স্বপ্ন নিহত হলে মানুষের কোনো আবিষ্কারের আকাঙক্ষা থাকে না

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১২, ২০১৭ ১০:০৫ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


মানুষ যে আজকের সভ্য মানুষ হয়ে উঠেছে, এর পেছনে ভূমিকা কেবলমাত্র এবং একমাত্র প্রযুক্তির। প্রযুক্তি মানে সেই আদিম পাথরের হাতিয়ার, তারপর ফলমূল আহরণ থেকে জুমচাষ, শিকার থেকে পশুপালন, পশুশ্রমের ব্যাবহার, ধাতু ব্যবহার করে আরও উন্নত শিকারের প্রযুক্তি। কৃষি থেকে তুলা, পোশাক তৈরি, কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র, গাছ গাছড়া থেকে ঔষধ, ইত্যাদি।

ধারনা করা হয় প্রায় দশ লক্ষ বছর আগে মানুষ আগুন আবিষ্কার করেছে। পোশাক আবিষ্কার করেছে পঞ্চাশ হাজার বছর হয়ে গেল। নৌকা আবিষ্কার করেছে, তাও প্রায় দশ বারো হাজার বছর আগে। কৃষিকাজ মোটামুটি হাজার দশেক বছর। ছয় হাজার বছর আগে লোহার ব্যবহার, সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে চাকা, চাকা দিয়ে জল সেচার আবিষ্কার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর। লোহা দিয়ে যন্ত্রপাতি আর অস্ত্র শস্ত্র আবিষ্কার প্রায় তিন হাজার বছর হয়ে গেল।

কাগজ, চশমা আর বারুদ আবিষ্কার করল চীনারা। আরবরা ঘড়ি। প্রিন্টিং প্রেস জার্মানরা আর মাইক্রোস্কোপ ডাচ রা। গ্যালিলিও আবিষ্কার করলেন থার্মমিটার ও টেলিস্কোপ। বাকিটা ইতিহাস, বিজ্ঞানের ইতিহাস বইতে পাবেন।

এই যে প্রযুক্তির বিকাশ হলো, যা না হলে আমরা প্লেটে ভাত পেতাম না, পরার জন্য কাপড় পেতাম না (হিজাবের কাপড় বা টুপিও না), বৃষ্টি ও রৌদ্রে ছাতা পেতাম না, ঘুমানোর জন্য ঘর আর বিছানা পেতাম না, বেড়ানোর জন্য জাহাজ বা প্লেন পেতাম না, এবং অসুখ হলে ঔষধ পেতাম না। এই যে সব জিনিসপত্র পাচ্ছি, কারণ প্রযুক্তি, বিজ্ঞানের অবদান।

এই প্রযুক্তি আসলো কোথা থেকে? আসলো মানুষের স্বপ্ন আর বিজ্ঞান চেতনা থেকে। বিজ্ঞান চেতনা মানে, সেই আদি সাম্যবাদী সমাজের নারী, যিনি অনেক শস্যদানা কে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, দেখতে রোগাপটকা শস্য দানাটির সাথে পুষ্ট দানাটির পার্থক্য করেছেন। পুষ্ট দানাটি মাটিতে পুঁতেছেন। যিনি কোন গাছের পাতায় কি রোগ সারে আবিষ্কার করেছেন, তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ করে করে, কোনো অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া।

মানুষের স্বপ্ন, ঘুমিয়ে দেখা না, জেগে দেখা, যাকে ইংরেজিতে বলে ভিশন, এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নানা পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ করাই বিজ্ঞানের কাজ। হোক সেটা রান্নাঘরে, জুমপাহাড়ে, চরাঞ্চলে কিংবা ল্যাবরেটরিতে। এবং এই সবগুলো ক্ষেত্রেই স্বপ্ন, চেতনা ও পদ্ধতি এক, নতুন কিছুর প্রত্যাশায় পরীক্ষা নিরীক্ষা।

বিজ্ঞান আজকে দুই ধরনের; গণবিজ্ঞান ও একাডেমিক বিজ্ঞান। দুঃখের ব্যাপার, বিজ্ঞানী বলতে আমরা কেবল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ল্যাবরেটরিতে পুরু লেন্সের চশমা নিয়ে গবেষণারত পণ্ডিতকেই বুঝি। রান্না ঘরে খাবার নিয়ে গবেষক নারীকে কিংবা বনৌষধি নিয়ে গবেষণারত আদিবাসীকে বুঝিনা।

বিজ্ঞান যা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, তারও শত্রু মিত্র আছে। প্রথম শত্রু অন্ধবিশ্বাস। অন্ধ বিশ্বাস মানুষের স্বপ্নকে হত্যা করে, পারলৌকিক "হেরেম ও ব্যুফে" ধারনার বিশ্বাস দিয়ে। কিছুই বদলানো যাবে না, পুঁজিবাদই শেষ কথা, এই হতাশা দিয়েও।

স্বপ্ন নিহত হলে, মানুষের কোনো আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা থাকে না। পরিবর্তনের জন্য সে নতুন কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে না। সে বিজ্ঞানের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। সে অযথা কূটতর্ক করে কিংবা নিষ্ফলা সমালোচনায় থাকে মুখর। সে বিপ্লবের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়।

কেবল স্বপ্ন ও বিজ্ঞান (সমাজবিজ্ঞান) চেতনাই আমাদের মানবিক অস্তিত্বকে আরও সভ্য ও মানবিক করতে পারে, কোনো গুরুবাদী অন্ধবিশ্বাস নয়। গ্রামে নগরে গণবিজ্ঞান আন্দোলন গড়ে উঠুক।

 


  • ৭৬৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খান আসাদ

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা