অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭ পাচ্ছেন বেগম মুশতারী শফী

রবিবার, নভেম্বর ২৬, ২০১৭ ৩:২৫ PM | বিভাগ : পথিকৃত


যোগ্য মানুষ সম্মাননা পেলে ভালো লাগে। এবছর অনন্যা সাহিত্যপুরস্কার পাচ্ছেন, লেখক-সংগঠক-মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফী। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, সৃজনশীল সাহিত্য ও সাহিত্যসংগঠক হিসেবে বাংলাদেশের সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এই সম্মাননা পাচ্ছেন তিনি। আগামী ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের টিআইসি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।


বেগম মুশতারী শফী বর্তমানে চট্টগ্রাম উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি। একাধারে তিনি সাহিত্যিক, সম্পাদক, বেতার ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা, নারীনেত্রী, সমাজসংগঠক এবং সর্বোপরি সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। লিখেছেন উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর গল্পগ্রন্থ, স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক বই। সব মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা গোটা বিশেক। 

জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি, ভারতের মালদহ জেলায়। শৈশবে ৩ মাস বয়সে মাতৃ ও ৯ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ ঘটলে অনেকটা ছিন্নমূল জীবন শুরু হয়, ফলে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষালাভ করতে পারেন নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মুশতারী শফীর স্বামী ডাঃ মোহাম্মদ শফীর ও বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ছোটভাই এহসান শহীদ হন। পরিবারটি সবসময়ই চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’র সূত্রপাত হয়েছিলো তাঁর বাড়ি ‘মুশতারী লজ’ থেকেই।


পঞ্চাশ দশকের শেষভাগে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস স্থাপন করেন। ষাটের দশকের প্রথমভাগে নারীমুক্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে ‘বান্ধবী সংঘ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন। সংঘের মুখপত্র ‘মাসিক বান্ধবী’ ১৯৬৪ সাল থেকে এক নাগাড়ে নিয়মিত ১১ বছর সম্পাদনা করেন। এমনকি চালু করেন নারী পরিচালিত ছাপাখানা, ‘মেয়েদের প্রেস’, যা আজকের দিনের বিবেচনাতেও ছিলো একটি অত্যন্ত বৈপ্লবিক কাজ। কম্পোজ করা থেকে শুরু করে, মেশিন চালানো, বাঁধাই সব কাজই একসময় ‘বান্ধবী’রাই করতে লাগল। মেয়েদেরকে গান, গিটার, তবলা, সেলাই, এমনকি চামড়া কেটে ডাইস করে ব্যাগ তৈরি করাসহ নানারকমের কুটিরশিল্পের কাজ শেখানো হতো বান্ধবী সংগঠন থেকে। ‘বান্ধবী পুরস্কারও’ প্রবর্তন করা হয়েছিলো। পর পর তিন বছর সে-পুরস্কার দেয়া হয়। দর্শনীর বিনিময়ে নাটকের আয়োজনও প্রথম করেছিলো ‘বান্ধবী’। একাত্তরে বান্ধবী সংঘের পক্ষ থেকে বড় বড় তিনটা নারী সম্মেলন হয়। মুশতারী শফীর বাড়ির নিচের গ্যারাজের জায়গাতে ছাপাখানা বসানো হলো। ৬৮, ৬৯-এ রাজনৈতিক পোস্টার, লিফলেট এসব ছাপানোর কাজ করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনে তিনি নিজেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হলে ২৭শে মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করার লক্ষ্যে ট্রাকভর্তি গোলাবারুদ নিজগৃহে ‘মুশতারী লজ’-এ গোপনে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেন তিনি। এরপর যুদ্ধচলাকালে তাঁর বাড়ি, বান্ধবীর অফিসসহ সবকিছু লুট হয়ে যায়।

 
আগস্ট মাসে কলকাতায় গিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ শব্দসৈনিক ও নাট্যশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন উম্মে কুলসুম নামে। এছাড়াও আকাশবাণীতে ডালিয়া মোহাম্মদ ছদ্মনামে ‘জানেন ওদের মতলব কী?’ শিরোনামে স্বরচিত কথিকা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প প্রচার শুরু করেন। তখনই পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এরপর দেশ স্বাধীন হলে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে ‘নিজস্ব লেখক শিল্পী’-পদে চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ১৯৯৫ সালে চীফ স্ক্রিপ্ট রাইটার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এই সময়কালে বেতারে প্রচারিত নাটকের সংখ্যা মোট ১৭টি যার মধ্যে মৌলিক রচনা ৯টি। এছাড়াও বেতারে শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান, মহিলা বিষয়ক অনুষ্ঠান, কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান ও জনসংখ্যা কার্যক্রম অনুষ্ঠান বিভিন্ন মেয়াদে নিয়মিত পরিচালনা ও উপস্থাপনা এবং অগণিত বেতার নাটকে অংশগ্রহণ করেন। 


১৯৯২ সালে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’-চট্টগ্রাম জেলা শাখার আহবায়ক হন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলায় ঘাতক নির্মূল আন্দোলন বেগবান হয়। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কেন্দ্রের আহবায়ক পদ গ্রহণ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে জাহানারা ইমামের মৃত্যুতে ঝিমিয়ে পড়া আন্দোলন পুনরায় গতি লাভ করে। এসময় তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীর এই আন্দোলনে প্রবাসী বাঙালিদের সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করেন।


গল্প, উপন্যাস ও ছোটদের জন্যও লিখলেও নিজের লেখালেখির মূলক্ষেত্র হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে চিহ্নিত করেন বেগম মুশতারী শফী। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলকগ্রন্থ ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’। বইটির ইংরেজি অনুবাদও বের হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরেকটি গবেষণাধর্মী বই ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, এতে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের খ্যাত, অখ্যাত নারীদের বীরোচিত ভূমিকার কথা আলোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি কিছু ছোটগল্প লিখেছিলেন আকাশবাণী বেতারকেন্দ্রের জন্য। সেগুলোও একপর্যায়ে ‘দুটি নারী ও একটি মুক্তিযুদ্ধ’ নামে বই আকারে বের হয়। এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ ও ‘একুশের গল্প’ নামে আরো দুটো ছোটগল্পের সংকলন রয়েছে তাঁর। ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘চিঠি, জাহানারা ইমামকে’ শীর্ষক দীর্ঘ একটি গ্রন্থ। 
শ্রদ্ধেয় মুশতারী আপার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো। সেই সঙ্গে এই কৃতীনারীকে আমাদের সামনে নতুন করে উপস্থাপন করার জন্য পাক্ষিক অনন্যার প্রকাশক-সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের প্রতিও শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।


  • ১০৭৬ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

মোজাফফর হোসেন

লেখক ও গবেষক

ফেসবুকে আমরা