পার্টিতে এসে দেখেছি, বুঝেছি নারীদের মুক্তি আসলে কোথাও নেই

সোমবার, মার্চ ১৯, ২০১৮ ৯:৪৭ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


'ধর্ষণ শুধু জোর করে রাস্তায় ধরেই হয় না। ধর্ষণ নানাভাবেই হতে পারে, হচ্ছেও। যারা প্রফেশনাল রেপিস্ট তাদের নিয়ে যতটা কথা হয় ঠিক ততটাই কথা হওয়া উচিত যারা উসলিয়ে, ফুসলিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে করে। প্রফেশনাল ধর্ষকদের চেয়ে এদের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়।

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, বছরের পর বছর যারা ধর্ষণ করে তাদের ব্যাপারে মুখ খোলাটা জরুরি। হোক পলিটিক্যাল নেতা, হোক বড় সমাজসেবক, হোক স্বামী- যেই হোক না কেনো!একজন গ্রামের মেয়েকে ঢাকায় এনে রাজনীতির নাম করিয়ে যারা সেক্স ডাল-ভাত মনে করে ব্যবহার করে তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। কারো না কারো সে দায়িত্ব নিতে হবে। আপনারা বড় নেতা, টকশো করেন, বক্তৃতাবাজি করেন, কমিউনিস্ট ভাব ফলান, সমাজতন্ত্রের ফতোয়া দেন আবার বিয়ে না করে বা করে মেয়েদেরকে ব্যবহার করেন। আপনার আর প্রফেশনাল রেপিস্টদের মধ্যে তফাৎ কি?

যারা নিত্যদিন পতিতালয়ে যায় তাদেরও অনেস্টি আছে কিন্তু আপনাদের নেই। আপনারা রাজনীতিক গুরু, আপনারা সমাজের চোখে ভদ্দরলোক, আপনারা মরলে রাষ্ট্রীয় শোক হয়, শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া হয় -কিন্তু বেঁচে থাকতে মুখোশের আড়ালে সব করেন। আপনাদের মুখোশ আমি উন্মোচন করবো বলে দায়িত্ব যেমন নেই নি তেমন নিয়েছিও। আপনাদের মুখোশ উন্মোচিত আমার মতো লাবণীরাই করবে। 

ছোট ছোট মেয়েগুলোকে আধুনিকতার নাম করে সেক্সুয়ালিটির নাম করে ব্যবহার করবেন? আবার নারীমুক্তি নিয়ে আওয়াজ দিবেন- হ্যাঁ আপনারাই পারেন। এই পারার শেষ তো আছে! এই মেয়েগুলোর বয়স হলে দূরে ছুড়ে মারবেন, তারা চিকিৎসার অভাবে মরবে। মেয়েগুলো সবসময় আপনাদের চাহিদা মিটাবে তা কি হয়?  হ্যাঁ, তারা কেনো রাজি হয়, দিনের পর দিন, রাতের পার রাত এ নিয়েও ব্যাখ্যা আছে। সব লিখবো, শুধু ফেসবুকেই নয়। এ নিয়ে মুখ খুলবো, আপনিও মুখটা খুলুন।

নারী তোমরা সাময়িক প্রশান্তি থেকে মুক্তি নাও, এদের মুখোশ উন্মোচন করো। নাহলে তোমাদেরকেও প্রতারক ভাববো, জনগণের সাথে প্রতারণা করাটা অন্যায়, সত্য উন্মোচিত হোক।'

এই স্ট্যাটাসটি দেওয়ার পর অনেকেই আমাকে উৎসাহিত করেছেন। আরো যাতে লিখি, কলম যেন থেমে না যায় বলে উদ্দীপনাও জুগিয়েছেন অনেকেই। নারী বন্ধুদের অনেকেই মেসেজ বক্সে বলেছেন- ‘আপনার কথা সত্য, আমি জানি। এদেরকে চিনিও। আপনি লিখে যান...’। তাদেরকে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছি এবং বলেছি আপনারাও বলেন, লিখেন। যাহোক, বাকিটা তাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।

বহু দিন যাবতই এ নিয়ে লেখার তীব্র ইচ্ছে। কিন্তু লিখবো লিখবো বলে আর লেখা হয়ে উঠে নি। তাছাড়া আমার লেখনীর হাতও তেমন ভালো না। রচনাশৈলী ভালো না। তারপরও লিখি। জাস্ট সত্য কথাগুলো তুলে ধরার যোগ্যতা রাখি। যে বিষয়গুলো সামান্য সামনে এনেছি তা সামান্য নয়। এ বিষয়গুলো যারা রাজনীতিতে অ্যাক্টিভ কর্মী, নেতা, সংগঠক তারা জানে না এমন কোনো কথা নয়। তবুও তারা বলবে না, কোনোদিনও বলবে না। আমি যদি বলি তাহলে আমাকে বলা হবে ‘পাগল’। অথবা বলা হবে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বলছি। কেননা, আমার ফেসভ্যালু নেই, সমাজের দৃষ্টিতে যাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়, যাদের লেখনীকে মূল্যায়ণ করা হয়- আমি সেরকম কেউ-ই নয়। আমি একটা লেখা লিখলে তাকে পজিটিভলি নেওয়ার চেয়ে নেগেটিভ নেওয়ার মানুষই বেশি। তবুও লিখছি। 

যে ঘটনাগুলো লিখবো যদি প্রমাণ চান, প্রমাণ দিতে পারবো। তবে এখনই অত ডিটেলসে যাবো না। আর একটু বড় হই। আর একটু! মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন: খাদ্য, বস্ত্র, অন্ন, বাসস্থান, চিকিৎসা, ঠিক তেমনি সেক্স। স্বাভাবিকভাবেই নারী-পুরুষ উভয়েই নির্দিষ্ট একটা বয়সে এই চাহিদাকে অনুভব করে থাকে। সমাজের নানান বাউন্ডারির কারণে নানাভাবে এই চাহিদাকে অবদমন করতে হয়। যাহোক, সে বিশাল আলোচনা। 

ছোটবেলা থেকেই বাম পরিবারের বেড়ে উঠা। বাবার সুবাদেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে এসে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। বয়সটা খুবই কম ছিলো। এখনও খুব বেশি হয়ে গেছে তা নয় কিন্তু! কিন্তু অনেক পার্টি, সংগঠনের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে, অনেক বড় বড় পণ্ডিত মানুষজনের সংস্পর্শে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। যেটা আমার ছোট্ট জীবনের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

আমি মূলত, পার্টির সাথে যুক্ত হয়েছিলাম ‘নারীমুক্তি’র কথা ভেবে। তখন এই ‘নারীমুক্তি’ ছাড়া আর কিছু বুঝি না। পার্টিতে এসে দেখেছি, বুঝেছি নারীদের মুক্তি আসলে কোথাও নেই, পৃথিবীর কোনো প্রান্তেই নেই। বহু সত্য কথা আজ লিখবো না, তবে কিছু লেখার চেষ্টা করবো। সেই চেষ্টা থেকে বলতে চাই পার্টিগুলোতে বড় বড় রেপিস্টদের বাস। শুধুমাত্র নিজের শারিরীক চাহিদা পূরণ করার জন্যই নারীদেরকে ব্যবহার করে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। এটা বাংলাদেশে এমন একটি পার্টি রয়েছে যে পার্টিতে সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান। যে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা বিয়ে না করে যতদিন শরীরের পাওয়ার থাকে ততদিন নারীদেরকে ব্যবহার করে। এক নারীতে তাদের তৃপ্তি নেই। তাদের ডজন ডজন নারী লাগে। 

আমার খুব পরিচিত একজন ছিলেন। মাত্র ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ঢাকায় আসেন। বাবা রাজনীতির করার সুবাদে ওই মেয়েটিও নানাভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাদের সাথেই ঢাকা এসে পার্টি অফিসে উঠেন। তার স্বপ্নভরা চোখ। গ্রামের সরল, সহজ মেয়ে ঢাকা এসে পড়াশুনা করবে, রাজনীতি করবে, শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করবে পল্টন, শাহবাগ, প্রেসক্লাব- ভাবতেই কেমন রোমাঞ্চকর লাগে! নেতাদের সাথে তার বেশ ভাব-খাতির জমে যায়। গল্পে গল্পে মশগুল। একের পর এক গল্প। হাজারো গল্পের তালে বুঝানো হয় ‘সেক্স’ যে ডাল-ভাত। এটা মানুষের চাহিদা। সুতরাং এই চাহিদা যেভাবেই পারুক পূরণ করলেই চলবে। যতদিন চাহিদা আছে ততদিন পূরণ করতে হবে।

নারী বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয়, কোনো পরাজয় থেকেও নয়- জাস্ট সত্যটাকে তুলে ধরুন। নাহলে, ইতিহাসে এদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এদেরকে পূজারী ভাবা হবে, এদের গণ্যমান্য ব্যক্তি বলা হবে। 

বিশ্বাস করুন আর না করুন, আমি যখন এদেরকে নারীনিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখি, টকশো করতে দেখি, সমাবেশ করতে দেখি- তখন দাঁতে দাঁত লাগিয়ে কিড়মিড় করতে থাকি। কতটা ভয়ংকর হলেই এটা সম্ভব! কতটা কালপ্রিট হলে এটা সম্ভব! আমি এদের হাত ধরে রাজনীতি করতে চাই না, এদের হাত ধরে মুক্তির স্বপ্ন দেখতে চাই না। এরা নারীনিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলুক তাও চাই না।

নারী-পুরুষ সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক হতেই পারে। কিন্তু সেই শারীরিক সম্পর্কের অবশ্যই কমিটমেন্ট থাকতে হবে। াাএকইসাথে একাধিক সম্পর্ক করাটা অন্যায়, গুরুতর অন্যায়। যে নারী বন্ধুদের সাথে এ কাজটি উনারা করে থাকে, সেই নারী বন্ধুরা কিন্তু এটা করতে পারে না। ক্ষেত্রবিশেষে কেউ কেউ হয়তো করে থাকে- কিন্তু তাদেরও ভয়-ভীতি থাকে। পদ-পদবী চলে যাওয়ার ভয়। এক দণ্ডও বাড়িয়ে বলছি না, কোনো আক্রোশ থেকেও বলছি না। জাস্ট, বলতে চাচ্ছি এদের অনেক ডেডিকেটেড কাজকর্ম এই নারীঘটিত কারণে আমার মতো পুচকো মেয়ের কাছে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। এটা আমার জন্যই কষ্টকর। আমি তাদেরকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি- তারা যদি নারীদেরকে সম্মানটা দেয় তবে তারাই পারবে পৃথিবীর বুকে নতুন সূর্য আনতে। হ্যাঁ, সম্ভব।

আপনাদেরকে কমরেড বলতে কষ্ট হয় তবুও বলছি ‘কমরেড’ এখনই সময় এইকাজগুলো থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখেন। আপনাকে বিয়ে করতে হবে সেটা বলছি না। আপনি কারো সাথে সম্পর্কই করতে পারেন, কিন্তু আপনার প্রয়োজনে বেছে বেছে সুন্দর, আর ছোট ছোট মেয়েদেরকেই কেনো পছন্দ? কেনো একটু বয়স বেড়ে গেলে তাকে দূরে ছুড়ে দেন তার চিকিৎসার ভার পর্যন্ত নেন না? ইতিহাস আপনাদেরকে ছাড়বে না। 

আমি যদি কোনোদিন কোনো পার্টির মেম্বার হই তবে সত্যকে ধারণ করেই হবো। যদি সবসময় জ্বী হুজুর, জ্বী হুজুর করতে হয় তবে আমার দ্বারা সম্ভব নয়- তাদের পূজারী হওয়া! নারীবন্ধুদের বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, এখনই সময় এদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন। নিজের শক্তিরবলে পার্টিতে থাকুন। মানুষের জীবনের হারাবার কিছু নেই- এই সত্যটাকে ধারণ করে এগিয়ে যান।


  • ৮০৫৯ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

লাবণী মণ্ডল

নারীবাদী লেখিকা।

ফেসবুকে আমরা