ওপেন রিলেশনশিপ : একঘেয়েমি কাটাতে গড়ে তোলা দায়িত্বহীন সম্পর্কের নাম!

শনিবার, মার্চ ১০, ২০১৮ ৫:৪৮ PM | বিভাগ : আলোচিত


চল্লিশোর্ধ পুরুষের জীবনে নানাবিধ জটিলতা থাকে কী ঘরে কী বাইরে। বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো আরো জটিল হয়। পরিবার প্রতিপালন দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখা নানান চাপে একজন পুরুষ নিঃশ্বাস ফেলবার জায়গা খোঁজে। এখানে বলে রাখা ভালো, এদেশী পুরুষেরা বরাবর কারো না কারো যত্নে থাকতে অভ্যস্ত। কখনো মা, বোন তো কখনো বান্ধবী বা স্ত্রী। চল্লিশোত্তীর্ণ পুরুষ, জীবনের শুরুতে যেমন যত্ন মনোযোগ পান এই সময়ে তার আকাঙ্খা আরো বাড়েই। কিন্তু মুশকিল হয় তখনি যখন সে তার সঙ্গীর পুরোমনোযোগ না পায়। মধ্যবয়সী পুরুষ তার দাম্পত্য সঙ্গীর প্রতিও এই সময়ে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেন, কারণ দাম্পত্যজীবনের একঘেয়েমী। বস্তুত এই একঘেয়েমী কাটাতে বা বৈচিত্রের লোভেই অধিকাংশ পুরুষ বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়ান। এধরনের সম্পর্কে নারীর সবটা মনোযোগ, আকর্ষণের কেন্দ্র হন পুরুষটি। মজার বিষয় হচ্ছে, যে কেয়ার বা খোঁজ কি যত্ন স্ত্রীর বেলায় অসহ্য খবরদারী বলে মনে হয় সেই একই বিষয় নতুন বান্ধবীর ক্ষেত্রে আদর বলে মনে হয়।

সর্বক্ষণ জান তুমি কই... আমার বাবুটা….

কি করে শুনে আইসক্রিমের মতো গলতে থাকে আর ঘরের বউয়ের জরুরি কল ধরারও সময় নাই। বেচারী হয়তো প্রেশারের ঔষধ খেতে বলতো, তো মধ্যবয়সী পুরুষের এহেন আহ্লাদী আচরণ এদেশে নতুন নয়, বছর পঞ্চাশেক আগেও এবয়সী পুরুষের কমবয়সী বউ আনবার চল ছিল। এখনকার সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্য ব্যবহারে এবয়সী পুরুষের প্রেম আমাদের সামনে এসে যাচ্ছে আরো সহজেই। আমার বান্ধবীরা জানেন তাদের ইনবক্স এহেন পুরুষ পুঙ্গবের কত কত প্রেম নিবেদনের ইতিহাস বহন করছে নীরবে। ফোন কত গদগদ প্রেমালাপের সাক্ষী।

চল্লিশ পরবর্তী পুরুষ নিজের জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে বৈচিত্রের সন্ধানে নামেন আর এদেশে এই বৈচিত্র মানেই নারী। হতে পারে বিবাহিতা কিংবা অবিবাহিতা। আবার বর্তমান যুগে নাগরিক জীবনে এই মধ্যবয়সী পুরুষ বহুক্ষেত্রে হন ডিভোর্সী, অবিবাহিত হওয়াও সম্ভব। তো এই বয়সটায় এসে আরো বহুরকম বোধের সঙ্গে একাকীত্ব বোধটাও যুক্ত হয়। আজকাল এদেশীয় পুরুষ গ্রাম বা শহর যেখানেই থাকুন তার ফেসবুক একাউন্ট আছেই আর যার নাই তার এলাকার ভাবী বউদি আছেই। তো যা বলছিলাম এই ফেইসবুকে এত রঙের এতো ঢঙের এত্তরকম ললনাগণকে দেখে বেচারা মধ্যবয়সী পুরুষ পুরাই বেসামাল হন। আর জুকার মামার বর স্বরুপ ইনবক্স নামক সোনারহরিণকে কবজা করতে ব্যাস্ত হন।

ডিভোর্সী বা সিঙ্গেল পুরুষদের এক্ষেত্রে একজন সঙ্গী লাভের আকাঙ্খা থাকে একে দোষ দেয়া যায় না, মানুষ মাত্রই সঙ্গী খোঁজে। কিন্তু মজা হলো ঘরে বউ রেখে ইনবক্সে আবির্ভূত কলিরকৃষ্ণদের কান্ড। ক্ষেত্রভেদে এরা সবাই ঘরে অসুখী, যৌনজীবন নিস্তেজ মানে এদের জীবনে আর লাইফ নাইই। আবার আরেক দল বড় চালাক, এরা নাকি পরিবার নিয়ে বড়ই সুখী। এদের প্রোফাইলে বউ বাচ্চার সঙ্গে আহ্লাদী ছবি দেখা যাবে কমেন্টে বউয়ের প্রতি গদগদ প্রেম ঝরছে কিন্তু ইনবক্সে এসেই সেই কাঁদুনী শুরু। বলে কিনা ঐটা তো লোকরে দেখাতে আসলে তুমিই আমার সুহাসিনী।

আমার সেইসব বন্ধুরা যারা তাদের ইনবক্সের গল্প আমার সঙ্গে শেয়ার করে প্রতিনিয়ত, আমরা জানি এদের আসল চেহারা তাই ফাঁদে পড়ার প্রশ্ন নাই। তবে স্ক্রিনশট ফাঁস করবার ভয় দেখিয়ে এদের কাঁবু করা যায় না। সামাজিকতা বা মানহানি কিংবা বউয়ের কাছে ছোট হবার ভয় এদের নাই। কারণ তারা জানেন, মামলা কেউ করবে না আর এদের আসল ইনবক্স মেসেজও বাইরে আসবে না। এরা তাই বলতে পারবে এসব ভুয়া, আরে ওই মেয়েটাই পিছনে লেগে আছে হা হা হা।

বাংলাদেশে মেয়েরা তো সস্তাই আর যারা ফেসবুক চালায়, রাতে এক্টিভ থাকে তারা নিশ্চয় পুরুষশিকারী। এই একবিংশ শতাব্দীর এই বাংলাদেশে যে দেশের সংসদ উপনেতা নারী, স্পীকার নারী প্রধান দুই বিরোধীদলের প্রধান নারী, এমনকি সরকার প্রধানও নারী সেই দেশে একজন সাধারণ কর্মজীবী নারীর সারাদিন অনলাইন থাকার মানে মেয়েটা ভালো না। আমরা অনলাইনে একটিভ মানেই ফেসবুকিং করছি। এসব বুড়ো খোকারা জানেন না যে মোবাইল হোক বা পিসি ডাটা অন করলে মেসেঞ্জার অন দেখাবে।

আমাকে একবার এক কবি বলেছিলেন, তাঁকে দাওয়াত করে খাওয়াতে। পুকুরের টাটকা মাছ, নারিকেলের নানান পদ তাঁর পছন্দ। সঙ্গে বলেছিলেন তাঁর ঘরে নারকেল পচে যায় তাঁর স্ত্রীর অবহেলায়। হাতে চুরি, কপালে টিপ পরে তারে বেড়ে খাওয়াবো। অথচ এই কবিরও প্রেমের বিয়ে, তাঁর স্ত্রীও বড় কম সুন্দরী নন। কিন্তু ওই যে একঘেয়েমী আর তা কাটাতেই বৈচিত্র খোঁজা। ঘরের বউ যেমন আছে থাকবে সঙ্গে বান্ধবীও চলবে। এখানে একটা জরুরি কথা হলো, এরকম সম্পর্ক খুব অল্প দিনই টিকে। একটু পুরনো হলেই মোহ কেটে যায় পুরুষটির।

আর এরকম সম্পর্কে জড়ানো পুরুষের বউটির জন্য পরামর্শ হলো নিজের দিকে তাকাও, জামাইরে পাত্তা কম দাও। তার নতুন সম্পর্কের বিষয়ে একদম চুপ, কোনো ঝগড়া না। বেশীরভাগ পুরুষই কেবলমাত্র রিলিফ চায় এরকম সম্পর্কে কোনো দায়িত্ব নিতে যায় না।

কাজেই এই সম্পর্ক গোপনীয়, যতোটা সম্ভব সে এনজয় করতেই চায়, চাপ নিতে নয়। কাজেই নতুন সম্পর্ক স্থায়ী করবার কথা সে ভাবে না। নিজের গোছানো গৃহকোণ ছেড়ে নতুন করে জীবন শুরু করবার চিন্তাও করে না। চিন্তা কি জামাইবাবাজীবন সুরসুর করে ফিরবে। চুপ থাকা এই বোঝাপড়ার বাহারি নামও দিচ্ছে আজকাল বুদ্ধিমান নারীপুরুষেরা ওপেন রিলেশনশিপ।


  • ৭৫৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

যূথিকা জাকারিয়া

লেখক ও সংষ্কৃতি কর্মী

ফেসবুকে আমরা