ব্যাধি ও প্রেম

বুধবার, এপ্রিল ১৮, ২০১৮ ২:১৩ PM | বিভাগ : সাহিত্য


একাগ্র, অবিরাম সন্দেহের প্রলাপ লিখে চলে ছেলেটি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে, বিভিন্ন আইডি থেকে : ‘তোমার শরীরে নিশ্চিত আছে তোমার প্রাক্তনদের চুক্তিপত্র।’ মেয়েটি সেই ঘৃণার প্রলাপ পড়তে থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, ‘ঠিকই। চুক্তিপত্রই বটে।

যখন অষ্টাদশী আমি, বছর পঁয়ত্রিশের বোধ করি এক কাশ্মিরী পন্ডিত ডাক্তার অতিকায় এক সুঁই নিয়ে এসে প্রথম আমার দুই বুকের মধ্যবর্তী সরু অংশের ত্বকে ফোটালেন...দক্ষিণ ভারতীয় সেবিকা দুই বুক ঢেকে দিয়েছে কাপড় দিয়ে। ডাক্তারের নিষ্কাম, পেশাগত হাত অষ্টাদশীর দুই বুকের ভেতর চেপে ধরছে সুঁই। টিস্যু সেল তুলে কর্কট রোগের সণাক্তকরণ হবে। ফুসফুস রোগের নিরাময়ে আগে রোগ সণাক্তকরণ বেশি দরকার।

অচেনা, অজানা মুম্বাইয়ের হাসপাতালের ভেতরে চারপাশে সার সার বেড। আমার বেডের চারপাশে পর্দা টাঙ্গানো। সেই প্রথম ভিড়ের মলেস্টেশনের বাইরে পুরুষের হাত- নারীদেহের নিভৃততম জায়াগগুলোর একটায়।’ মুম্বাই যাবার আগে ঢাকায় ফুসফুস থেকে জল তুলতে কয়েকবার পিঠে ফোটানো হয়েছে বড় বড়– সুঁই। ডাক্তাররা আমার ধৈর্য্যশক্তির প্রশংসা করেছে। বলেছে,‘একটুও কাঁদে নি। এতো’ পুরুষের চেয়েও শক্ত! বাচ্চা মেয়ে হলে কি হবে?’

অসুখে আঠারোর আমাকে পনেরো বছরের মত দেখায়। অরুচি আর কয়েক মাসের নিদ্রাহীনতায় শুকিয়ে কাঠ। আমি তো’ খানিকটা ছোট-খাটই বটে মাথায়। মুম্বাইয়ে কেউ কেউ আমাকে বারো বছরেরও ভেবে ফ্যালে। তাদের দোষ কি? কিমোথেরাপিতে মাথার চুল ঝরে, ভ্রু ঝরে বেশ একটি শিশুর অবয়ব লাভ করেছে আঠারোর তরুণীর চেহারা। মাঝে মাঝেই আমার বেড রেফার হয় পেড্রিয়াটিকস ওয়ার্ডে। সেখানে ছ’মাসের ব্রেইন ক্যান্সারের শিশু, এক বছর কি দুই বছরের অগণিত রক্ত ক্যান্সারের শিশু বা কোনো এগারো বছরের গুজরাটি বালিকার গর্ভাশয় ক্যান্সারের চিকিৎসা গ্রহণের যন্ত্রণাদীর্ণ আর্তনাদ শুনতে শুনতে আঠারো বছরের আমি ঈশ্বর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি- ফেলতে থাকি।

...পনেরো বছর ধরে যে ছেলে আমাকে লাগাতার সন্দেহই করে যেতে শিখেছে...সে ক্রুদ্ধ অভিশাপে আরো জানিয়েছে, ‘তোমার শরীর যেন কবিতার শরীর। তা’ কত কবি মিলে সেই কবিতা লিখেছে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি যত পাগলের প্রলাপ। সব পড়াও যায় না।

‘হ্যাঁ- প্রাক্তনদের চুক্তিপত্রই বটে। দ্বিতীয় প্রাক্তন ছিলেন কলকাতার এক বছর ষাটের সার্জন। এ্যানেস্থেশিয়া দেয়া অবধি আমার গায়ে একটি গাউন ছিলো। তারপর আমার দুই কোমরের কাছে সার্জারির সময় নিশ্চিত গাউন সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো। ব্যান্ডেজ খোলার সময়েও উনি নির্বিকার মুখে ব্যান্ডেজ খুলেছেন। আমার কিছুই করার ছিলো না। আমার আধখানা নগ্নতা সেই বুড়ো সার্জন দেখেছে। তুই কি তাকেও ছুরি হাতে তাড়া করবি?’

‘আরো আছে চুক্তিপত্র। শেষ সার্জারি হলো দিল্লিতে। এবার মূল সার্জন বুড়ো। কিন্ত হায়দ্রাবাদি সেই তার তরুণ সহকারী যে ড্রেসিং করাতে আসতো? আমি নিরুপায় ছিলাম। হ্যাঁ- আমার অনেকটা অনাবৃত দেহ সে-ও দেখেছে বা দেখতে হয়েছে।’

....তুই আর কি কি জানতে চাস?


  • ২৫৭ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

অদিতি ফাল্গুনী গায়েন

লেখক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা