মেয়েরা পাবলিক প্লেসে খালি গায়ে চলতে পারে না

রবিবার, জানুয়ারী ১৪, ২০১৮ ৪:১৯ PM | বিভাগ : প্রতিক্রিয়া


সিগারেট খাওয়া মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর তা সবাই জানে। এরপরও যদি কেউ না জেনে তা করে থাকে তাহলে তাকে সচেতন করা যেতে পারে। কিন্তু সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে যদি আপনি নারী পুরুষের বৈষম্য তৈরি করেন তাহলে তাকে কি বলা যেতে পারে? গতকাল থেকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোস্যাল মিডিয়াতে। যেখানে সাব্বির নামের একটি ছেলে (আসল নাম অর্ণব) একটি মেয়েকে পাব্লিক প্লেসে সিগারেট না খাওয়ার জন্য যুক্তি দিচ্ছে “মেয়েরা যদি পাব্লিক প্লেসে খালি গায়ে বা পোষাক ছাড়া চলতে না পারে তাহলে তারা পাব্লিক প্লেসে সিগারেটও খাওয়ার অধিকার রাখে না। এবং এই ইস্যুটাকে নিয়ে সে তার মোবাইল ক্যামেরায় বিনা অনুমূতিতে সেই মেয়ের স্মোক করার ভিডিও ধারণ করে সোস্যাল মিডিয়াতে পাব্লিক করে সবাইকে অনুরোধ করে আপনারাও যদি কোনো মেয়েকে রাস্তায় বা পাব্লিক প্লেসে সিগারেট খেতে দেখেন তাহলে ভিডিও করে তা পাব্লিক করে দিন যাতে এটা বন্ধ করা যায়।

আসলে কিন্তু একটি উন্নত স্বাধীন ও গনতান্ত্রিক দেশের মেয়েরা এই দুইটাই করতে পারে। তারা পাব্লিক প্লেসে খালি গায়ে বা পোষাক ছাড়া চলতেও পারে আবার পাব্লিক প্লেসে সিগারেটও খেতে পারে হয়তো সচেতনতার কারণে বাস্তবে তারা বা কেউ এগুলা করে না। একটি সচেতন পুরুষও কিন্তু পাব্লিক প্লেসে খালি গায়ে হাটতে পারবে না বা যেখানে সিগারেট খাওয়া নিষেধ আছে সেখানে সিগারেট খেতে পারবে না। তাহলে বোঝায় যাচ্ছে সেই ১১ মিনিটের ভিডিওতে সাব্বির নামের অর্ণব ছেলেটা যে যুক্তি এবং মানসিকতা থেকে এই ভিডিওটি তৈরি করেছিলো তার কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু হ্যাঁ সেই ভিডিওটি এটা প্রামাণ করছে যে বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা চেতনায়, ধর্মীয় গোড়ামী, কুসংস্কার, আর নারী পুরুষের বৈষম্য কিন্তু এখনও বিদ্যমান। এবং তাই নয় তা বর্তমান নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বহমান। যদিও আমরা তাদের শিক্ষিত সমাজ বলতে পারি কিন্তু শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আসলে একটি মানুষকে পুর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারে না তারও প্রমাণ এটা। আসুন একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি বর্তমান প্রজন্মের ছেলে হয়েও অর্ণবের মতো ছেলেদের মস্তিষ্কে এমন মানুষিকতা কেনো হলো আর কিভাবে হলো।

আমরা জানি সভ্যতার শুরুতে মানুষ শিকার ছেড়ে কৃষিতে নারীদের হাত ধরেই এসেছিলো। অর্থাৎ শিকার যুগের অবসান ঘটিয়ে নারীরাই কৃষি যুগের সূচনা করেছিলো। কিন্তু সেই শুরুতেই পুরুষরা নারীদের হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পেরেছিলো কারণ প্রাকৃতিক ভাবে নারীদের শারীরিক গঠন ছিলো একটু ভিন্ন। এবং সন্তান জন্মদানের জন্য নারীর ঘরে ফিরতে বাধ্য হওয়ায় এবং আরো নানবিধ পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চক্রান্তে নারীকে ধীরে ধীরে হারাতে হয় তার যাবতীয় ক্ষমতা। কিন্তু নারীদের মধ্যে অন্য আরেকটি মানব মানবীর জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় তাদেরকে অনেক পুর্বে অনন্য ক্ষমতার অধীকারী মনে করা হতো যা থেকে মানুষ নারীদের সৃষ্টিকর্তার সমতুল্য মনে করতো। যখন মানুষ বিভিন্ন ধর্ম তৈরি করলো তখন বেশ কিছু ধর্মেই এই নারীদের উপাসনা করা হতো দেবতা মনে করে যা বর্তমানেও পৃথিবীতে টিকে থাকা কিছু ধর্ম করে থাকে। কিন্তু প্রকৃতিগত কারণে নারীরা শারীরিক ভাবে পুরুষের থেকে আলাদা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে মানুষের সমাজ হয়ে উঠে পুরুষতান্ত্রিক। অর্থাৎ নারীদের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, স্বাধীনতা, মত প্রকাশ করার যায়গাসহ আরো অনেক বিষয়ে তাদেরকে কোনঠাসা করা হয় এই পুরুষদের তৈরি করা পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে। আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকা এসব মনোভাব আজকের দিনের জন্ম নেওয়া একটি শিশুর ভেতরেও চলে আসছে যার পেছনে আছে ধর্মীয় মৌলবাদের মতো একটি কালো শক্তি।

আজকের দিনের অর্ণবরা এরকম ভিডিও বানিয়ে নারী পুরূষের যে বৈষম্য দেখাচ্ছে সেসব এই মৌলবাদেরই একটি অংশ। তারা আসলে বুঝতে পারছে না এই মৌলবাদী একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা শুধু নারীদেরকেই কোনঠাসা করছে না তার মতো নতুন প্রজন্মের সমস্ত ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই আসলে কোনঠাসা করে রাখছে। এদের কাউকে তাদের স্বাধীন মত প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, তাদের ইচ্ছার মূল্যায়ন করা হচ্ছে না, নারী পুরুষ জাতিগত ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলতে দিচ্ছে না। সেই দিক থেকে আমি বলবো আজকের সমাজের সচেতন নারীরা অনেক এগিয়ে। তাদের প্রকৃতিগত শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তারা পুরুষের সমাজে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যা অর্ণব কোয়ালিটির একটি মস্তিষ্কের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি কোন পুরূষের পক্ষে সম্ভব কিনা সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

যেমন ধরুন, নারীদের প্রতিমাসেই পিরিয়ড (মাসিক) হয় যা না হলে পৃথিবীতে মানব সভ্যতার অগ্রগতি সম্ভব হতো না। এরকম পরিস্থিতিতে নারীরা স্যানিটারি ন্যাপকিন এর সাহায্যে পুরুষের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি অর্ণবের মতো মস্তিষ্ককে বলা যায় আপনি এরকম একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে দুই তিন দিন রাস্থায় বা পাব্লিক প্লেসে চলাচল করেন তাহলে অর্ণবের পক্ষে সেটা সম্ভব হবে? নাকি হবে না? গর্ভে একটি সন্তান জন্ম দেবার ক্ষমতা শুধুই একটি নারীর থাকে তাই এই বিষয়ে কিছু না বলে জন্মের পর একটি মানব শিশুকে কিভাবে প্রতিপালন করতে হয় সেটা যদি একটি নারীর যায়গায় এই অর্ণবকে দেওয়া হয় তাহলে সে কি করবে? নিশ্চয় তাকেও কোনো নারী লালন পালন করেছিলো তাই এই অভিজ্ঞতা তার থাকার কথা।

অভিজিৎ রায়ের বিশ্বাসের ভাইরাস এখানে আমাদের দেশের অর্ণবদের মস্তিষ্কে কাজ করছে ঠিক জলাতঙ্ক রোগের ভাইরাসের মতো। এক মস্তিষ্ক থেকে আরেক মস্তিষ্কে ঢুকছে এবং সমাজ পরিবর্তন করার থেকে তারা অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টায় বেশি করে যাচ্ছে। অভিদার সেই উদাহরনটি আমার এখন মনে পড়ছে। “ল্যাংসেট ফ্লুক” নামের প্যারাসাইটের কারণে পিপড়ের মস্তিস্ক আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন পিপড়ে কেবল চোখ বন্ধ করে পাথরের গা বেয়ে উঠা নামা করে। ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোও কি মানুষের জন্য একেকটি প্যারাসাইট? হ্যাঁ ঠিক তাই, ধর্মীও বিশ্বাস ও ধর্মীও অনুশাসনের মধ্যে একটি মৌলবাদী সমাজে বেড়ে ওঠা এরকম অর্ণবদের মতো মস্তিষ্ক থেকে এই ধরনের মানসিকতায় আসবে সেটা আমাদের সকলেরই প্রত্যাশিত ঘটনা হবার কথা। এই কারণে আমি এই সব অর্ণবদের কোনো দোষ আছে বলে মনে করি না। কারণ আজ যদি এই অর্ণবের গর্ভধারিনী নারী পশ্চিমা কোনো দেশে বা ইউরোপ কান্ট্রির মতো উন্নত কোনো দেশে তাকে জন্ম দিতো তাহলে তার কাছ থেকে আমরা এধরনের কিছুই দেখতাম বলে মনে হয় না। বরং আমরা দেখতাম সে প্রগতিশীল নারীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার কথা বলছে। নারী পুরুষের বৈষম্য ও ভেদাভেদ ভোলার কথা বলছে। আরেকটি কথা, অর্ণব তার ভিডিওতে যা করতে বলছে “একজনের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করা” এটা সম্পুর্ণ বে-আইনি একটি কাজ এবং অন্যায়। তাই যারা এই ভিডিওকে পজেটিভ ভাবে নিচ্ছেন তাদের বলবো ভুলেও এমন কাজ কোথাও করতে যাবেন না।


  • ২০৪১ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

আলোমগীর কবির

গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও প্রথাবিরোধী মুক্তমনা ব্লগার

ফেসবুকে আমরা