রাজনীতির সমীকরণ : লড়াই, যুদ্ধ আর সৃজনশীল রূপান্তর

শনিবার, জানুয়ারী ২৭, ২০১৮ ৪:২৮ PM | বিভাগ : দেশ/রাজনীতি


ইংরেজি Battle শব্দটির বাঙলা "লড়াই"। ইংরেজি "War" শব্দটির অর্থ যুদ্ধ। আর সৃজনশীল রূপান্তর হচ্ছে Creative Transformation. সৃজনশীল রূপান্তরের আরেক নাম "বিপ্লব"। বিপ্লব মানে আমূল রূপান্তর। আংশিক কোনো সংস্কার নয়, পুরো ব্যাবস্থাটাকেই বদলে দেয়া।

লড়াই নানা রকমের, অনেক ধরনের। লড়াই করতে করতে করতে, এক সময় যুদ্ধে জেতা যায়। লড়াইটা প্রতিদিনের, কোনো একটি যুদ্ধ জেতার জন্য। নারীর প্রতি বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন ও সহিংসতা থেকে মুক্তি সম্ভব পিতৃতন্ত্রকে পরাভূত করে, এটি একটি যুদ্ধ। নারীবাদীরা এই যুদ্ধটা করতে গিয়ে প্রতিদিন ছোট ছোট অনেক লড়াই করছে।

নারীমুক্তির মতো শ্রেণি শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্তির জন্যও প্রতিদিন লড়াই চলছে, শ্রমজীবী মানুষ করছে, একা বা সংগঠিত ভাবে, বর্তমানে হয়তো যুদ্ধের লক্ষ্য ছাড়াই লড়াইটা চলছে।

লড়াইগুলো অনেক ধরনের। লড়াই কেবল শত্রুদের সাথেই নয়। লড়াই নিজের সাথে, লড়াই মিত্র বা যারা সহযোগী হতে পারে তাঁদের সাথে, লড়াই কখনো লিখে, কখনো বলে, কখনো রাস্তায়।

নিজের বা নিজেদের সাথে লড়াইটা বেশ কঠিন। বামপন্থায় এটিকে বলে, আন্তঃপার্টি সংগ্রাম। রাজনৈতিক পথ ও সাংগঠনিক পথ নির্ধারন করা, শাসক শ্রেণির লিবারেল অংশের সাথে ঐক্য করা, আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ করা, -এই সব কিছুই লড়াইয়ের অংশ। অনেক সফল লড়াইয়ের পরেই যুদ্ধে জেতা যায়।

বাংলাদেশে প্রগতিশীল বাম আন্দোলন, কি সমতলে কি পাহাড়ে, লড়াই করছে, কিন্তু অনেকের সামনে কিসের জন্য লড়াই, সেই যুদ্ধের লক্ষ্যটা আছে কিনা জানি না। যুদ্ধের লক্ষ্য সামনে থাকলে, প্রধানত শত্রুমিত্র নির্ধারিত হয়ে যায়। মিত্রদের সাথে হয় ঐক্য। শত্রুদের বিরুদ্ধে সবাইকে সমাবেশিত করার লড়াইও দেখা যায়। কিন্তু সর্বত্র বিভক্তি (পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতি হত্যা) কি বার্তা দেয়? পাহাড়ে আদিবাসী স্বশাসনের যুদ্ধের লড়াইটা অনুপস্থিত। কিংবা সমতলে বামপন্থা কিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছে? কোন লড়াইটা, কোন যুদ্ধকে সামনে রেখে?

এক বামপন্থী নারীকর্মীর একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস পড়লাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংঘাতের পটভূমিতে ওর রাজনীতিরবিপক্ষে একজন নারীর প্রতি ওর রাজনীতির পক্ষের লোকদের দ্বারা পিতৃতান্ত্রিক আক্রমণের বিপক্ষে লিখেছে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি, ওর যুদ্ধের লক্ষ্য এবং ওর খণ্ড লড়াইএর লক্ষ্যকে যুক্ত করার বোধ ও সাহসী চরিত্র। শ্রেণি প্রশ্নে, যুদ্ধের লক্ষ্য ও দৈনন্দিন লড়াইয়ের মধ্যে এই সাযুজ্য বা যোগসূত্র আজ কোথাও দেখছি না।

মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ার পেছনে অনেক অনেক লড়াই ছিলো।সম্প্রতি দেখলাম ৬৯ এর গণআন্দোলনকে "তালা ভাঙ্গার" লড়াইয়ের যতার্থতা দেয়ার জন্য যুক্তি দেয়া হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে তালা ভাঙ্গার লড়াইয়ের চেয়ে, ওই সময়ের রাজনীতির লোকেরা যে একসঙ্গে বসে ১১ দফায় সহমত হয়েছে, এই ঐক্যের জন্য যে লড়াইটা করতে হয়েছে, সেটা মৌলিক গুরুতপুর্ন ছিলো, মুক্তিযুদ্ধে জেতার ক্ষেত্রে।

দুঃখের ব্যাপার, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা রাগী পুরুষেরা "বিপ্লবকে" বানিয়েছে কেবলমাত্র, "সশস্ত্র শ্রেণিযুদ্ধ"। বিপ্লবের মতো একটি সৃজনশীল রূপান্তরমূলক কাজকে সংকুচিত করতে করতে করতে, রূপ দিয়েছে "সশস্ত্র সংগ্রামে"। মধ্যবিত্ত পৌরুষবোধ কি এতে তৃপ্ত হয়?

বিপ্লব নিয়ে যে শ্রেণিযুদ্ধটা, সেটা অর্জনের "একমাত্র" পথ সশস্ত্র সংগ্রামের বদলে এখন মানুষ অন্য অনেক অহিংস অপশনের কথা জানে। একটি ধারনা হচ্ছে, গণআন্দোলন, গনসংগ্রাম করে, নির্বাচন করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কারের ছোট ছোট লড়াইয়ে জেতার মধ্য দিয়ে এগুনো। এই গণ আন্দোলনের রূপ হতে পারে অসাধারণ নান্দনিক, ফুলে ও সংগীতে, মোমের আলোয় ও ছবিচিত্রে। শাহবাগ যা আমাদের দেখিয়েছে।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ছোট ছোট লড়াইয়ে জেতার মধ্য দিয়ে, সৃজনশীল উপায়ে পুরনো সমাজকে বদলে দেয়ার চিন্তা, তাত্ত্বিক ভাবে হলেও এখন অনেকের ভাবনায় এসেছে (বর্ষীয়ান পণ্ডিতেরা এবং তাঁদের মুরিদেরা এটাকে সংশোধনবাদ বলে থাকেন)।বিপ্লবটাকেও জ্ঞানের ক্ষমতায়, বিবর্তনের পথে এগিয়ে নেয়ার, সচেতন ও সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা যায়।

বিপ্লবের লক্ষ্য কি কেবল "শ্রেণীযুদ্ধে" না কি "সামাজিক সৃজনশীল রূপান্তরের" ধারনায়ও? বিপ্লবের ধারনা, বিপ্লবের পথ অনুসন্ধান, বিপ্লবের জন্য ঐক্য, ইত্যাদি ছোট ছোট লড়াইয়ের রূপ মাত্র। এই ছোট ছোট লড়াই কি আছে একটি বৈষম্যহীন মানবিক সাম্যের সমাজ অর্জনের যুদ্ধ জেতার জন্য?


  • ২৫২০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

খান আসাদ

সমাজকর্মী

ফেসবুকে আমরা