আফরিন শরীফ বিথী

,ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বাবলম্বী নারীর কাঁধে বহুমুখী দায়িত্বের দায়

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একই সাথে একদিকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার দায় চাপিয়ে, আরেকদিকে বাচ্চাকাচ্চা-রান্নাবান্না-সংসার সামলানোর দায়িত্ব ঘাড়ে চাপিয়ে নারীকে কি বোকাটাই না বানানো হচ্ছে! 

সে চাকরি/ব্যবসা করবে, বাচ্চা জন্ম দিবে (শুধু জন্ম দিয়েই তো খালাস পাওয়া যায় না, বাচ্চার বড় হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় লালন-পালন, অসুখ-বিসুখ সব তাকে দেখতে হবে), গৃহস্থালি কাজ করবে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির দেখাশোনা করবে, আরও কত কি! 

এসব সামলাতে গিয়ে অফিসে লেট হলে বা অফিস থেকে একটু আগে চলে গেলে পুরুষ কলিগদের থেকে তাকে শুনতে হবে "নারী বলে সুবিধা নিচ্ছে" ! 

সবসময় তো না, মাঝে মাঝে এই তথাকথিত সুবিধাটুকু পেতে গিয়েও নারীকে কত লাঞ্চনা-ভর্ৎসনার শিকার হতে হয় দেখি তো। আচ্ছা এখানে সুবিধাটা কোথায়? কেউ বলবেন আমাকে?

নারীকে শরীরের যত্ন নিয়ে পার্লার মেইনটেইন করে সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে সুন্দর হয়ে থাকতে হবে, বেডে ভালো পারফর্মেন্স দেখাতে হবে নাহলে তো পতির মনোযোগ-আদর-যত্ন-ভালোবাসা পাওয়া যাবে না, বন্ধুদের সামনে অসুন্দর বউকে উপস্থাপন করতে পতির লজ্জা লাগবে, পতির নজর চলে যাবে অন্য কোনো টলমলে শরীরের নারীর প্রতি। 

আর পুরুষের শরীর যেমনই হোক সে তো সোনার আংটি!

নারীকেই আবার ধর্মকর্ম করতে গিয়ে রোদে-গরমে দুনিয়া ছারখার হয়ে গেলেও চয়েস হিসেবেই হিজাব-বোরকা পরতে হবে। 

গবেষণাতেই পাওয়া গেছে একজন ওয়ার্কিং নারী পুরুষের চাইতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করে। আমার তো মনে হয় এজন্য গবেষণার দরকার হয় না, খালি চোখে একজন ওয়ার্কিং নারীর ২৪ ঘন্টার কর্মকান্ডের দিকে তাকালেই স্পষ্ট করে বোঝা যায়। 

যে নারী চাকরি/ব্যবসা করে বাহির সামলায়, আবার একই সাথে বাচ্চাকাচ্চা, সংসার,স্বামী, শ্বশুরবাড়িসহ ঘর সামলায় নাটক-সিনেমায়, সমাজের মুখ দিয়ে প্রশংসার বুলি আউড়ে, বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে মহিমান্বিত করা হয়, তাকে প্রকৃত নারীর স্বীকৃতি দিয়ে জয় জয়কারের আহ্লাদ দেখানো হয়।

নারীর শরীরে ১০টা হাত লাগিয়ে বইখাতা-কলম, ঝাড়ু, বাচ্চা, থালাবাটি, অফিস-আদালতের ডালপালা চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়ে নারীর কণ্ঠে "আমি নারী সব পারি " স্লোগান তুলে দিয়ে, দুনিয়া প্রকম্পিত করে কি বোকাটাই না নারীকে বানানো হয়!

সেদিনই এমন একটা ভারতীয় বিজ্ঞাপন দেখলাম। এসব দেখলে খুব হাসি পায় আমার। নারীর এই অতিরিক্ত ৮টা হাত আমি কেটে দিতে চাই। বিবর্তনের খাতিরে নারী যে দুইটা হাত নিয়ে জন্মেছে নিজের আরাম-আয়েশের দিকে খেয়াল রেখে সেই দুই হাতেই যতটুকু সম্ভব ততটুকুই নারী করবে।

আমার মনে হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই কৌশল নারীরা বুঝতে পারছে না। এই যে এই সব পারার দায়, তাকে কেনো নিতে হবে! সবই তাকে পারতে হবে কেন?

এই সব পারতে গিয়ে যে তার জীবনের বারোটা বেজে যাচ্ছে সেটা কি নারী বুঝতে পারছে না? 

হাউজওয়াইফ হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে বাচ্চার মা বন্ধুকে দেখে, নিজের চাকরি করা বোনদের দেখে, চাকরি করতে গিয়ে নিজ চোখে আমার বিবাহিত নারী কলিগদের জীবন-যাপন দেখে এবং একই সাথে তাদের চাকরি করা হাজবেন্ডদের সংসার সম্পর্কিত কর্মকান্ডের গল্প শুনে আমি এইসব এখন খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারি। 

২-৩ মাসের বাচ্চাকে বাসায় রেখে অফিসে এসে একজন নারী কেমন ছটফট করে, তার মন কোথায় পড়ে থাকে আমি টের পাই, তার উপর যদি আবার বাচ্চা অসুস্থ থাকে তাহলে কি অবস্থাটা হয় তার বোঝেন? সরকারি চাকরিতে না হয় ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি আছে কিন্তু লেবার শ্রেণির নারীরা, বিশেষ করে গার্মেন্টস কর্মী নারীরা, বেসরকারি চাকরি করা নারীরা, ব্যবসা করা নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি কয়দিন পায়?

আবার এই সমস্ত কিছু করার দায় দিয়ে সম্মান বা ব্যক্তি স্বাধীনতার যে মুলো ঝুলানো হয় সেই সম্মান/স্বাধীনতাই বা নারী কই পায়! এমন ভুরি ভুরি ইনকাম করা নারীর গল্প জানি যাদের বেতনের সম্পূর্ণ টাকাটা হাজবেন্ডের হাতে তুলে দিতে হয়। এমনকি নিজের ইনকামের টাকাও একজন বিবাহিত নারী তার বাবা-মা, ভাই-বোনের জন্য খরচ করার অধিকার পর্যন্ত রাখতে পারে না! এমন গল্পেরও অভাব নেই। 

একজন কলেজের লেকচারার নারীর এমন গল্প একদম কাছ থেকে দেখা, অনার্স-মাস্টার্স করে প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করা একজন সদ্য বিবাহিত নারীকে তার বেতনের সমস্ত টাকা শ্বশুরের হাতে তুলে দিতে হয় এবং তারপরও তাকে মাইরধরের শিকার হতে হয়! বিশ্বাস করেন এটা আমার একদম কাছে থেকে জানা গল্প। অবশেষে সেই নারীটি ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়।

নারী শিক্ষিত হওয়ার কারণে, চাকরি-বাকরি করার কারণে সমাজে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে বলেই নারীর প্রতি স্বাধীনচেতার অভিযোগ চাপিয়ে যে কটাক্ষ করা হয় তা দেখলে কি যে হাসি পায় আমার! 

এইসব আলাপ উঠে আসা উচিৎ এখন।

যে নারী গৃহস্থালির সমস্ত কর্মকান্ড, বাচ্চাকাচ্চাসহ সংসার সামলাবে সে কেনো আবার অর্থ উপার্জন করার জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করবে? 

নারী হয় অর্থ উপার্জনের পরিশ্রম করবে, নয়তো গৃহস্থালি সংক্রান্ত পরিশ্রম করবে। যেকোন একটা করবে সে। দুইটাই করার দরকার নেই তার। যে নারী চাকরি/ইনকাম করবে সংসার এবং বাচ্চা সামলানোর সব দায় যেন তার উপর না পড়ে সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। 

নারী বাচ্চাকাচ্চা-সংসার সামলায় বলেই পুরুষ নিশ্চিন্তে বাইরে ইনকামের জন্য যেতে পারে। একজন সংসার করা নারী, আর একজন ইনকাম করা পুরুষ গড়ে সমান পরিশ্রম করে। 

এই যুক্তিতে পুরুষের ইনকামের অর্ধেক আইনতই নারীর প্রাপ্য। কারণ নারীর গৃহস্থালি কর্মের কোনো অর্থনৈতিক ভ্যালু এই রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ব্যবস্থায় নেই, মানে নারী গৃহস্থালি কর্মের জন্য কোনো বেতন পায় না। নিজ ঘরে নারী যে কাজ করে সেই কাজ যদি সে অন্য কোথাও করতো তাহলে সে নিশ্চয়ই বেতন পেতো। 

একজন হাউজওয়াইফের পেশার পরিচয় দিতে গিয়ে সে "কিছু করে না" বলে যে পরিচয় দেয়া হয় সেটা বড্ড অন্যায্য এবং নারী হাউজওয়াইফ বলে তার কোনো সম্মান নেই, সে স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারবে না বলে যে ধারণা পোষণ করা হয় তা বড্ড অন্যায্য। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারীর সম্মান, স্বাধীনতা, সাফল্যের গল্পের পাশেই একজন হাউজওয়াইফ নারীর হীণমন্যতায় ভোগা মলিন মুখ বড্ড অন্যায্য। 

এই রকম বৈষম্যপূর্ণ একটা সমাজ ব্যবস্থায় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারী যে সম্মান, স্বাধীনতার স্বাদ ডিজার্ভ করে একজন ঘর সামলানো হাউজওয়াইফও সেইম সম্মান, স্বাধীনতার স্বাদ ডিজার্ভ করে বলে আমি মনে করি।

760 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।