পৃ‌থিবীর নাম বদ‌লে এ গ্র‌হের নাম হওয়া উচিত শিশ্নাগ্রহ

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭ ৮:৪৮ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


নারী তু‌মি য‌থেচ্ছ ধর্ষ‌ণের শিকার হও। তোমার বক্ষ, নিম্নাঙ্গ ফালাফালা হোক তবু এর শা‌স্তি মৃত্যুদন্ড বা খোজাকরণ চাই‌বে না। লো‌কে তোমায় ছিঃ ছিঃ দে‌বে, তোমার মানবতা নি‌য়ে প্রশ্ন উঠ‌বে। য‌তো পা‌রো হজম ক‌রো, য‌তো পা‌রো স‌য়ে যাও, য‌তো পা‌রো আত‌ঙ্কে কাটাও তবু পুরু‌ষের শিশ্ন নি‌য়ে নে‌তিবাচক কিছু বল‌বে না। তু‌মি তো নারী, নারীরা মান‌বের কাতা‌রে প‌ড়ে না। মান‌বের পৃ‌থিবী‌তে পুরুষই এক‌চে‌টিয়া মানুষ হবার অধিকার রা‌খে। সমব্যাথী হি‌সে‌বে মু‌মিন ক‌মিন সব পুরু‌ষের একই সুর ' খোঁজা পুরুষ আইন বা কাজ চল‌বে না'।

 

নারীকে এও পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, ধর্ষণ অনিবার্য হলে তা উপভোগ করো। সম্ভবত কোনো এক দার্শনিক এ বোকা এবং ইতর পরামর্শটি দিয়েছিলো। বর্তমানেও অনেককে দেখি এ পরামর্শটি দিতে। প্রশ্ন, ধর্ষণ উপভোগ করে কেমন করে? অপরিচিত, অনাহুত শরীরকে নিজের শরীরের ভেতর উপভোগ্য করে নেয়ার মানসিক প্রস্তুতি সে মুহুর্তে কোথা থেকে কীভাবে পাবে? নাকি ছোটোবেলা থেকেই মেয়েদের এ মন্ত্রে দীক্ষিত হবার জন্যে তাগাদা দিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলতে হবে? ধর্ষণ উপভোগ করার কথা বলার পেছনে তাদের যুক্তি হলো, এতে শারীরিক ক্ষতি কম হয়।

ধর্ষণের যে সংজ্ঞা আছে এ দেশের আইনে তাতে ধর্ষণ প্রমান করা কঠিন হয়ে উঠে প্রায়শ। সেক্ষেত্রে যদি ধর্ষণকে উপভোগ্য করে তোলার পরামর্শ দেয়া হয় তাহলে সেটি ধর্ষণ বলে প্রমাণিত হবে নাকি মিউচুয়াল সেক্স বলে প্রমাণিত হয়ে আক্রমণের শিকার নারীর আবেদন খারিজ হবে? প্রকারান্তরে কি ধর্ষক নামক পুরুষটিরই সুবিধে হলো না? ধর্ষণ প্রমাণে আইন সহায়তাকারী সংশ্লিষ্ট সকলের জেরার মুখে আক্রমণের শিকার নারী বারবার মৌখিকভাবে ধর্ষণের শিকার হতে থাকে। অনেকে আবার এও বলেন যে, আর দশটা শারীরিক আক্রমণের মতোই ধর্ষণ একটি শারীরিক আক্রমণ। অতএব এটাকে অতো গুরুত্ব দেয়া উচিত নয়। আক্রমণের শিকার নারীকে ট্রমা থেকে উঠিয়ে আনবার জন্যে তাকে বোঝাতে হবে যে, একটা পুরুষ আরেকটা পুরুষকে ছুড়ি দিয়ে স্টেপ করলে যেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আক্রান্ত পুরুষ, তেমনই তোমার করা উচিত।

অবশ্যই ধর্ষণের শিকার নারীকে ট্রমা থেকে বাইরে রাখতে হবে তবে যুক্তিগুলো এমন হওয়া উচিত নয়। ধর্ষণ অন্য আর দশটা অপরাধ থেকে একেবারে আলাদা। সাধারণত সকল সময় ধর্ষক পুরুষ আর আক্রমণের শিকার নারী। সাধারণত একটি লিঙ্গ আরেকটি লিঙ্গকে হেনস্থা করার হীন মনোবৃত্তি এটা। নারীকে হেনস্থা করতে পুরুষ ছুরি বেছে নেয় না, বেছে নেয় তার শিশ্ন। সমাজ বলেছে, মহিমান্বিত শিশ্ন। সেই মহিমান্বিতের সামান্য অমঙ্গল বা অমর্যাদা হোক তা চাইবে কেনো পুরুষ আর পুরুষতন্ত্রের নারী-পুরুষেরা?

ধর্ষণকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। এখন খোজাকরণ চাইলেই সেটি আপত্তিকর ঠেকে অনেকের কাছে, মৃত্যদন্ড শাস্তিটিতেও মানবাধিকার চর্চাকারীরা বিরোধিতা করে। তখন নাকি চুরির বদলে হাত কাটার মতো নীতি অবলম্বন করা হয়ে যায়। চুরি অপরাধ আর ধর্ষণ অপরাধকে একই মাত্রার অপরাধ ভাবার পারিবেশিক অথবা মনুষ্যগত কী যুক্তি আছে? ধর্ষকশিশ্ন অক্ষত থাকলে ফের ধর্ষণে উদ্যত হবে না যে এর নিশ্চয়তা কী? এখন আমি যদি বলি ধর্ষণে ইসলাম ধর্ম যে ভূমিকা পালন করছে সুশীলগণ সেই একই ভূমিকা পালন করছে তাহলে? সাধারণত সম্পত্তির মালিকানা হয় পুরুষের তাই চুরি যাওয়া সম্পত্তি নারী পুরুষ যেই চুরি করুক চোরের হাত কর্তন শাস্তি। আবার সুশীলরা যখন দেখছে যে সম্পত্তি যদিও পুরুষের তবু হাত কাটা যাবে না কারণ চোরও সিংহভাগ পুরুষ। প্রতীয়মান যে পুরুষে পুরুষে এক ভীষণ ঐক্য খুব সযত্নে লালন করে। কিন্তু যখনি ধর্ষণ বিষয়টি আসলো ঠিক তখনি মুমিনদের মতোই সুশীলদের সুর কারণ সিংহভাগ প্রতিপক্ষ এখানে পুরুষনারী।

পুরুষের স্বার্থরক্ষা না করলে পুরুষতন্ত্র টিকিয়া রাখা মুশকিল, আবার পুরুষতন্ত্র না টিকলে বিনে পয়সায় নারীর শ্রম এবং সময় শোষণ করাও অসম্ভব। পলে পুরুষতন্ত্র টিকিয়া রাখা মুশ্গবাঙলাদেশের এখন যে ধর্ষণ প্রেক্ষাপট তাতে ধর্ষণ অপরাধে শাস্তি কঠোর হওয়া বাঞ্ছণীয়। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি কোনো সাধারণ বিচারও হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে ধর্ষণ অপরাধ। নারী প্রশ্নে পুরুষে পুরুষে ঐক্য যে চিরকালের তা ধর্ষণ বিচারে গ্রাম্য সালিশগুলো পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্রও পালন করছে পুরুষের ভূমিকা। এ অবস্থায় আক্রমণের শিকার নারীর নিজেকে বাঁচাতে যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়েও সুশীলদের তিরস্কারের শিকার হচ্ছে। নিজেকে বাঁচাতে নারী যখন পুরুষের লিঙ্গ ছেদন করছে তখন সুশীল পুরুষেরা হায় হায় করে উঠছে। তাদের বক্তব্য, মানবতা নাকি বিপন্ন হচ্ছে।

যে পুরুষ তার শিশ্ন চাপিয়ে দেয় অন্য মানুষের ওপর, যে পুরুষ ভাবে না যে ওটি দিয়ে তার মুত্রত্যাগের কাজও চলে, সব বেমালুম ভুলে গিয়ে অন্যর ওপর চেপে বসে সারাজীবনের জন্যে হেনস্থায় রাখার অভিপ্রায়ে তখন তাকে কতোটা মানুষ বিরেচনা করা যায় বা আদৌ মানুষ বিবেচনা করা যায় কি? নাকি মানবিক সুশীল মানুষদের এমনই ভাবনা যে, সাময়িক উত্তেজনার বশে না হয় ধর্ষণ করেই ফেলেছে তাই বলে কঠিন শাস্তি দেয়া উচিত নয়।

ধর্ষণের শিকার নারী আর তার পরিবার, স্বজনদের কাছে জানতে চেয়েছি কখনো কোন্ শাস্তিটিতে তারা স্বস্তি খুঁজে পাবে? মানবিক সুশীল মানুষেরা আক্রমণের শিকারদের অনুধাবন করতে পারেন?

নারী তার জীবন নিয়ে কী করবে বা করবে না তার দিস্তা দিস্তা নিয়ম লিখেছে পুরুষ, ধর্ষণের শিকার হতে চলা নারী কী করবে বা করবে না এরও বয়ান করে চলেছে এখন পুরুষ, যে বয়ান নাকি আবার পুরুষেরই অনুকুলে যাবে। বাহ! পুরুষ। জয়তু পুরুষতন্ত্র! পৃ‌থিবীর নাম বদ‌লে এ গ্র‌হের নাম হওয়া উচিত শিশ্নাগ্রহ।


  • ১৫১১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

তামান্না কদর

সমাজ কর্মী

ফেসবুকে আমরা