মহামান্য সতীত্ববাদী সমাজ, আই হ্যাভ অ্যা কোয়েশ্চন - পর্ব ০২

রবিবার, মে ২৭, ২০১৮ ৩:৫৮ PM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


লেখাটির প্রথম অংশে লিখেছিলাম, বৈজ্ঞানিকভাব, সতীত্ব নির্ধারণে প্রচলিত সতীচ্ছদের রক্তক্ষরণ কখনোই মানদন্ড নয়। অনেক শিক্ষিত মানুষই বিষয়টি অবগত আছেন। যারা অবগত নন, যাদেরকে এখনও সতীত্বভুতে ভর করে আছে, তাদের দাম্পত্যজীবন প্রায়শই বিষিয়ে ওঠে। জীবন সঙ্গীনিকে সন্দেহ করা, অবিশ্বাস করা, দুঃশ্চরিত্র আখ্যায়িত করা, মারধোর করা, ডিভোর্স দেওয়া কিংবা কাছে রাখলেও ঘৃণার চোখে দেখা -এহেন এমন অবিচার নেই যা ঘটার নজির নেই আমাদের সমাজে। এটা গেলো স্বামী-স্ত্রীর ঘরের কথা। 'অসতী'--টাইটেলটা ঘর থেকে বেরিয়ে এলে আরও বিভৎস রূপ ধারণ করে। পরিবার, সমাজ কারোর কাছেই মুখ দেখানোর কোনো পথ খোলা থাকে না। কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে। বেঁচে থাকতে হলে বাকি পুরোটা জীবন বয়ে বেড়াতে  হয় সেই কলঙ্ক, শুনতে হয় বক্রোক্তি,  ব্যঙ্গোক্তি, নিন্দা। এমনই মাহাত্ম্য এই সতীত্বের!

মাহাত্ম্যের এখানে কেবল শুরু, শেষটা অনেক গভীরে। নারীকে অধিনস্ত করতে পুরুষতন্ত্র যত ষড়যন্ত্র করেছে এ পর্যন্ত, তন্মধ্যে প্রধান নারীর সতীত্বকেন্দ্রিক চরিত্র মূল্যায়ণ। সামাজে একটা নারীর সম্মান-অসম্মান খুব সূক্ষ্মভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে যোনীকেন্দ্রীক সেই সতীত্বের সাথে। কোনো নারীর যোনীতে যদি স্বামী ব্যতিত কারো অনুপ্রবেশ ঘটে, সেটাকেই সতীত্বহীনতা হিসেবে আখ্যায়িত করে সমাজের মানুষ। এই সতীত্বহীনতা মানে চরিত্রহীনতা যতটা বোঝায়, তারচেয়ে বেশি বোঝায় 'খুব মূল্যবান কোনো বৈশিষ্ট্য হারানোকে'। বাংলা সিনেমা অনুসারে বললে, এটা হলো 'নারীর ইজ্জত  হারানো' যা খুবই অসম্মানজনক এবং সেই নারীর 'নেই বলতে কিছুই নেই' এমন একটা মনোভাব। এই ইজ্জতের বাংলা অর্থই কিন্তু আবার 'সম্মান'। অনেকে এটাকে নারীর শরীরকেন্দ্রিক সম্মান বলে, তবে একে নারীর যোনীকেন্দ্রিক সম্মানের কনসেপ্ট বললেও ভুল হবে না।

যেহেতু যোনীতে অযাচিত কোনো লিঙ্গের প্রবেশ তথাকথিত সতীত্ব তথা নারীর চরিত্র নির্ধারণ করে, তাই এখানে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন আসে। প্রশ্নটা হলো, "মেয়েটি সেই সতীত্ব কিভাবে হারিয়েছে? স্বেচ্ছায়? নাকি ভিক্টিম হয়ে?

উত্তর যদি 'স্বেচ্ছায়' হয়, তবে আরো কয়েকটি প্রশ্ন আসে। সেচ্ছায় যারা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক করে, তার কয়টি ঘটনা আপনি জানতে পারেন? বছর ঘুরে রুবেল-হ্যাপি' বা রাজিব-প্রভা'র মতো কয়টি ঘটনা নিয়ে নাচানাচির সুযোগ হয় আপনার? আর গোপন থাকা এই যৌনসম্পর্কগুলো কি স্বতীচ্ছদের রক্তপাত থেকে আদৌ নির্ধারণ করা সম্ভব? সোজা উত্তর--না।

আসুন মুদ্রার অপর পিঠটা দেখে নিই। যদি উত্তরটা 'স্বেচ্ছায়' না হয়ে থাকে, তাকে সাধারণত ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর ধর্ষণ বলতে কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসম্ভোগকে বোঝায়। কোনো নারী যদি বলে 'না' -তাহলে সে পতিতা হলেও ধর্ষিত,  স্ত্রী হলেও ধর্ষণ। শিশু, কিশোরী, যুবতী, পরস্ত্রী এসব তো আছেই।

সম্প্রতি বাবার হাতে লোক নিয়োগে খুন হওয়া ধর্ষিত বিউটি'র কথা এখনো সবাই ভুলে যান নি আশা রাখছি। এই ঘটনাটিকে যদি উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করি, তবে খুব সহজেই সতীত্বের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করা যাবে।

বিউটি নামের মেয়েটিকে প্রভাবশালী এক যুবক একমাসের অধিক সময় আটকে রেখে ধর্ষণ করেছিলো। এরপর ছেড়ে দিয়েছে। এই একমাস বিউটির সাথে কি ঘটেছে সেটা সবাই জানেন, কিন্তু সমাজ তথা গ্রামে তার অনুপস্থিতিতে 'বিউটি চরিত্রহীন' -এমন একটি ইমেজ তৈরি হওয়া অসম্ভব না। মেয়েটি একমাস পর ফিরে গিয়েছিলো তার সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আপন মানুষদের কাছে, তার বাবা-মা'র কাছে। কিন্তু বিউটি তখন আর আগের বিউটি নেই। অনিচ্ছা আর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তার শরীরে অযাচিত এক পুরুষের প্রবেশ ঘটেছে একাধিকবার। এতে একবিন্দু দোষ নেই বিউটির, তবু লোকে আঁড়চোখে দেখেছে, কথা শুনিয়েছে, হেসেছে, তিরষ্কার করেছে, এই দীর্ঘসময় ধর্ষিত হওয়া মেয়েটিকে কোনো বীরপুরুষ বিয়ে করে ঘরে নিতে চাইবে না, এটাও খুব স্বাভাবিক ঘটনা। মেয়েটি মুখ লুকিয়ে থেকেছে হয়তো, লজ্জ্বায় ঘর থেকে বের হতে পারে নি, সাথে পরিবারের লোকজনও। তবে বিউটি খুব বড় একটা অন্যায় করেছিলো, পরিবারের সম্মান বাঁচাতে সে আত্মহত্যা করে নি। তাই টাকা দিয়ে ঘাতক নিয়োগ করে মেয়েকে হত্যা করে বিউটির বাবা নিজেই বিউটির ভুলটি ধরিয়ে দিয়েছে।

এবার দেখি ধর্ষকের হাত থেকে মুক্তি পেয়েও বিউটি কেনো বাঁচতে পারে নি? এতদিন পর মেয়েকে ফিরে পেয়েও বাবা-মা কেনো খুশি হতে পারে নি? সমাজের কোনো হৃদয়বান পুরুষ তাকে বিয়ে করে ঘরে তোলে নি কেনো? হয়তো বিউটিরও কোনো প্রেমিক ছিলো, সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, কেনো? বিউটির বাবা মেয়েকে হত্যা করলেন কেনো? -উত্তর একটাই। ফিরে আসা বিউটি আগের বিউটি ছিলো না। সে খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি জিনিস খুইয়েছিলো, যা রক্ষা করা নারী হিসেবে তার জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো। কিছু একটা ছিলো না বিউটির তখন। সেটি কি? কি সেই মূল্যবান জিনিস? সেটি হচ্ছে -"নিচ্ছিদ্র সতীচ্ছদ, যা দিয়ে রক্তঝরার কথা স্বামীর বিছানায়। সেটি অন্যকোথাও ঝরিয়ে খুব বড় অন্যায় করেছিলো বিউটি।

পাড়ার ছেলে-বুড়ো-বিজ্ঞরা সবাই তখন জানে বিউটি অসতী। যার বিয়ের বা সমাজের বাজারে আর কোনো মূল্য নাই। হ্যাঁ, এটিই সেই মহামান্য সতীত্ব। এটিই সেই সতীত্ববাদী সমাজের চিত্র এবং দর্শন। আর এটিই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর বন্দীদশার সেই শৃঙ্খল, যার নাম -'সতীত্ব হারানোর ভয়' এবং একবার কোনোভাবে তা খুইয়ে গেলে নারীকে সমাজচ্যুত করার মন্ত্র! সমাজচ্যুত এজন্যই করা, যে নারীর সতীত্ব হারানোর ভয় নাই, সে নারী জগতের কোনো শৃঙ্খল মানবে না। তাকে ঘরে বাইরে কোথাও অবদমিত করা যাবে না, দিতে হবে অধিকার, সেটি দিতে পুরুষতান্ত্রিক পুরুষদের বড় কার্পণ্য দেখা যায়।

সত্যিই যদি চিত্রটা পাল্টে যায়? বিউটিরা ঘুরে দাঁড়ায়? বিউটির পেছনে হাজারো সচেতন নারী দাঁড়িয়ে যায়? নিমিষে কি পুরুষতন্ত্রের পলেস্তারা খসে যাবে? কি হবে এই প্রভাবশালী পেশীবহুল পুরুষতন্ত্রের ভবিষ্যত,  শেষ অংশে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।


  • ৪৬২ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

নওরীন পল্লবী

নারীবাদী লেখক।

ফেসবুকে আমরা