নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ নয়, শীলার স্বপ্নভঙ্গ!

বুধবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৮ ৯:৫১ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


একটা গল্প বলি আজ। তখন আমার কতই বা বয়স! ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাই। সাগর পাবলিশার্স থেকে বই কিনি, বেইলি রোডে নাটক করি, দেখি। মুন্নিদের গ্রিন রোডের বাসায় আড্ডা দেই। বয়সের তুলনায় একটু ইঁচড়ে পাকা ছিলাম। নিজের বয়সের ছেলেদের পাত্তাই দিতাম না। কিন্তু জ্ঞানী গুনি লোকদের প্রেমে পড়ে যেতাম হুট হাট করে। সেই লিস্টে অনেকেই ছিলেন, যেমন মমতাজ উদ্দিন স্যার, মঞ্জুরুল ইসলাম স্যার আরো অনেকে। সেই লিস্ট আজ নাই বা দিলাম। তবে হা মমতাজ উদ্দিন স্যারকে এতো ভাল লাগতো যে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে, জগন্নাথে যেয়ে তাঁর ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে থাকতাম তাঁর কথা শুনতে।

সেই সময় ছোড়দার এক বন্ধুর সাথে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেলো কবিতা বই সাহিত্য আলোচনা করতে করতে। কি দারুণ জানেন, বলেন। বলতে গেলে তার প্রেমে পড়ে গেলাম। বই পড়া কবিতা পড়া গুনি একজন লোক। বয়সও আমার চেয়ে বেশী, ভারি গলা, দারুণ কবিতা পড়েন। টেলিফোনে কথা হতো। কবিতা শুনাতেন “চার দিকে চারটি গাছ পুতলে আমাদের বাসর ঘর, তুমি বেহুলা আমি লক্ষিন্দর” হায় হায়! মে মরজাউঙ্গা অবস্থা!

কবিতা তো কবিতা, উনি ওই সময় ডিকসনারি পড়ে শুনালেও ভালো লাগতো। দেখা সাক্ষাৎ তেমন হতো না। কিন্তু মনে হলো কারো সাথে প্রেম ট্রেম করলে এই লোকই একদম পারফ্যাক্ট! এমন এক প্রজাপতি প্রজাপতি দিনে রিক্সার হুড ফেলে টিএসসি’র সামনে দিয়ে আমার বন্ধু বিজুর সাথে গল্প করতে করতে যাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়লো তাকে, ফুটপাতে উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমরা খুবই উতেজিত, ডাকবো কি ডাকবো না ভাবছি। রিক্সা ওয়ালাকে বলবো থামতে, কিন্তু তার পর যা দেখলাম তাতে আমরা দুজনেই ভাষাহারা, নির্বাক। উনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে সারা দিচ্ছেন। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ নয়, শীলার স্বপ্নভঙ্গ!

এই রবীন্দ্রনাথ পড়া, পূর্ণেন্দু পত্রী পড়া লোকটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অবলীলায় জনসম্মুখে… তাও আবার আমার প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। কবিতার নিকুচি করি। তার সাথে ওই আমার শেষ দেখা বা না দেখা। বহুবার বিভিন্ন জনের মাধ্যমে জানতে চেয়েছেন কেনো আমি তার সাথে যোগাযোগ রাখি নি। কেনো আমি তার কোনো কলের উত্তর দেইনি। কিন্তু কি করে বলি, একি বলার কথা! রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা একটি লোকের সাথে আমার কোনো সখ্যতা থাকতে পারে না। যারা আজ মেয়েদের প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া নিয়ে কথা বলছেন তাদের জন্য এই গল্প। যারা একটি বাথরুম ব্যবহার করার মতো এতটুকু ভব্যতা জানে না, তারা বলবে আমরা কোথায় কবে কখন সিগারেট খাবো?

 


  • ৫৬৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

শীলা মোস্তফা

নব্বই-এর সেই উত্তাল ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে যাত্রা শুরু। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাহসী এক অভিযাত্রিক। সাংগঠনিক চর্চায় এবং আবৃত্তি আন্দোলনের একটি উজ্জ্বলতর নাম। নব্বই-এর দশকে স্রোত আবৃত্তি সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন অর্ধযুগেরও বেশি সময়। সংগঠনকে সুগঠিক করএছেন এবং যুক্ত থেকেছেন সে সময়ের সব ক'টি সাংস্কৃতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে। কবিতা লেখার কলমটিও বেশ ধারালো।

ফেসবুকে আমরা