নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি না করে উন্নয়ন নিছক ফাঁকা বুলি

রবিবার, মার্চ ১৮, ২০১৮ ৯:৫৭ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"

নজরুলের এই কবিতায় এমন এক সত্য তুলে ধরেছেন যে, পৃথিবীর এই সভ্যতা বিনির্মাণের পিছনে পুরুষের যেমন অবদান আছে নারীরও ঠিক একই অবদান আছে। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই বলে?

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালিত হলো। নারী-পুরুষ সকলের জন্য এক বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় নিয়ে চলতি বছর জাতিসংঘ ঘোষিত নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো - "সময় এখন নারীর, উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম শহরের কর্মজীবন ধারা।"

নারী দিবসের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ঊনবিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের নারী শ্রমিকরা কারখানায় মানবেতর পরিবেশ, বেতন বৈষম্য এবং অনির্দিষ্ট শ্রম ঘণ্টার মতো অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের সুই কারখানার নারী শ্রমিকরা আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ করেন। কারণ ওই সময় ১২ ঘণ্টারও বেশি তাদের কারখানায় খাটতে হতো, কোনো বিশ্রামের অবকাশও ছিল না। তাদের ওপর পুলিশি নির্যাতন নেমে আসে। ১৯ শতকের যে-দিনটিতে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়েছিলো সেদিন যেসব দাবি নিয়ে মিছিল বা সমাবেশ হয়েছিলো সেসব দাবিগুলো কি ছিলো? 

খুব শক্ত কোনো দাবি ছিলো না। ছিলো রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিসহ যেসব ক্ষেত্রে নারীদের বিচরণ আছে সেসব জায়গায় নারীর অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নারীর অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে একে-অপরের সাহায্যের হাতটিকে শক্ত করে ধরে রাখা।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে নারীরা কতটা পাচ্ছে তাদের অধিকার? আজও নারীরা পথে-ঘাটে লাঞ্ছিত হচ্ছেন, ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। 

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বুধবার ছিলো রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভা। এজন্য রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে সোহরাওয়ার্দীগামী জনস্রোত ছিলো চোখে পড়ার মতো। ঐতিহাসিক দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পথ দখল করলে শুরু হয় শহরে যানজট, আবার কোথাও যানবাহন না থাকার দুর্ভোগে আটকে পড়া নগরবাসীও। এই ভিড়ের মধ্যেই রাজধানীর বাংলামোটর, শাহবাগসহ ছয়টি এলাকায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন কিছু নারী- এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। আর এর তিনদিন পর ১০ মার্চ একই স্থানে পুলিশের হাতে কয়েকজন আন্দোলনকারী নারী নিগৃহীত হন। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে তাঁরা রাস্তায় নামেন নি। তাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে। আরো অনেকের মতো তাঁরাও চাকরির বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছেন।

গত দুই সপ্তাহে পুলিশের বিরুদ্ধে অন্তত সাতজন নারী নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। আর এসব ঘটনার বেশিরভাগই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। সরাসরি মামলা করতে চাইলেও কেউ মামলা করতে পারছেন না।

একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ৩৭ জন নারী পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির অভিযোগও রয়েছে। দেশের ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০১৭ সালে এক হাজার ২৫১টি ধর্ষণ, ৪৪৪টি বাল্যবিবাহের ঘটনা এবং পাঁচ হাজার ২৩৫টি নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানায়।

আচ্ছা আমরা সকলে যে দিনকে-দিন নারীবাদী হয়ে উঠছি, আদতে কি আমরা নারীর অধিকার বা নারীবান্ধব বিষয়টা জানি?

নারীবান্ধবের সংজ্ঞা খুব সহজে বলা যায়, যখন যে পরিবেশে একজন নারী চলাফেরা বা মেলামেশার ক্ষেত্রে নিজেকে নারী বলে মনে করবে না, সমাজের একজন নাগরিক হিসেবে তার সুযোগ বা সুবিধাগুলো অন্যদের মতো সহজেই এবং বিনা নিগ্রহে পাবে, কোনো প্রকার লড়াই বা হেনস্থার শিকার না হয়েই যখন একজন নারী নিজের মত প্রকাশের মতো সুযোগ পাবে সেটিকেই আসলে বলা যায় নারীবান্ধব পরিবেশ।

আমাদের সমাজ, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, গণপরিবহণ, রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র এবং ধর্ম কি নারীবান্ধব? উত্তরটি নিজের কাছে পরিষ্কার না হলে আপনাদের জন্য আমি রেফারেন্স হিসেবে দেবো বাংলাদেশের সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া একটা মুভি, নাম " থার্ড পার্সন সিংগুলার নাম্বার " 

মুভির ইউটিউব লিংক - https://youtu.be/FM6UQy0t1Js

অভিনয়ে আছেন মোশারফ করিম, তীশা, আবুল হায়তসহ আরো অনেকে। আর যদি উত্তরটি পরিষ্কার হয়, কেনো আলাদা করে নারীর জন্য দিবস করা লাগবে সেই উত্তরটি পাওয়া যাবে কি?

পরিসংখ্যান বলে, যে হারে নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সে হারেই আবার তারা গৃহকোণে ফিরে যেতে শুরু করেছে কেবল একটি সহায়ক পরিবেশের অভাবে, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে। প্রতিদিনের ধর্ষণ ও নির্যাতনের চিত্র আমাদের কারোরই অজানা নয়। সকলের প্রত্যাশা নারীদের প্রতি বৈষম্য দূর হোক। কর্মস্থল, গণপরিবহণসহ সবক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হোক।

আর স্লোগান হোক-

‘তুমি নারী হয়েছ বলেই পুরুষ আমি ধন্য,

তোমার আমার সৃষ্টি হলো পরস্পরের জন্য।’


  • ১৫৫ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জাহাঙ্গীর আলম

বাহরাইন প্রবাসী। ম্যানেজার অফ বলোবার্ড ম্যান্স ওয়ার।

ফেসবুকে আমরা