মৌলবাদী মন

রবিবার, জানুয়ারী ১৪, ২০১৮ ৬:১৫ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


মৌলবাদী দেখতে কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি। গত চার বছরে আমরা মৌলবাদীর বাহিরানার একটা মেক আপ গেট আপের আদল পেয়ে গেছি গণমাধ্যমের বরাতে। আমরা জেনেছি তারা মাদ্রাসা কিম্বা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হতে পারে, তারা টানাপোড়েনের সংসারের কিম্বা পয়সাওয়ালার ঘরের প্রজন্ম হতে পারে, সব সময় যে ইসলামী পোশাক পরবে তা নয়, টিপিক্যাল গড় তরুণদের পোশাকও পরতে পারে। তাদের দাড়ি থাকতেও পারে নাও পারে, তাদের মোচ-দাড়ি সব চেঁছে থুতনীতে একটু সুন্নত ঘাসের মতো বেড়ে উঠতে পারে। তার হাতে থাকতে পারে ইসরায়েলী উজি সাবমেশিনগান, মাংশকাটার ছুরি, পেটে বাঁধা আত্মঘাতী বোমা, কিম্বা পিঠের ব্যাগে গ্রেনেড। অর্থাৎ মৌলবাদীর চেহারা ছুরত যাই হোক আসল চেহারাটা তার মন ও মস্তিষ্কে। সেই যায়গাগুলোতে আমাদের গণমাধ্যম কদাচিৎ ঢুঁ মারে। সেই চেহারাটা সে আক্রমণ করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই না।

আপনারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে একজন মৌলবাদীর হাতে একটি ডিএসএলআর কিম্বা সনি এইচ এক্স এল আর ৩০০০ ক্যামকরডার ও অস্ত্র হিসেবে থাকতে পারে। এই অস্ত্রটা অনেক শোভন, গ্রহণযোগ্য, একে সহজে আমরা প্রশ্ন করি না। একে এ্যাট অল আমরা ভয় পা্ই না। তবে এটার হত্যা ও নির্যাতন করার ক্ষমতা শফি কিম্বা সাঈদীর মতো ধর্ম প্রচারকের চেয়ে কম নয়। সুতরাং এটা কখন আপনার মন ও মস্তিস্কের গভীরে কাজ করছে, এই টেররিষ্ট কখন আপনার মনুষ্যত্বকে মেরে ফেলছে, খেয়াল করুন। আপনাদের এথিকাল, মানবতাকে মরাল হিসেবে নেয়া, যুক্তিবাদী, ক্ষমাশীল, মানসিকতা দিয়ে এই মৌলবাদীকে চিনুন। এ আপনার সবচেয়ে কাছে ঘুরঘুর করছে।

মৌলবাদীদের অন্ততঃ কয়েকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে চিনে রাখা জরুরি।

এক. সে চতুর, অশিক্ষিত, দেশদ্রোহী কিম্বা নারীকে সরাসরি তমিজ শেখানো ব্যক্তি নাও হতে পারে। সে ট্রাডিশনাল পিতৃতান্ত্রিক নাও হতে পারে। তবে সে অবশ্যই দ্রুত বদলে যাওয়া সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক ডিজিটাল গণশিক্ষার মুক্তির পটভূমিতে মনের গভীরে ধর্মকে আঁকড়ে রাখা এক ফ্যাশনদুরস্ত তরুণ বা তরুণী। তাকে যে হিজাব পরতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। তাকে যে মৌলবাদী বলতেই অসংস্কৃত ভেবে নেন কেনো? সে একজন উদীয়মান কিম্বা প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে পারে। তবে তার অবশ্যই থাকবে উচ্চতর কোনোও অবস্থান অর্জনের স্বপ্ন। সুতরাং সে শ্রমজীবি বা খেটে ধান উৎপন্ন করা কৃষকের সন্তান হওয়ার চেয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে ভাঙ্গা পরিবারের কিম্বা চিরশান্তির ধর্ম মানা একটি আপাতঃ সুখী পরিবারের ও হতে পারে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এদের মনের ভেতর অন্যের প্রতি বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি সন্ত্রাস করার মানসিকতা কোথায় জন্ম নেয়? সবার চোখে নাইস ছেলেটি ও মৌলবাদী হয়ে ওঠে কোথায়? আপনি যদি আধুনিক তথাকথিত গণতন্ত্রে বাস করা মুসলিম নেতৃত্বের অন্তর্নিহিত চেহারাটা দেখতে চান তাহলে তাকে আপনার মানুষ ও মুসলিম হিসেবেই দেখতে হবে। কারণ গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় এবং ইসলামিক নেতৃত্ব তাদের যেভাবে ননমুসলিম ও অমানুষ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে তাতে তাদের ভেতর আত্মপরিচয়ের একটা প্যারালাইসিস সত্তাই তৈরি হতে থাকে। তাদের ভিতরের আগ্রাসী জানোয়ারকে টেনে বের করে না এনে দেখুন এ আপনার সমাজেরই এক মুসলিম ব্রাদারহুডের এক সদস্য। মুসলিম পরিচয় তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অথচ আপনি আমি কিম্বা আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাকে মানুষ ও মুসলিম হিসেবে মেনেই নিতে চান না। সে মুসলিম হয়েও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে পারে। পর্ণ নির্মাতা হতে পারে।

আপনাকে আমাকে বুঝতে হবে যে এই তরুণ ও তার প্রজন্ম অপরকিল্পিত দ্রুত গড়ে ওঠা আপনার আমার দেশের সাথে তার বা তাদের সমাজে বড়ো হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছুটছে। তাল সামলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তার বিশ্বাস নেই সে মঙ্গলের দিকে ধাবমান দ্রুতগতির এ বিশ্বের মানুষের সব বিষয়ে মানবাধিকার, নারীর পাবলিক ও প্রাইভেট সব স্থানে সমানাধিকার, শিশুর স্বাধীনতা, ব্যক্তির ধর্ম মানা বা না মানার অধিকার এসব আধুনিক জীবন-ধারণার সাথে সে কিছুতেই সম্মিলিত হতে পারছে না। কেননা তার চেতনার প্রবাহের স্তর ওই স্তরে নেই। বর্তমান বিশ্বে শাসক ও শাসিতের পরিচয় যেভাবে পাল্টে দিচ্ছে বাজার সংস্কৃতি, সে তালে তাল মেলাতে সে হয়তো একটি কামকরডার হাতে তুলে নিতে পারছে, কিন্তু ততো দ্রুত নারী সমাজের সর্বস্তরে সমান হওয়ার ধারণাটিকে গ্রহণ করতে ব্যার্থ হচ্ছে।

আজকের বাংলাদেশে পনেরো বছর ও তার নিম্নের জনসংখ্যা শতকরা তিরিশ ভাগের কম হবে না। বাংলাদেশ তার এই জনসংখ্যাকে বৈশ্বিক চিন্তার দৌড়ে কোন স্তরে চায় রাখতে তা প্রকাশ পাচ্ছে এর শিক্ষা করিকুলাম পরিবর্তনে, মৌলবাদের সাথে সরকারের রাজনৈতিক সমঝোতায়। অপরদিকে তিক্ত সত্য হলো, মুক্ত গণমাধ্যমের বরাতে এরা তাদের সমাজের চেয়ে ভিন্নতর সংস্কৃতির প্রবল প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সে প্রভাবের কোনটি সামজিকগণের জীবনকে আরো মুক্ত ও সৃষ্টিশীল করবে কোনটি তাকে বন্দি করবে এটি বিচার করার অবস্থানে সে বা তার বন্ধুরা নেই। তাদের সামনে বিচার করার মতো মাত্র একটি মাপকাঠি রয়েছে; প্রচলিত ধর্ম  ও তজ্জাত পিতৃতন্ত্র; যাতে অলরেডি কিভাবে সমাজে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দাবিয়ে রেখে মুস্টিমেয় কিছু মানুষ এগিয়ে যেতে পারে তার একটি রূপরেখা প্রণীত রয়েছে। এই রূপরেখা দিয়ে যদি একটি তরুণ বা তরুণী আধুনিক জীবনকে, নারীকে ও পুরুষকে ব্যাখ্যা করতে যায়, সে অবশ্যই তাল রাখতে পারবে না।

এই  তাল মিলাতে না পারাটা আমাদের তরুণদের মধ্যে প্রতিনিয়িত আমরা দেখছি। শত শতাব্দী বৈশ্বিক জ্ঞান ও যুক্তি  পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে এক দুই প্রজন্মে তা রপ্ত করা কঠিন। তার ওপর সে যুক্তি ও জ্ঞান মুক্তভাবে রপ্ত করার কোনো পথ না সমাজ রেখেছে, না রাষ্ট্র তাতে সম্মত। শুধু ধর্মগ্রন্থ জানা যেমন একটি তরুনকে সুখী করতে পারে না্ তেমনি একটি তরুণীকেও তা সর্বজ্ঞান আহরণের সুখ দেয় না। সতীত্ব ইত্যাদি ধর্মীয় ভাবনা দিয়ে ঘেরা নারীর জীবন এত রাস্ট্র, সমাজ ও দুনিয়া বিচ্ছিন্ন যে-নারী বস্তুতঃ এক এলিয়েন। সমাজ এবং বহির্জগতও নারীর কাছে ভিন্ন গ্রহ। এই দুই জগত মিলতে চেষ্টা করলেই ইসলামে ফিতনার উদয় হচ্ছে বলে চিৎকার চেঁচামেচি উঠছে। মানে বিশৃঙ্ক্ষলা বা ক্যায়স তৈরি হচ্ছে দাবী তোলা হচ্ছে। বালকেরাও শেখে এই ক্যায়সকে ঠেকাতে হবে। তাহলে তার নিজের স্বাধীনতা বহাল থাকবে।

এইরকম ক্যায়স ঠেকানোর নানা চেষ্টা আমরা দেখে থাকি। যেমন গত দু’দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে পাবলিক প্রাইভেট জীবনের কোথায় নারী কতটুকু অংশগ্রহণ করতে পারবে সে বিষয়ক একটি ভিডিও নিয়ে ফেসবুকে তর্ক-বিতর্ক, গালি গালাজ চলছে। পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিতর্ক আমরা ফেলে এসেছিলাম আশির দশকেই।  কারণ যেদিন এই দেশের নারীসমাজ যুদ্ধের কালে সংসারের সব ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলো,  তরুণ-তরুণীরা জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাতে তুলে নিয়েছিলো অস্ত্র এবং মননে দেশের জন্য মরণপণ প্রতিজ্ঞা; যখন পুরুষেরা বেশিরভাগই চলে গেছে প্রাণ বাঁচাতে আর মায়েরা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে অপোগণ্ড শিশু ও বৃদ্ধদের, সেদিনই নির্ধারিত হয়ে গেছে যে এদেশে নারী ঘরে থাকবে না, সমাজে ও রাস্ট্রের প্রতিটি গণক্ষেত্রে তার আনাগোনা থাকবে, অংশগ্রহণ থাকবে। সেদিন থেকে নারী পাবলিক প্লেসে কি করবে ও প্রাইভেট স্পেসে কি করবে এটি তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধীন বিষয়। এ বিষয়ক বিতর্ক আজ নিরর্থক। আজকের বাংলাদেশ কল কারখানা থেকে শুরু করে সব কিছুতে নারীর শ্রমকে গ্রহণ করেই এগিয়ে চলেছে। তারপরও নারী পাবলিক প্লেসে কি করবে আর করবে না সে বিতর্ক নতুন করে তোলার বিষয় যখন আসে তখন বুঝতে হবে, আমার পিছিয়ে শূণ্যতে চলে যাওযার চেষ্টা করছি, এবং মৌলবাদের এজেন্টদের কেউ কেউ বিতর্কে  বিজয়ের অন্যতম উপাদান নারীকে নিরস্ত করতে মাঠে নেমেছ।

আশির দশকে ও সিগারেট মেয়েরা খাবে কি খাবে না, ব্রা পরবে কি পরবে না এ নিয়ে বেশ তোলপাড় হয়েছিলো। আমরা এমন কি ঠিকমতো চুল বাঁধতাম না। আবার শাড়ি পরলে টিপ ছাড়তাম না। সোনার গয়না পরতাম না। ফুল দিয়ে বিয়ে করতাম। আমরা এখনও সোনার গয়না পরি না। কিন্তু কেউ কেউ মাটির সূতোর গয়না পরতে ছাড়ি না। বছর পাঁচেক আগে তো শার্টের ওপরই গয়না পরেছে মেয়েরা। চার বছরে একটা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাবার চেষ্টা হয়েছে।

মৌলবাদের হাতে অর্থ থাকায় ক্যামকরডারধারী মৌলবাদীও আমরা এখন দেখতে পাই, যে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে পাবলিক এবং প্রাইভেট স্থানে নারী কি করতে পারবে বা পারবে না সেই পুরনো মীমাংসিত বিতর্ক পুণরায় আলোতে আনার চেষ্টা করছে, এবং এখন তো দেখছি রীতিমতো পাবলিক প্লেসে নারীর ওপর সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির প্রদর্শনী করে এ বিষয়ক শিক্ষাকে প্রচার করছে। নারী প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে পারবে না, তাকে প্রাইভেট স্থানে ধূমপান করতে হবে এই বিবেচনা যখন একটি শর্টফিল্মে উঠে আসছে এবং এর প্রতিবাদ করলে সে তরুণ হুমকী ধামকী দিয়ে বলছে সে আরো এমন ছবি বানাবে, তখন এটা স্পষ্ট হয় যে, সে তার এ যুগের প্রতিবাদের মূল যায়গাটা তো ধরতে পারেই নি, তার চেতনার মধ্যে ধর্ম শাসিত পিতৃতন্ত্রের শিক্ষাগুলো অত্যন্ত প্রকট ভাবে তাকে শাসন করছে। সে ঐ প্রথাগত শিক্ষা প্রচার করেই তার সমসাময়িক সৃজনশীল তরুণদের মাঝে নেতৃত্বের অবস্থানে যাওয়ার, নিজেকে প্রচারের উচ্চাকাঙ্খা জাত একটা করুণ হীন প্রয়াস করছে।  হয়তো এই কাজের জন্য সে তার মতোই চেতনাধারীদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তাও পেয়েছে।

গণস্থানে নারীর শ্রমদানকে আজ একবিংশ শতকে গ্রহণ করতে পারলেও মৌলবাদীরা পুরুষের মতো স্বাধীনতা নিয়ে নির্ভয় অসঙ্কোচ প্রকাশের মতো কোনো দূরন্ত সাহস মেয়েরা করবে এটা গ্রহণ করা তাদের পক্ষে কঠিন। কেননা সঙ্কোচের বিহ্বলতা থাকতেই হবে নারীর। সে যবুথবু থাকবে। ভয়ে থাকবে। সে মাঠে ময়দানে বুক চিতিয়ে ধোঁয়া ছাড়বে পা ছড়িয়ে বসে এটা নেয়া মৌলবাদের পক্ষে বেশ কঠিন। 

এখন ধরুন আমরা কোনো ছবির এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে প্রতিবাদ করলাম। নারীরা ও আমাদের প্রতিবাদের বিরুদ্ধে ওর পাশে প্রতিবাদে দাঁড়ালো তা হলে কি হবে? আমরা তা নেবো না? নারীরাও  দাঁড়াতেই পারে। ইসলামে সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হচ্ছে শরিয়া। যা পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। আপনারা জানেন শরিয়ার দোহাই দিয়ে মেয়েকে মেরে ফেলে তাকে অপরাধী বানিয়ে নিজেদের বাঁচাতে পারে পরিবার। শরিয়াসম্মত আচরণের পক্ষে মেয়েদের থাকার একটা বড়ো কারণ এই পারিবারিক এবং সামাজিক সম্ভাব্য হত্যা ও নির্যাতনের এবং বয়কটের হুমকী এবং তার পক্ষে রাষ্ট্র ও সমাজ না থাকা। এই মেকানিজমের বাইরে মেয়েদের যেতে হলে তার রাষ্ট্রীয় সেকুলার আইনের সহায়তা প্রয়োজন, যে আইন এখন প্রায় অকার্যকর। মেয়েদের অপরিবর্তনীয় আচরণের ভেতর রাখার সামাজিক প্রয়াস প্রতিটি পুরুষের হাতে রয়েছে বলেই অধিকাংশ পুরুষ মনে করে এবং তরুণেরা তাদের পিতৃ পিতামহের হাত থেকে ক্ষমতা প্রদর্শনকারী এইসব আচরণ গ্রহণ ও প্রয়োগ করে। মাতৃকূল থেকে তারা তাদের ক্ষমতা ফলানো বিষয়ে উৎসাহ ও প্রশ্রয় পায়। সে যতটুকু পর্যন্ত হ্যাঁ বলবে, মেয়েরা ততটুকু পর্যন্ত স্বাধীনতা ভোগ করবে- এই হচ্ছে ভাবনার একদিক। একে জাস্টিফাই করা হয় মেয়ের নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য হেন তেন বলে।

নব্য শহুরে নারীকে নব্য শহুরে তরুণরা ইসলাম ও ইসলামিক রক্ষণশীল, নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্কৃতির প্রতি থ্রেট হিসেবে বিবেচনা করে। পাবলিক প্লেস একটা লোভ, প্রলোভন ও পাপের দিকে আহ্বানকারী স্থান হিসেবে বিবেচিত। নারীর ঠিক এখানে থাকা উচিত নয়। নারী পাপের দিকে সহজে চলে যাবে। এবং তার অর্থ সে সহজেই আরেক পুরুষের কাছে তার সতীত্ব হারাবে। এই হারাবার কাজটা সহজেই যেন পুরুষ করতে পারে সে ধরণের প্রলোভন দেখানো নিসঙ্কোচ, ভয়হীন, দ্বিধাহীন আচরণ নারী করবে কেনো? নারীই পাপের কারণ। পুরুষ ধোয়া তুলসী পাতা।

এই চিন্তা কেনো করতে পারছে একটি শহুরে ফ্যাশন দুরস্ত তরুণ? কারণ দেশটা মুক্ত হওয়ার পরও বিগত ছেচল্লিশ বছরে আমরা একটা নতুন শ্রেণির মানবাধিকার, নারী অধিকার সচেতন, মুক্ত চেতনা ও যুক্তিতে ভাস্বর যুব শ্রেণি তৈরি করতে পারি নি। আমাদের যুব শ্রেণি পোশাকে আশাকে একবিংশ শতকে বাস করলেও তার চেতনায় সে তার পূর্ব প্রজন্মের মূল্যবোধে বাস করছে। একদিকে নারীরা বাঁধা ধর্মীয় ও পারিবারিক প্রথাগত চেতনায় এবং বাধ্যবাধকতায়, অপরদিকে শিক্ষা ও সচেতনতায় ছেলেরা বাঁধা এমন প্রতিষ্ঠান ও প্রজন্মের চিন্তার রশিতে, যারা নতুন প্রজন্ম ও সমাজের অবস্থানকে তাদের প্রাচীন যুগেই রেখে দিতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং তারা তাদের ছেলে সন্তানদেরও মানবাধিকার, গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নাগরিকের ভুমিকা ইত্যাদি বিষয়ে কোনোই শিক্ষা প্রদান করেন না।

মুক্তি মানে কি?। নারী ও পুরুষ উভয়েরই জন্য মুক্তি মানে কিন্তু পোশাক পাল্টে অন্যের পোশাক ধারণ নয়। ভিতর থেকে মুক্তিটা আসে নাগরিকদের অধিকার সচেতনতা ও তা মেনে নেয়া থেকে। সে অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করার প্রয়াস থেকে। প্রত্যেক নাগরিক সমান সুতরাং সমান সহায়তা পেয়ে তাদের বেড়ে ওঠা দেশের জন্য কল্যাণকর, এই চেতনা থেকে। সমান হলে ভুল করার অধিকারও তাদের সমান থাকবে নিশ্চয়ই, এবং ভুল করার পর ছেলেকে যদি মেনে নেয়া যায়, মেয়েকে কেনো ঘরে ঢুকিয়ে পেটাতে হবে? পরিবারগুলোকে ভাবতে হবে এটা, যে তাদের কন্যা সন্তানেরও ভুল করার অধিকার আছে। ভুল থেকে যদি শেখা যায় তবে ছেলে মেয়ে উভয়েই শিখুক। ভুল করবে বলে পথ আটকে রাখতে হবে মেয়েদের- এ ধরণের চিন্তা বশবর্তী হয়ে আজকের দুনিয়ায় মেয়েকে ঘরে বসিয়ে একেবারে অকর্মণ্য করে রাখা কোনো যুক্তিযুক্ত কাজ নয়। মেয়েকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিমুখ করা একেবারেই প্রাগৈতিহাসিক ধ্যান-ধারণা। আমাদের  অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর প্রবণতাটা বন্ধ না করা পর্যন্ত আমরা কিন্তু সঠিকভাবে চিন্তাই করতে পারছি না যে কোনটা আমার সীমা, কোনটা নয়।

মৌলবাদী চূড়ান্ত বিচারে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বৈরাচারি মাতা-পিতার, জনপ্রতিনিধির, ধর্মীয় পাণ্ডার ও সরকারের ক্ষমতার হাতকে শক্তিশালী করে। ক্ষমতার ভাগ পেতেই সে ক্ষমতার সহযোগী হয়। মৌলবাদীতার ভেতর কোনো নৈতিকতা বা নীতি নেই। এই তো সপ্তাহ কয়েক আগে ফেসবুকে পড়েছিলাম কোনো একটি মেয়েকে ফুটপাথে বসে ডাবের জল খেতে জোরাজুরি করছিলো কয়েকটি মাদ্রাসার ছেলে। তাদের আপত্তি কেনো মেয়েটি দাঁড়িয়ে খাবে, তার উচিত বসে খাওয়া, সেটাই ইসলামিক রীতি। ব্যক্তির সীমার ভিতর কতোখানি প্রবেশ করে চলেছে মৌলবাদীদের স্পর্ধা এবং সাধারণ নাগরিকের স্থান কতোখানি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে এটা হলো তার চূড়ান্ত উদাহরণ। বিষয়টি নাগরিকদের যেমন বুঝতে হবে তেমনি আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণও অনুধাবন করতে হবে। যেহেতু এখন বাংলাদেশে মৌলবাদীদের অন্যের স্থান কেড়ে নেবার স্পর্ধা বেড়ে চলেছে সরকারের তাদের সাথে সমঝোতার একটা আবহাওয়ার সূত্র ধরে, এখন নাগরিকদের একমাত্র আশা, আইন তার হাত বাড়িবে দেবে জনসাধারণের বাঁচার স্বার্থের দিকে। যদি স্বাধীন হবার এতদিন পরও এ দেশের আইন এতটুকু নাগরিকদের পাশে না দাঁড়াতে পারে তাহলে কিভাবে আমরা বলতে পারি- দেশটা স্বাধীন? কিভাবে বলতে পারি-আমরা একটি ন্যায় সমাজ গড়ার জন্যই তিরিশ লাখের রক্ত দান হিসেবে গ্রহণ করেছি? সে রক্তে ও ত্যাগে আমাদের কতটুকু অধিকার আছে?

বি.দ্র.: জানিয়ে রাখা ভালো - আমি ধূমপায়ী নই কিন্তু আমার ধূমপানের এই ছবিটি দিচ্ছি, প্রকাশ্যে নারী কি করবেন কি করবেন না তার এসব ব্যক্তিগত আচার আচরণ নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর খুলে বসেছেন যারা তাদের বলতে-নিজের নোংরা নাকটি যথাস্থানে রাখুন, অন্যের ব্যাপারে গলাবেন না। নারী ‍পুরুষ উভয়েই যখন দায়িত্বশীলতা শিখবেন তখন তারা প্রকাশ্যে ধূমপান করবেন না। কারণ এ্যাকটিভ ও প্যাসিভ ধূমপান দুইই ধূমপায়ীর নিজের ও আশপাশের সবার স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। বস্ততঃ বর্তমান বিশ্বের আধুনিক স্মার্ট আচরণগুলোর একটি  হচ্ছে ধূমপান না করা।


  • ১৯৮০ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

জাহানারা নুরী

কথা সাহিত্যিক জাহানারা নুরী একজন হিউম্যান রাইটস একটিভস্ট।

ফেসবুকে আমরা