আয়াম ওয়াকিং অন সানশাইন...ওহ হো...ও...

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ ১২:১৯ PM | বিভাগ : সীমানা পেরিয়ে


এপয়েন্টমেন্টের আধঘন্টা আগেই পৌঁছে গেছি। মেন্টাল ওয়ার্ডের ডে-রুমে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে আমাকে। এই হাসাপাতালে আগেও বহুবার দোভাষীর কাজ করতে এসেছি কিন্তু মানসিক রোগ বিভাগে আজই প্রথম।

বিশাল কামরার দুই কোণার দেয়ালে লাগানো বিশাল আকারের দু'টো টেলিভিশনের সামনে বসা রোগীরা কেউ চা খাচ্ছে, কেউ পত্রিকা পড়ছে, কেউ বা আপন মনে বিড়বিড় করছে। একপাশে রাখা ডাইনিং টেবিলে বসে লাঞ্চ খাচ্ছে অনেকে। এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওয়ার্ডেনরা নানানভাবে সাহায্য করছে, লক্ষ রাখছে রোগীদের দিকে।

আমি যে সোফাটায় বসেছি তার ঠিক পাশেই একটা সিঙ্গল কাউচে বসে পা দোলাচ্ছে খুশি খুশি চেহারার কালো একটা মেয়ে, বয়স তিরিশের মতো হবে। আমার দিকে তাকিয়ে সে একটুখানি মুচকি হাসলো, আমিও নার্ভাসভাবে হাসিটা ফিরিয়ে দিলাম।

মেয়েটার পরনে হালফ্যাশনের ফ্লোরাল প্রিন্টের সুন্দর একটা ড্রেস, চেহারা পুরু মেকাপে ঢাকা। গলায় বিশাল একটা সোনালি রঙের চেইন ঝুলছে, কানে বিশাল আকারের ম্যাচিং রিং। হাতে ম্যাচিং ব্রেসলেট। প্রায় প্রতিটা আংগুলে একটা করে আংটি। মেন্টাল ওয়ার্ডের হিসেবে তার এই বাড়াবাড়ি রকমের সাজগোজকে একটু বেমানান বলেই মনে হলো আমার কাছে। মাথা থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু করে পা পর্যন্ত পৌঁছে অবাক হয়ে গেলাম। চমৎকার এই জামাটার সাথে অতি ব্যবহারে জীর্ণ এবং ময়লা হয়ে যাওয়া সাধারণ একজোড়া স্লিপারস পরে আছে মেয়েটা। চেয়ারের পাশেই কার্পেটের উপর পরিহিত হবার আশায় উন্মুখ হয়ে আছে কমপক্ষে ছয় ইঞ্চি উঁচু লাল রঙের চকচকে একজোড়া হাইহিল জুতো।

মেয়েটার চোখ আমার চোখকে অনুসরণ করে লাল জুতো জোড়ার উপর গিয়ে পড়লো। সে আমার দিকে তাকিয়ে আবার মুচকি হাসলো। 
'ওয়েটিং ফর মাই ট্যাক্সি। নো ইউজ ওয়ারিং দেম ইন হিয়ার।'

একেই বলে মেঘ না চাইতেই জল, সে যেচেই আমার অজিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো। ট্যাক্সিতে করে কোথায় যাচ্ছে মেয়েটি? অপরিচিত একটা মেয়েকে এতো ব্যক্তিগত একটা প্রশ্ন করা ঠিক হবে না নিশ্চয়ই। ভাবলাম হয়তো সে যেচেই বলবে, কিন্তু বললো না।

হঠাত মেয়েটা শরীর দুলিয়ে গান গাইতে শুরু করলো, 'I'm walking on sunshine..oh...oh...I'm walking on sunshine.'

কী অসাধারণ মিষ্টি গলা! তার কন্ঠস্বর টিভির আওয়াজকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গেলো কিন্তু কেউ ফিরেও তাকালো না। তারা নিশ্চয়ই এই কন্ঠের সাথে এতোদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমি গানের কথাগুলো বুঝবার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না, ভেতরের লাইনগুলো গাওয়ার সময় মেয়েটার গলা নেমে যাচ্ছে বারবার, আবার ওপরে উঠে যাচ্ছে হঠাৎ- 'আয়াম ওয়াকিং অন সানশাইন! ওহ...হো...ও...'

আমার সাথে চোখাচোখি হতেই গান বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলো, 'আজই তোমার প্রথম দিন?' 
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম। 
'জায়গাটা খারাপ না। এখানে থাকতে তোমার ভালোই লাগবে।' 
'আরে না না আমি এখানে থাকতে আসি নি। আমি একজন দোভাষী।'

সাথে সাথে মেয়েটার চোখ দু'টো সরু হয়ে গেল। চিবুকটা একটু ভেতরে টেনে নিয়ে কপালটা সামনে ঠেলে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালো কয়েক মুহুর্ত, তারপর অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়লো সে।

কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে বললো, 
'দেয়ার'জ নাথিং টু বি এশেমড অফ ডিয়ার। ওয়ান ডে ইউ উইল বি গোয়িং হোম টু, জাস্ট লাইক আয়াম গোয়িং টুডে। আয়াম বেটার নাও সো আয়াম গোয়িং হোম। ওহ...হো...ও... আয়াম ওয়াকিং অন সানশাইন...' 

'আয়াম নট লাইয়িং। অনেস্টলি, আয়াম হিয়ার অনলি টু ডু আ জব।' 
সে এক হাত ঝাড়ি দিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বললো, 
'ও ইয়া ইয়া আই নো, আই নো। দে অল সে দ্যাট। আয়াম ওয়াকিং অন সানশাইন ওহ...হো....ও......'

এই অভিজ্ঞতা আমার আগেও হয়েছে। মানসিক হাসপাতালের রোগীরা সবাইকে মানসিক রোগী ভাবে। যাক গে, আমার এপয়েন্টমেন্টের সময় হয়েছে, আমাকে ডাকতে এসেছে একজন ওয়ার্ডেন। কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, অন্য একজন ওয়ার্ডেন সেই মেয়েটাকে বলছে- 'ইট'স টাইম ফর ইয়োর মেডিকেশন।'

দুই ঘন্টার এপয়েন্টমেন্ট শেষে ডে রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখলাম মেয়েটা তখনো কাউচটার ওপরে বসে আছে ঠিক একইভাবে। তার ট্যাক্সিটা কি আসেনি? ট্যাক্সিটা কি তবে আসবে না? বাইরের রৌদ্রালোকে কি সহসাই হাঁটা হবে মেয়েটার? নাকি সবই তার কল্পনা? রবি ঠাকুরের ফটিকের বাড়ি যাওয়ার কথা মনে পড়ে গিয়ে মনটা হু হু করে উঠলো।

বাইরে বেরিয়ে এলাম। শরতের ঝকঝকে রোদে চোখ ঝলসে গেলো। গাড়ির দিকে হেঁটে যেতে যেতে মেয়েটার গলা কানে বাজতে থাকলো, 'আয়াম ওয়াকিং অন সানশাইন...ওহ হো...ও...'

প্রার্থনা করতে ইচ্ছে হলো- পৃথিবীর সব রোদ মুছে যাক, আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামুক। মেন্টাল ওয়ার্ডে বন্দী ঐ মেয়েটাকে ফেলে কেউ যেনো আজ রৌদ্রালোকে হাঁটতে না পারে।


  • ৩১৫৪ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জেসমিন চৌধুরী

প্রবাসী, সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা