নৈতিকতার দার্শনিক তত্ত্বের মূলনীতির আলোকে উকিল সাহেবের পতন বিশ্লেষণ

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ৩০, ২০১৮ ৬:০২ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


নীতি, নৈতিকতা আপেক্ষিক কনসেপ্ট, যা স্থান, কাল, পাত্র ভেদে ভিন্ন। সমাজের নীতি-নৈতিকতার বোধ, প্রথা, রীতি ইত্যাদি সাপেক্ষে রাষ্ট্রের আইন প্রণীত হয় কিন্তু সমাজে বসবাসরত মানুষের সমস্ত নীতি-নৈতিকতার বোধ ও ভাবনা রাষ্ট্রের আইন ধারণ করতে পারে না। সেজন্য নাগরিকের সব আচরণ রাষ্ট্রের আইন দিয়ে বিচার করা যায় না এবং তখনই সমাজের মধ্যকার নীতি-নৈতিকতার বোধ, প্রথা, রীতি ইত্যাদি সাপেক্ষে মানুষের আচরণ ও কর্মকাণ্ড বিচার করতে হয়।

বৈষ্ণব সাহিত্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলাকে মানদণ্ড ধরে বর্তমান সময়ের প্রেমকে যেমন বিচার করা যাবে না, তেমনি পাশ্চাত্যের প্রেমকে বা নারী-পুরুষের সম্পর্ককে মানদণ্ড ধরে বাংলাদেশের প্রেমের ঘটনা বিচার করা ভুল। তবে পশ্চাৎপদ বাংলাদেশের সমাজ উন্নত আধুনিক দেশের সংস্কৃতি দ্বারা আকৃষ্ট হতে থাকবে এবং সেদিকে ধাবিত হতে থাকবে ধীরে ধীরে।

অতি সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়াতে ভেসে বেড়ানো জৈনক বর্ষীয়ান উকিল, যিনি নিজেকে একজন প্রগতিশীল ও নারীবাদী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁর ও ২১ বছর বয়সী এক মেয়ের প্রেমের ঘটনা আলোচনার আগে দর্শন শাস্ত্রে নৈতিকতাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তা একটু অতি সংক্ষেপে আলোকপাত ক’রে নেই। আধুনিক যুগের সবচে যুক্তিগ্রাহ্য, প্রভাবশালী ও সমাদৃত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ‘নৈতিকতার দার্শনিক তত্ত্বের মূলনীতি’ বিষয়ে একটু ধারণা দেই:

কর্তব্য ও বাধ্যবাধকতার নীতিশাস্ত্রের আলোকে নৈতিকতাকে বিচার করার তিনটি ফরমুলা দিয়েছেন ইমানুয়েল কান্ট: কর্মের ফলাফল বিবেচনা ক’রে নৈতিকতা বিচার করা, কর্মের ফলাফল নির্বিশেষে শধুই কর্মের ধরণ বিবেচনা করে নৈতিকতা বিচার করা এবং কর্মের ফলাফল আন্দাজ করা যায় না, কর্মের ধরণ অস্পষ্ট- এ রকম অবস্থায় মানুষের নিজের সজ্ঞা বা বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা নৈতিকতা বিচার করা। এরপর কান্ট বলছেন: নৈতিকতা হল, আপনাকে এমনভাবে  চলতে হবে বা কাজ করতে হবে যাতে মানুষের সাথে আপনার আচরণটা এ রকম হয় যে, এ রকম আচরণই আপনি অন্যদের কাছ থেকে আশা করেন এবং এর চেয়েও আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনার নিজের লক্ষ্যে পৌঁছুতে অন্য মানুষটা যেন means হিসেবে ব্যবহৃত না হয়- বরং সে-ও যেন end (উদ্দেশ্য)-র অংশ হয় অর্থাৎ আপনার কাঙ্ক্ষিত বস্তুর ভাগীদার সেই মানুষটাও যেন হয়, যাঁর সাথে আপনার কর্ম সাধিত হচ্ছে বা যাঁর সাথে আপনার আচরণের কথা বিবেচিত হচ্ছে। কান্ট প্রদত্ত নৈতিকতার এ সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত কেউ চ্যালেঞ্জ করেন নি। সব দার্শনিকই কান্টের নৈতিকতার এ কনসেপ্ট গ্রহণ করেছেন।

তাঁর একাকীত্ব ঘোচানো বা স্ত্রীর সাথে অতিবাহিত খারাপ সময় কিছুটা মধুর করা বা তরুণীর প্রেমের স্বাদ গ্রহণ করা বা তাঁর শরীর উপভোগ করা- ইত্যাদি উদ্দেশ্য (অর্থাৎ মেয়েটির সাথে তিনি যা করেছেন তার end) সফল করার জন্য আলোচিত উকিল সাহেব মেয়েটিকে means হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কারণ এ সব উদ্দেশের ভাগীদার মেয়েটি হয় নি। উদাহরণ স্বরূপ, একজন তরুণ ও একজন তরুণী যখন খাঁটি প্রেমের সম্পর্কে জড়ান তখন বর্তমানের অনুভূতির প্রবলতা, সম্পর্ক উপভোগের মাত্রা ও ভবিষ্যত স্বপ্ন দু’জনের একই থাকে- কারও কোনো গুপ্ত উদ্দেশ্য থাকে না- এ অবস্থায় কেউ কারও গুপ্ত উদ্দেশ্য সফল করার জন্য অন্যকে means হিসেবে ব্যবহার করছে না, অতএব, এখানে প্রতারণার ব্যাপার ঘটে না, নৈতিকতার স্খলন হয় না। এ বিচারে, উকিল সাহেব মেয়েটিকে প্রতারণা করেছেন, অনৈতিক কাজ করেছেন। এই গেলো নৈতিকতার দার্শনিক তত্ত্বের মূলনীতির আলোকে উক্ত ঘটনার বিশ্লেষণ। এবার আসা যাক, সাধারণ আলোচনায়।

উকিল সাহেব বিবাহিত অর্থাৎ তিনি একজনের প্রতি কমিটেড। এ অবস্থায় তিনি অন্য কারও সাথে কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়াতে পারেন না। করলে সেটা অনৈতিকতা যাতে কোনো বিতর্ক থাকতে পারে না। তাঁর বর্তমান স্ত্রীর সাথে তাঁর যদি সময় ভাল না কাটে, সম্পর্ক যদি তিক্ত হয়, তিনি যদি একাকীত্বে ভোগেন এবং অন্য কোথাও যদি স্ত্রীর বিকল্প খুঁজতে যান, রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ান, প্রেম করেন বা প্রেমের অভিনয় করেন, সেই মেয়েকে যদি ভবিষ্যত ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখান (কথিত মেয়েটি প্রদত্ত স্ক্রীন শটে এ সবের প্রমাণ মিলেছে), তবে তা ঘোরতর পর্যায়ের অনৈতিকতা, অন্যায় ও অমানবিকতা। তিনি যদি বিকল্প খুঁজতে যান, তাঁকে বর্তমান স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক আগে শেষ করতে হবে। স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রেখে তিনি যতটুকু করতে পারেন তা হলো শুধু বন্ধুত্ব যাতে থাকতে পারবে না রোমান্টিকতা, রোমান্স, শারীরিক বা আবেগের আদান-প্রদান- ঠিক একজন পুরুষ বন্ধুর সাথে যে রকম বন্ধুত্ব হয়- সেই রকম।   একই অনৈতিকতার অভিযোগে মেয়েটিও অভিযুক্ত, কারণ যে পুরুষটি অন্য একজনের সাথে কমিটেড, তিনি তাঁর সাথে রোমান্টিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারেন না।   

উকিল সাহেব প্রতারণা করেছেন শধু ঐ মেয়েটির সাথেই নয়, করেছেন তাঁর স্ত্রীর সাথে আরও বেশী মাত্রায়। ভদ্রলোক অন্যায় করেছেন তাঁর নিজের মেয়ের কাছেও কারণ একটা মেয়ে যখন কল্পণা করে, তাঁর বাবা তাঁর মাকে বঞ্চিত ক’রে অন্য এক মেয়ের সাথে প্রেমে লিপ্ত হয়েছেন, তখন তাঁর বিষাদের পরিমাণ হয়ে দাঁড়ায় অপরিমেয়। আরও একটা ডাইমেনশন এখানে যোগ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো, কন্যা যখন জানতে পারে তাঁর পিতা তাঁরই বয়সী মেয়ের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত, তখন তাঁর মধ্যে বড় ধরণের সাইকোলজিকাল disorder দেখা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, এটা পাশ্চাত্যের কোনো দেশ নয়। এ রকম অপরাধ হুমায়ুন আহ্‌মেদ করেছেন আরও এক যুগ আগে অথচ অপরাধের এই ডাইমেনশনটি আজ পর্যন্ত কারও লেখায় আসে নি।  

প্রেমালাপের স্ক্রীনশট প্রকাশ ক’রে মেয়েটি কি অপরাধ করেছেন? এক কথায় উত্তর হলো, ‘না’। স্ক্রীনশট প্রকাশ না করলে হয়তো মেয়েটির মহত্বের জয়গান করা যেতো কিন্তু তাহলে, এত বড় একটা প্রতারণামুলক অপরাধের ঘটনা সমাজের কাছে অজানা থেকে যেতো এবং উকিলটির মুখোশ উন্মোচিত হতো না। আমি একজন সমাজবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে এ সব প্রকাশের পক্ষে কারণ এটা সমাজে অপরাধের কাউন্টার-ব্যালান্স হিসেবে কাজ করে। অপরাধ প্রতিরোধ করার একটা ভাল রেমেডি এটা। দ্বিতীয়তঃ ধরুন মেয়েটি যদি তাঁর প্রতি কৃত অপরাধের বিচার চেয়ে পারিবারিক আদালতে যেতেন, তাহলে কোর্ট তাঁর কাছে ঠিকই প্রমাণ চাইতো এবং মেয়েটিকে প্রমাণস্বরূপ স্ক্রীনশট জমা দিতে হতো এবং কোর্টকে তার রায়ের অবজারভেশনে স্ক্রীনশটের কথা উল্লেখ করতে হতো এবং যা মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ জেনেই যেতো। তৃতীয়তঃ  বুঝতে হবে, মেয়েটি সংক্ষুব্ধ এবং একজন সংক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়া আইনের চোখেও গ্রহণীয়। আরও বুঝতে হবে, মেয়েটি ভীষন কষ্ট পেয়েছেন, উকিল সাহেবের এ রকম অনৈতিকতায়; অন্যথায়, তিনি এটা হয়তো প্রকাশই করতেন না কারণ এটা প্রকাশিত হওয়ায় তিনি নিজেই বিড়ম্বিত। তিনি একজন বিবাহিত লোকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর জন্য নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন, লজ্জা প্রকাশ করেছেন কিন্তু উকিল সাহেব এখন পর্যন্ত কোনো দুঃখ প্রকাশ করেন নি, ক্ষমা চান নি। তিনি দুইটা কবিতার লাইন লিখে মানুষের আবেগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। যখন কেউ নিজের অপরাধের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেন না, তখন এ রকমই করে থাকেন সুচতুর লোকেরা। 

উক্ত ঘটনায় ‘নারীবাদী’ পুরুষদেরকে- এমনকি নারীদেরকেও যেভাবে ঐ ২১ বছরের মেয়েটিকেই দোষারোপ করতে দেখছি তাতে আমি খুব ব্যথিত এ জন্য যে, বাংলাদেশে নারীবাদী মানুষের সংখ্যা গত তিন দশকে অনেক বেড়েছে- আমার এ ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সব ক্ষেত্রে নারীকে দোষারোপ করার ধর্মীয় শিক্ষা ভারতীয় উপমহাদেশের নারী-পুরুষের রক্তে যে কী গভীরভাবে প্রোথিত, তা ভাবলে সত্যি মন খারাপ হয়ে যায়। 

 


  • ১৩৩১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

এন এন তরুণ

এন এন তরুণ পেশায় অর্থনীতিবিদ্‌। সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির ইকোনোমিক্সের প্রফেসার। পড়াশুনা করেছেন ইংল্যাণ্ডের ইউনিভার্সিটি অফ লীডজ, লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনোমিক্স ও বাথ ইউনিভার্সিটিতে। তিনি একাডেমিক বিষয় হিসেবে অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে লেখেন। অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যাণ্ড, রাশিয়া, ইংল্যাণ্ড, কানাডার বেশ কিছু ইউনিভার্সিটিতে ও কনাফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করেছেন, লেকচার দিয়েছেন ড. তরুণ— রয়্যাল ইকোনোমিক সোসাটি (ইংল্যাণ্ড), ডিভেলপমেন্ট স্টাডিজ এসোসিয়েশন (ইংল্যাণ্ড), বাথ রয়্যাল সায়েন্টিফিক এণ্ড লিটারেরী ইন্সটিইউট (ইংল্যাণ্ড), অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটি এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি, ২০১৮-এর জানুয়ারীতে ফিলাডেলফিয়াতে আমেরিকান ইকোনোমিক এসোসিয়েশন কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করেছেন তিনি।

ফেসবুকে আমরা