয়ে অনেক রকম প্রচারণা চালানো হলেও – এখনও এর সরব উপস্থিতি টের পেলাম – তোমার এই ঘটনায়।

তাই, তুমি আমাদের এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা নাম। তুমি এখন থেকে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে একজন করে পারুলের কথা লিখে যাও। এই সমাজে তোমার সাহস, প্রজ্ঞা ও লেখনী খুবই প্রয়োজন।

অবাক হয়ে আশেপাশে অনেককে দেখবে যাঁরা পেশাদার সাংবাদিক ও সমাজের শীর্ষস্থানীয় মানুষ হয়েও, ভ্রূণ হত্যার মতো অপরাধ, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার ও প্রতারণা করার পরও বলেই যাচ্ছেন, “এই সম্পর্কটা ঘরোয়াভাবে মধ্যস্থতা করে মিটিয়ে ফেলা যেতো, এটা সারা দুনিয়ার মানুষকে জানানো ঠিক না, মামলা করা ঠিক না” ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, এই দলের উদ্দেশ্য  রেজাউল করিম প্লাবনকে বাঁচানো (যা অন্য অনেক প্রতারক-নির্যাতককে এই ধরণের কাজে উৎসাহ জুগাতো!)

তাই, বাংলাদেশের লাখো নির্যাতিত নারীর হয়ে কাজ করার সুযোগটাকে কাজে লাগাও। তোমাকে দেখে অন্য নির্যাতিত নারীরা মনে সাহস পাক, নিপীড়ন নীরবে সহ্য করে না মরে তাঁরাও উঠে দাঁড়াক! জীবনের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই! পারুল একটা সাহসের নাম !


  • ৩৭১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আলফা আরজু

সাংবাদিক

ফেসবুকে আমরা