ধর্ষণ (পর্ব ১)

রবিবার, মে ১৩, ২০১৮ ২:০৩ AM | বিভাগ : সমাজ/গবেষণা


“তুমি আমাকে চেনো না, কিন্তু তুমি আমার শরীরের ভিতরে ঢুকেছো, এবং সে-কারণেই আজ আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি আমাদের বাড়িতে বেশ চুপচাপ একটা শনিবারের রাত। বাবা ডিনার বানাল, আমি এবং আমার ছোট বোন টেবিলে বসেছিলাম; ও এই উইকেন্ডে বাসায় বেড়াতে এসেছে। আমি তখন ফুল টাইম কাজ করি, ঘুমোনোর সময় হয়ে আসছে। আমার বোন তার বন্ধুদের সাথে একটা পার্টিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল, আর আমি বাসায় বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখে বই পড়ব ভাবছিলাম। তারপর হঠাৎ কেন যেন মনে হলো আমার তো আর কিছু করার নেই, এটাই তো আমার শেষ রাত ওর সাথে, একটা হাবাদের পার্টিই তো হবে, গেলেই তো হয় ওর সাথে, বাসা থেকে তো মোটে মিনিট দশেকের রাস্তা। আমি সেখানে বোকার মতো নেচে আমার ছোট বোনকে বিব্রতই না হয় করলাম।

পার্টিতে যাওয়ার পথে ওর সাথে ফাজলামি করে এও বলেছিলাম যে এইসব আন্ডারগ্র্যাড ছেলেদের দাঁতে নিশ্চয়ই এখনো ব্রেস থাকবে। আমার বোন আমাকে উল্টো টিটকারি মেরে বলেছিলো আমি একজন লাইব্রেরিয়ানের মতো হাল্কা হলদে-বাদামি কার্ডিগ্যান পরে একটা ফ্র্যাট (ফ্রাটার্নিটি) পার্টিতে যাচ্ছি। উত্তরে নিজেকে আমি বলছিলাম, ‘বিগ মামা’, জানতাম ওখানে সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা হবো আমিই। মুখ ভেঙচাচ্ছিলাম, সে রাতে খুব হাল্কা মনে বেশ দ্রুতই ড্রিংক করা শুরু করে দিয়েছিলাম আমি। হিসেবেই আনি নি যে কলেজ ছাড়ার পর আমার সহন ক্ষমতা অনেক কমে গেছে।

এর পরের যে ঘটনাটা মনে পড়ে সেটা হলো আমি স্ট্রেচারে চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে আছি একটা হলওয়েতে। আমার হাতের পেছনে আর কনুইতে শুকনো রক্ত আর ব্যান্ডেজ। ভাবলাম পড়েটড়ে গেছি হবে, আর ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক কোনো অফিসে আনা হয়েছে আমাকে। খুব শান্ত ছিলাম আর ভাবছিলাম আমার বোন কোথায় গেলো? একজন ডেপুটি এসে জানালো আমি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তখনো আমি চুপচাপ আছি, নিশ্চিত যে লোকটা ভুল মানুষের সাথে কথা বলছে। এই পার্টির কাউকে আমি চিনিই না। যখন শেষমেষ আমাকে বাথরুমে যেতে দেয়া হলো, আমি হাসপাতালের দেয়া প্যান্টটা নামিয়ে নিজের অন্তর্বাস টেনে নামাতে চাইলাম, হাতে কিছুই ঠেকলো না। মনে পড়ে আমার হাত আমার ত্বক ছুঁলো, কিন্তু কিছুই ধরতে পারলো না। আমার শরীরের নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কিছু নেই। আমার যোনি আর বাকি পৃথিবীর মাঝখানের পাতলা কাপড়ের ফালিটা হারিয়ে গেছে, আর আমার ভেতরের সবটুকু যেন নিঃশব্দ করে দেয়া হয়েছে। ওই অনুভূতিটা প্রকাশ করার কোনো শব্দ আমার জানা নেই এখনো। শ্বাসটা চালু রাখার জন্য ভেবে নিলাম আলামত হিসেবে পুলিশ হয়তো কাঁচি দিয়ে ওটা কেটে নিয়েছে।

ঘাড়ে সুঁই এর মতো ধারালো পাইন পাতাগুলো ঠেকছিলো, আমি চুল থেকে সেসব টেনে টেনে তুলতে শুরু করলাম। ভাবলাম, হয়তো পাইন গাছ থেকে পাতাগুলো আমার মাথার উপর ঝরে পড়েছে। আমার পেট বলছিলো বাঁচাও, বাঁচাও আর আমার মাথাটা পেটকে যেন বলছিলো না না ভেঙ্গে পড়ো না।

গায়ে কম্বল মুড়িয়ে এলোমেলোভাবে এ ঘর থেকে ও-ঘরে ঘুরছিলাম, পায়ে পায়ে পিছু নিচ্ছিলো সেই সুঁচালো পাইন পাতারা, যে ঘরেই বসছিলাম সে ঘরেই ফেলে আসছিলাম গাদাখানেক পাতা। আমাকে ‘রেইপ ভিক্টিম’ নামের একটা কাগজে সই করতে বলা হলো, এবং তখনই প্রথম ভাবলাম তবে আসলেই বুঝি কিছু ঘটেছে। আমার জামাকাপড় খুলে নেয়া হলো, নার্সদের সামনে আমি পুরো নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারা আমার শরীরের জখমগুলো রুলার দিয়ে মেপে মেপে ছবি তুললো। চুল থেকে পাইন পাতাগুলোকে চিরুনি দিয়ে উঠিয়ে নিতে শুরু করলো তিন জন, তাদের ছয় হাতে মিলে সেই পাতাগুলোকে একটা কাগজের ঠোঙায় ভরছে। আমাকে শান্ত করার জন্য ওরা বারবার বলছিলো আরে এসব কিছু না গাছপালা, ডালপালা। আমার যোনি আর পায়ুতে বেশ কিছু সোয়াব (দেহরস সংগ্রহের শোষক প্যাড) ঢুকানো হয়েছে, আছে ইনজেকশনের সুঁই, ওষুধ। আমার ছড়ানো দু’পায়ের মাঝে তাক করা ছিলো একটা নাইকন ক্যামেরা আমার যোনির ভেতরের ক্ষত মাপার জন্য নীল রং এর ঠাণ্ডা এক ধরণের পেইন্টের সাথে ঢুকান ছিলো লম্বা, বাঁকানো এক চঞ্চু।

এসবের ঘন্টাখানেক পর আমাকে স্নান করতে বলা হলো। ঝর্ণার নিচে শরীরটা পরখ করে বুঝলাম, আমার এই শরীরটা আমি আর চাই না। ভয় পাইয়ে দিচ্ছে এটা আমায়, জানি না এর ভেতরে কী ঢুকেছিলো, ওটা কী দূষিত হয়ে উঠেছে, কে ছুঁয়েছে ওটা? জ্যাকেটের মতো খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছা করছিলো শরীরটা আর বাকি সব কিছুর মতন ওটাও ফেলে আসতে চাইছিলাম আমি হাসপাতালে।

সেই সকালে আমাকে ওরা শুধু বলেছিলো যে, ময়লার একটা আস্তাকুঁড়ের পাশে পাওয়া গেছে আমাকে, সম্ভবত অচেনা কেউ আমাকে ধর্ষণ করেছে। আর এইচআইভি’র জন্য আমাকে আবারো পরীক্ষা করাতে হবে কারণ এর ফলাফলটা ঠিক চট করে পাওয়া যায় না। ওরা বললো এখন না কি বাসায় গিয়ে আমার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া উচিত। স্রেফ এই তথ্যটা নিয়ে পৃথিবীর কাছে আমাকে ফিরে যেতে হবে, শুধু ভাবুন একটি বার! বিদায়ের সময় ওরা আমাকে দীর্ঘ, গাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলো, এবং আমার নেকলেস আর জুতোজোড়া ফিরিয়ে দিলো। তাদের দেয়া নতুন শার্ট আর প্যান্ট পরে আমি হেঁটে গেলাম পার্কিং লটের দিকে…… ।” (১) (চিঠির বাকি অংশটি একজন অনুবাদ করে দিবেন বলেছেন, দেখা যাক।)

এটা সেই ২৩ বছরের মেয়েটার লেখা হৃদয়বিদারক চিঠির প্রথম অংশ – সে তার ধর্ষকের উদ্দেশে আদালতে এটা পড়ে শুনিয়েছিলো (আমার মতে সব সমাজের সব পুরুষের এই চিঠিটা পড়া উচিত, ১২-১৪ বছরের বেশি বয়সের প্রতিটি ছেলের বাবা-মায়ের উচিত তাদেরকে সামনে বসিয়ে এই চিঠিটা পড়ে শোনানো।) তার ধর্ষক ছিলো আমেরিকার সুবিধাভোগী অংশ থেকে আসা সাদা, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া একজন সেলিব্রিটি সাঁতারু, ২০ বছর বয়সের ব্রক টার্নার। সেই রাতে ফোনে মেয়েটার স্তনের ছবি তুলে বন্ধুদের পাঠিয়ে গর্ব করতে করতে মহাফূর্তিতে সে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছিলো।

আইন অনুযায়ী তার ১৪ বছরের জেল হওয়ার কথা, কিন্তু সমাজের একই শ্রেণির অধিবাসী আরেকজন সাদা পুরুষ জজ সাহেব তার জন্য কাতর হয়ে পড়লেন। জুরিরাও সঠিক সাজার পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন, সাক্ষী প্রমাণেরও কোনো অভাবও ছিলো না। দু’জন ছাত্র তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলো আস্তাকুঁড়ের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা মেয়েটিকে ধর্ষণরত অবস্থায় । টার্নার দৌঁড়ে পালানোরও চেষ্টা করেছিলো, তখন এই দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী ছুটে গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে এসে পুলিশে হাতে তুলে দেয়। কিন্তু তারপরও তাকে শুধু ৬ মাসের জেল আর তিন বছরের প্রবেশন দেওয়া হয়েছিলো! শুনেছি ‘ভালো’ কয়েদি হওয়ার কারণে ৩ মাসের মাথায়ই সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলো।

তার সাজা কমিয়ে দেওয়ার পিছনে যুক্তি? — না, জেলে গেলে না-কি টার্নারের এই সম্ভাবনাময় জীবনে বড্ড খারাপ প্রভাব পড়বে। তার বিত্তবান বাবাও জজ সাহেবের কাছে ছেলের সাফাই গেয়ে বলেছিলো : ২০ মিনিটের একটা ‘কাজের’ জন্য তার ছেলের এই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ঠিক হবে না। তার ছেলে না-কি খুব হাসিখুশি ছিলো, রাঁধতে পছন্দ করতো, রিব-আই স্টেক খেতে পছন্দ করতো, এখন সে আর কিছুই খেতে চায় না, তার চোখে মুখে বিষাদের ছায়া। সে এই মামলার কারণে অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, জজ সাহেবের কোনোভাবেই উচিত হবে না মরার উপর খাঁড়ার ঘা দিয়ে লম্বা সময়ের কোনো সাজা দেওয়া!

তা তো বটেই — গতস্য শোচনা নাস্তি — তবে আমরা এও জানি যে এই নিয়ম শুধুই পুরুষের জন্য প্রযোজ্য; আর পিতৃতন্ত্রের ভারে ন্যুব্জ সমাজে আজও নারীদেরকেই, সিসিফাসের মতো, আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় সেই যন্ত্রণার দায়ভার। ধর্ষিত মেয়েটাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাও বলে ছেড়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু আসলেই কী সম্ভব মেয়েটার পক্ষে সেই ‘স্বাভাবিকত্ব’ ফিরে পাওয়া? তার উপরে সেটা যদি হয় আমাদের মতো সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ধর্ষিতাকেই সারাজীবন ‘খারাপ মেয়ের’ গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়!

আমরা আজকাল, ইন্টারনেট এবং মিডিয়ার কল্যাণে, বাংলাদেশ বা ভারতে অনেক ধর্ষণের ঘটনা দেখছি, চোখ বন্ধ করে থাকলেও শুনতে বাধ্য হচ্ছি। এইটাকে আমরা এখন ‘ভালো’ বলে গণ্য করছি – কারণ আজকের দিনে অন্তত কিছু নারী এগিয়ে এসে ধর্ষণ নিয়ে মামলা করার সাহস পাচ্ছে, এ-নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। এতদিন তো সেটা করারও উপায় ছিল না। তনুরা না পারলেও বা জ্যোতি সিংরা যুদ্ধে লড়তে লড়তে অতলে তলিয়ে গেলেও রথি এবং সাদিয়ারা চেষ্টা চালিয়ে যচ্ছে, রুদ্ধ দ্বার মাথা ঠুকে যতটুকু পারে ততটুকুই খোলার চেষ্টা করছে।

আমাদের প্রজাতির দুই লক্ষ বছরের বিবর্তনের শেষে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অকল্পনীয় উন্নতির যুগে বসে ইলন মাস্ক যখন মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের কথা বলছেন তখন এটুকু অর্জনকেই অগ্রগতি ভেবে নিয়ে আমরা সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করছি। একজন নারী হিসেবে একে ভালো বলবো না-কি খারাপ বলব সেটা আমার জানা নেই। পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিলাম এই বিচারের ভার — আমাদের তথাকথিত ‘আলোকিত মানব সভ্যতার’ গ্লাসটা অর্ধেক ভর্তি নাকি অর্ধেক খালি সেটা আপনারাই ঠিক করে নিন।

স্ট্যানফোর্ডের ধর্ষণের শিকার এই মেয়েটিকে অন্তত পুলিশের হাতে হেনস্থা হতে হয় নি, তাকে কেস করার জন্য বারবার থানায় ধর্না দিতে হয় নি, পুলিশ তাকে ইজ্জতের দোহাই দিয়ে ফিরিয়ে দেয় নি — তারপরও অবস্থাটা এখনো খুব একটা ভাল নয় আমেরিকা বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও – বিংশ শতাব্দীর তাল মাতাল করা নারী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুর দেশগুলোতেও। এখনো বহুদূরের পথ হাঁটতে হবে আমাদের, যদিও মাঝে মাঝে মনে হয় মুক্তির পথটা যেন সীমাহীন, এর কোনো শেষ নেই।

বাংলাদশে যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের কোনো সার্বিক তথ্য আমার জানা নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্র মিডিয়া থেকে জরিপ করে (সম্ভবত পত্রিকার রিপোর্ট থেকে) জানাচ্ছে, এ বছর জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ৪৬৪ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন, ৫৬ জনের উপর ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে (২)। ধর্ষণের পরে ২৭ জন মারা গেছেন, এবং ৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো ৪৪৬ জন শিশু (২)। কিন্তু এই পরিসংখ্যান থেকে দেশের যৌন নির্যাতনের সার্বিক চিত্রটি আঁকা বোধ হয় কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমরা জানি না শতকরা কতজন নারী বা তাদের পরিবার আসলে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করার সাহস পান (যার সংখ্যা খুব বেশী হওয়ার কোনো কারণ নেই), আর তার মধ্যেও ক’টাই বা শেষ পর্যন্ত পত্রিকার খবরে পরিণত হয়?

তাই আমি প্রথমে আমেরিকার কিছু তথ্য দিচ্ছি। এদেশের মেয়েরা এখন আমাদের দেশের চেয়ে অনেক সহজে যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের বিচারের দাবি করতে পারে এবং করেও। তারপরও পশ্চিমেও এটা সর্বজনবিদিত যে, সব অপরাধের মধ্যে ধর্ষণ নিয়ে সবচেয়ে কম রিপোর্ট করা হয়। এখানে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি; হয়তো এর প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে, যেখানে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকেই দোষী ভাবা হয় পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে, পুলিশের কাছে গেলেও সে মামলা নিতে অস্বীকার করে, আর মামলা হলেও তার উপর হুমকি, ঝক্কি, ঝামেলার শেষ থাকে না, ধর্ষণের চিত্রটা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে একটা অস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের রিপোর্ট(৩) অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ লাখ নারী ধর্ষিত হয়; তবে সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল(CDC) মনে করে এই সংখ্যা ১৩ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারী তথ্য মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে যৌন নির্যাতনের সংখ্যা কমেছে ৬৪% — নির্যাতিতের সংখ্যা প্রতি ১,০০০-এ ৫ থেকে ১.৮-এ নেমে এসেছে। ২০১০ সালে ২৭০,০০ নারী, অর্থাৎ ১২ বছরের বেশি বয়সের মেয়েদের মধ্যে প্রতি ১,০০০-এ ২ জন যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৯৯৫ সালে ২৮% যৌন নির্যাতনের কেসের রিপোর্ট করা হয়েছে পুলিশের কাছে; এবং এর সংখ্যা ২০০৩ সালে বেড়ে ৫৯% এ দাঁড়িয়েছিলো, কিন্তু ২০০২ সালে তা আবার ৩২% এ নেমে গেছে। রিপোর্ট করা এবং না করা কেসগুলোকে যোগ করে হিসেব করলে ২০০৫-২০১০ সালের মধ্যে মাত্র ১২% কেসের আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

হাফিংটন পোস্টের এক রিপোর্টে (৪) বলা হচ্ছে, এখনো ৫৪% ধর্ষণের কেসই রিপোর্ট করা হয় না এবং প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন মেয়ের এ দেশে ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখলে দেখা যায় যে সুইডেনে সর্বোচ্চ ধর্ষণের কেস রিপোর্ট করা হয়। তবে সে দেশের কর্তৃপক্ষের মতে সুইডেনের মতো প্রগতিশীল সমাজে ধর্ষণের রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে এখন নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশী সাহসী হয়ে উঠেছেন। তার উপরে আবার সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যৌন নির্যাতনের কেসগুলোকে ইচ্ছা করেই কিছুটা ভিন্ন ভাবে রিপোর্ট করা হয়। যেমন ধরুন, কোনো বিবাহিত নারী যদি বলেন যে তার স্বামী তাকে এক বছর ধরে ধর্ষণ করে আসছে তাহলে তার বিরুদ্ধে ৩৬৫ টি ধর্ষণের মামলা করা হবে। সে কারণেই সে দেশে ধর্ষণের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় এত বেশী বলে মনে হয় ।

আপনারা যদি ভাবেন ‘ওহ, আমেরিকা, সুইডেন বলে এরকম হয়, আমাদের দেশে তা হবে না’ তাহলে চলুন ভারতের কিছু হিসেব দেখি যেখানকার সমাজ সংস্কৃতির সাথে আমাদের প্রচুর মিল থাকার কথা।

ভারতের খবর পড়লে মনে হয় সেখানে যেন ধর্ষণ এবং গ্যাং রেপের মহামারী চলছে। যত বেশী কথা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, শাস্তি হচ্ছে, ততই যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে এই অমানুষত্ব। যৌন হয়রানি এবং নির্যাতন প্রধানত একটি জেন্ডারড অপরাধ। এই যৌন অপরাধীদের ৯৯% পুরুষ, আর এই অপরাধের বলি-দের মধ্যে ৯১% ই নারী (৫)। পুরুষ, বিশেষ করে ছোট ছেলেরাও, এর শিকার হন, কিন্তু সেক্ষেত্রেও নির্যাতক প্রধানত থাকেন পুরুষই। সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম হলেও পুরুষেরাও পুরুষের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন, এ প্রসঙ্গে পরে অন্য কোনো পর্বে লেখার ইচ্ছা রইলো।

ভারতের জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) ২০১৫ সালের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে যে, ভারতে ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছর ২৮,৩৪৯ টি টি ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ৩৪,৬৫১ টি ধর্ষণ এবং ৪৪৩৭টি ধর্ষণের চেষ্টার রিপোর্ট করা হয়েছে (৬)।

জনসংখ্যা প্রতি হিসেব করলে দিল্লীতে সর্বোচ্চ ধর্ষণের কেস রিপোর্ট করা হয়েছে : দিল্লীতে ২২৫১টি, মধ্যপ্রদেশে ৪৩৯১টি, মহারাষ্ট্রে ৪১৪৪টি, রাজস্থানে ৩৬৪৪টি, উত্তর প্রদেশে ৩০২৫টি, কেরালায় ১২৫৬, বিহারে ১০৪১ টি…। এই রিপোর্টেও আবারো সাবধান করে দেওয়া হয়েছে এই বলে যে, কোনো রাজ্যে বা শহরে কম ধর্ষণ রিপোর্টেড হওয়া মানে এই নয় যে সেখানে আসলেই কম মেয়ে ধর্ষিত হয়। ধর্ষণের হার আসলে নির্ভর করে, রাজ্যের নারী শিক্ষা এবং স্বাধীনতার হার, মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার,নারী ও পুরুষের অনুপাত ইত্যাদির উপর। যেমন কেরালার মতো শিক্ষিত একটি রাজ্যে মেয়েরা অনেক বেশী সাহসী হবে এ ধরনের নির্যাতন নিয়ে কথা বলতে যেখানে হয়তো বিহারে তার সংখ্যা হবে অনেক কম, যদিও বিহারের জনসংখ্যা কেরালার চেয়ে তিনগুণ।

একই কথা খাটে ইউরোপ, সুইডেন বা আমেরিকার পরিসংখ্যানের ব্যাপারেও। আমেরিকায় ৩ লক্ষের বিপরীতে ভারতে মাত্র ৩০ হাজারের মতো ধর্ষণ আর বাংলাদেশে মাত্র কয়েক’শ – এই সংখ্যাগুলো দেখে খুশী হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। এখানে এই ভেবে স্বস্তি পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই যে, ‘দেখ পশ্চিমের দেশগুলোতে কত বেশী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, ভারত বা বাংলাদেশের অবস্থা সেই তুলনায় কতই না ভাল” । এই দেশগুলোতে নারীরা গত একশ’ দেড়শ’ বছরে যতটুকু স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে (যদিও সম্পুর্ণ নারী মুক্তি এখনও অধরাই রয়ে গেছে) তার ফলশ্রুতিতেই তারা আজকে এগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস এবং সুযোগ পাচ্ছে। সেজন্যই সংখ্যাটা আপাত চোখে এত বেশী দেখাচ্ছে। আমাদের মতে দেশগুলোতে বেশীরভাগ কেসই গোপন করা হয় – পরিবার এবং মেয়েটির সম্মান ও সতীত্বের কথা ভেবে, সমাজে তাদের আর জায়গা হবে না ভেবে, বিচার পাবে না ভেবে, উল্টো হুমকির শিকার হবে ভেবে। এখানে একইভাবে ধর্ষণের কেসগুলো রিপোর্ট করার সুযোগ তৈরি হলে সেগুলোর সংখ্যাও এর চেয়ে বেশী বই কম হবে না।

ধর্ষণ সম্পর্কে আমাদের সমাজে একটা বড় ভুল ধারণা হচ্ছে যে, দানবীয় ধরনের কিছু ‘খুব খারাপ’ ছেলে ধর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে আর ‘খুব খারাপ’ ধরনের মেয়েরা ধর্ষিত হয়। কথাটা আসলে বড্ড ভুল — সব সমাজেই অধিকাংশ যৌন নির্যাতন ঘটে চারপাশের পরিচিত পুরুষদের দ্বারাই।

আমেরিকার সমাজের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ৩৮% নারী ধর্ষিত হন বন্ধু বা পরিচিত কোনো ছেলের দ্বারা, ৩৪% স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড দ্বারা (খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে মেয়েদের দ্বারাও), এবং ৬% আত্মীয় বা পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা ধর্ষিত হন। ২২% ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয় অপরিচিতদের দ্বারা। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনাগুলো থেকেও চিত্রটা সেরকমই দেখা যাচ্ছে বলেই মনে হয়।

মধুমিতা পাণ্ডে নামক একজন পিএইচডি ছাত্রী তার গবেষণার জন্য ৩ বছর ধরে দিল্লির কারাগারে আটক ১০০ জন ধর্ষককে ইন্টারভিউ করেছেন (৭)। তার এই গবেষণা থেকে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক কিছু তথ্য উঠে এসেছে। উনি বুঝতে চেয়েছিলেন এরা কিভাবে চিন্তা করে, কী ধরনের পুরুষেরা আসলে ধর্ষণ করে, কী থেকে এ ধরনের মানুষের জন্ম হয় সমাজে।

উনার গবেষণার বেশীর ভাগ পুরুষই সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ, কয়েকজন হাই স্কুল পাশ করলেও বেশীর ভাগই প্রাইমারি স্কুলও পাশ করেন নি। এরা কেউই কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দা নন, দানবও নন। এরা আমাদের আশপাশের খুব সাধারণ মানুষ, তাদের কাজ কর্ম চিন্তা ভাবনাগুলো আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের অচলায়তনেরই বহিঃপ্রকাশ। পুরুষেরা পুরুষোচিত তেজ এবং কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক এবং ‘প্রাকৃতিক’ বলে বিশ্বাস করে আর মেয়েরা তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়াটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়ে বড় হয় আমাদের সমাজে।

এই সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের অনেকেই এখনো মনে করে না যে তারা ধর্ষণ করেছে; তারা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর অনুমতি কী জিনিস সেটাই এখনো বোঝে না। তাদের বেশীর ভাগেরই কোনো অনুশোচনাও নেই এ নিয়ে। আর যারা বোঝেন যে এটা অপরাধ তাদের বোঝার নমুনাটা দেখলে রাগে দুঃখে হতাশায় কাঁদতে ইচ্ছে করে।

৪৯ বছর বয়সের এক মন্দির-পরিষ্কারকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন পাণ্ডে। ২০১০ সালে ৫ বছরের এক শিশু ভিক্ষুককে ধর্ষণ করার দায়ে জেলে গিয়েছিলো সে। তেমন কোনো লেখাপড়াও নেই তার। দোষটা নাকি ওই ছোট্ট মেয়েটিরই – খুব খারাপভাবে বারবার তার গায়ে স্পর্শ করে সে ওই লোকটিকে ধর্ষণ করতে প্ররোচিত করেছিলো! মেয়েটিকে শুধু একটু শিক্ষা দেওয়ার জন্য ধর্ষণটা করে থাকলেও তার এখন এ-নিয়ে বেশ অনুশোচনা হয়। কিন্তু সেই অনুশোচনাটা কিসের জন্য জানেন? তার পাপের বা অপরাধের জন্য নয়, এত্ত ছোট্ট একটি শিশুর উপর অত্যাচার করার জন্যও নয়, বরং তার কারণেই যে মেয়েটি আর কুমারী থাকলো না, এখন তাকে কে বিয়ে করবে? — সেই জন্যে। এই ‘মহান’ ব্যক্তিটি জেল খাটা শেষ হলে মেয়েটিকে বিয়ে করে উদ্ধার করারও ইচ্ছে পোষণ করে।

আপনি হয়তো ভাবছেন যাক বাঁচা গেলো, আমার মতো কম্পিউটারের সামনে বসে এই লেখাটি পড়ার মতো শিক্ষিত পুরুষেরা হয়তো এভাবে ধর্ষণ করে না। কিন্তু সেটা যে সত্যি নয় সেটা আপনিও খুব ভালো করে জানেন। বেশী দূর যেতে হবে না, এ বছরই যতগুলো ধর্ষণের কেস মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে তার মধ্যেই প্রচুর পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ীর ‘শিক্ষিত’ ছেলে থেকে শুরু করে সরকারি দলের প্রভাবশালী ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতা পর্যন্ত কেউই বাদ নেই।

আমেরিকায় সাম্প্রতিককালে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, বিল ও’রাইলি থেকে শুরু করে বিল কসবি’র মতো অত্যন্ত সুপিরিচিত বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে (৮)। ‘দ্যা কসবি শো’-র বিখ্যাত অভিনেতা বিল কসবির মতো অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তিত্ব নাকি নিয়মিতভাবে, গত ৫০ দশক ধরে, অভিনয় জগতের বিভিন্ন নারীকে পানীয়ের সাথে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে ধর্ষণ করেছে। ৩০ জনেরও বেশী নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তার প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এবং আগে ধর্ষণ নিয়ে সমাজে এত সচেতনতা না থাকায় এই নারীরা এতদিন এগিয়ে এসে অভিযোগ করার সাহস পাননি।

গত ক’দিন ধরে হলিউডের বিখ্যাত প্রডিউসার, মিরা ম্যাক্সের প্রতিষ্ঠাতা, “Sex, Lies, and Videotape,” “The English Patient,” “Pulp Fiction,” “Shakespeare in Love,” এবং “The King’s Speech” এর মতো সিনেমার প্রযোজক হারভি ওয়াইনস্টিনকে নিয়ে তোলপাড় চলছে। গুয়েনেট প্যালট্রো থেকে শুরু করে এঞ্জেলিনা জোলি পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশী নারী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন কয়েকদিন আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে (৯)। অনেকেই বলছেন যে, ওয়াইনস্টিনের এই স্বভাবের কথা অনেকেই জানতো, কিন্তু তার প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এতদিন কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি।

ওয়াইনস্টিনের হাতে যৌন হয়রানির শিকার লরেন সিভান নামের একজন সংবাদ প্রতিবেদক এক টুইটে একটা ভাল কথা বলেছেন। ধর্ষণের খবরটি তিনি এতদিন প্রকাশ না করে গোপন রেখেছিলেন কেনো জানতে চেয়েছেন যারা তাদের উদ্দেশ্য করে লরেন বলেন, ১০ বছর আগেও এই খবর এভাবে প্রকাশ করা সম্ভব ছিলো না। সম্প্রতি এটা সম্ভব হয়ে উঠেছে কারণ তার চেয়ে বড় বড় নারীরা এখন অনেক সাহসী হয়ে এগুলো প্রকাশ করতে এগিয়ে আসছেন। হলিউড নিয়ে অনেক গুঞ্জন থাকলেও সেখানে এই হারে এ লিস্টার নায়িকারা যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেটা হয়তো আমাদের ধারণা বাইরে ছিলো এতদিন। বৃটিশ অভিনেত্রী এমা থম্পসন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওয়াইনস্টিনের খবরটি শুনে উনি একটুও অবাক হচ্ছেন না; মুভি ইন্ড্রাস্ট্রিতে ওনার নিজের কমবয়সী সময়টা কেটেছেই ‘বহু পুরুষের জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া জিবগুলো মুখ থেকে টেনে বের করতে করতে…। এরা শুধু যৌনতায় আসক্ত বললে ভুল হবে, এরা আসলে যৌন শিকারি’।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য খবর হচ্ছে যে ডনা ক্যারেনের মত একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারী ফ্যাশন ডিজাইনার পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সেই বস্তাপঁচা ধারণাগুলোকে তুলে ধরে হারভি ওয়াইনস্টিনকে সমর্থন করার চেষ্টা করে তোপের মুখে পড়েছেন। উনি সেই অতি পরিচিত সুরে গান ধরেছেন, ওয়াইনস্টিন খুব ভালো মানুষ, আমেরিকার মতো সমাজে মেয়েদের না-কি আগে নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। মেয়েরা যৌনতা আর সেন্সুয়ালিটি দিয়ে পুরুষের এ ধরনের ব্যবহারকে উস্কে দিচ্ছে কিনা সেটা আগে দেখতে হবে। কে জানে, মেয়েরা নিজেরাই হয়ত এগুলো চাচ্ছে! ভিক্টিম ব্লেমিং এর কথা শুনলে আজকাল আর আমরা অবাক হই না। এগুলোই তো শুনে এসেছি সেই কবে থেকে, এ আর নতুন কী? কিন্তু তথাকথিত নারী উন্নয়ন করে বেড়ানো, খ্যাতিসম্পন্ন ডনা ক্যারেনরাও যখন এরকম করে বলেন তখন বুঝি মুক্তির পথটা হয়তো এখনো বহুদূর।

আমাদের দেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। কিন্তু সেখানে বিত্তবান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা কতটুকু অসম্ভব সেটা বোধ হয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে এই যৌন নির্যাতনের ব্যাপারটি নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীর সমস্যা নয়, এটি তার চেয়েও এক ধাপ উপরের স্তরের সমস্যা। একজন রিকশাচালক আমাদের সমাজে তার চেয়ে উঁচু শ্রেণির মানুষের হাতে সারাক্ষণ নিগৃহীত হন, তিনিই হয়তো আবার বাড়ি গিয়ে বউ পেটাতে দ্বিধাবোধ করেন না। তাই আজকের সমাজের নারীরা একই সাথে যেমন শ্রেণী সংগ্রাম করছেন ঠিক তেমনি আবার পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে নেমেছেন।

এখানে কয়েকটি প্রসঙ্গ পরিষ্কার করা দরকার। আমরা নারীরা অনেক সময়েই সমগ্র পুরুষ জাতিকে শত্রু বানিয়ে ফেলি, কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার যে আমাদের যুদ্ধটা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, সেখানে পুরুষেরাও যেমন আমাদের সহযোদ্ধা হতে পারেন (এবং সেটা না হওয়া পর্যন্ত আসলে যৌন নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়) ঠিক তেমনি নারীরাও পুরুষতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। তাই এ বিষয়ে শত্রুমিত্র নিরূপণের কাজটা শুধু আবেগের বসে না করে মাথা দিয়ে চিন্তা করেই করা উচিত। আবার সব অপরাধের মতো ধর্ষণেরও বিভিন্ন মাত্রা আছে, রকম ফের আছে। একজন নারী হিসেবে আমার প্রায়ই মনে হয় যে ধর্ষণ মানেই ধর্ষণ, এর জন্য চরমতম শাস্তিটিই হওয়া উচিত। কিন্তু সেটা আবেগের কথা, যুক্তির কথা নয়, আইন সেভাবে কাজ করেনা। দুটো সাবালকের মধ্যে ডেট রেপ আর ৫ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ কিংবা ধরুন তনু হত্যা বা জ্যোতি সিং এর উপর দিল্লীতে যে হিংসাত্মক গ্যং রেপ হয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটির অপরাধের মাত্রা ভিন্ন এবং তাদের শাস্তিও ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক।

ধর্ষণ মানব সমাজের আদি থেকে থাকলেও এর সংজ্ঞা কিন্তু পাল্টেছে যুগে যুগে। সমাজে নারীর অধিকারের সাথে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে এর ধারণাও। আমাদের লিখিত ইতিহাস জুড়ে দেখতে পাই যে নারীকে সবসময় পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং তাদের মূল্য নির্ধারিত হইয়েছে যৌন বিশুদ্ধতা বা সতীত্বের মাপকাঠিতে। তাই কোতো নারী ধর্ষিত হলে সেটা সেই মেয়েটির বিরুদ্ধে করা অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে সেটাকে তার বাবা, ভাই বা স্বামীর সম্পত্তির ক্ষতি হিসেবে দেখা হতো এবং সেই হিসেবে তাদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হতো। অথবা খুব বেশী হলে মেয়েটিকে ধর্ষকের সাথেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। এখনো কোনো কোনো সমাজে পরিবারের সম্মানহানির ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্ষতিকারকের পরিবারের নারীদের ধর্ষণ করার রেওয়াজ আছে (১০)। ২০০৭ সালে সৌদি আরবে এক গ্যাং রেপের মামলায় আদালত ধর্ষকদের জেল দেওয়ার সাথে সাথে ২১ বছরের ধর্ষিতা মেয়েটিকেও ২০০ চাবুকের বাড়ি দেওয়ার রায় দিয়েছিলো।

আর যুদ্ধের সময় গণধর্ষণ তো সব সময়েই সব সমাজে বৈধতা পেয়ে এসেছে। ‘৭১ এর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঙালি নারীদের পৈশাচিক ধর্ষণ, নির্যাতন এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালের বাংলাদেশে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টায় চরম অবহেলার উদাহরণ তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। পরবর্তী পর্বে বিশ্ব-ইতিহাসে প্রাচীন আমলে বা সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, রুয়ান্ডা বা বসনিয়ায় যুদ্ধকালীন গণধর্ষণ বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ‘কম্ফোর্ট ওইমেনদের’ উপর যে অকল্পনীয় যৌন নির্যাতন করা হয়েছিলো তা নিয়ে লেখার ইচ্ছা রইলো।

আমেরিকায় (এবং অন্যান্য সব দেশেই যেখানে দাস ব্যবস্থা ছিলো) কালো দাস মেয়েদের বা আদিবাসী মেয়েদের ধর্ষণ করাটা কোন অপরাধ বলে গণ্য হতোনা। স্বামীর স্ত্রীকে ধর্ষণ করা বা কোন পতিতাকে ধর্ষণ করা যে একটা অপরাধ এমন কোনো ধারণাই আমাদের ছিলনা কিছুদিন আগেও- এদের উপর যে কোনো যৌন নির্যতন করা জায়েজ ছিলো, এরা তো ‘ধর্ষণযোগ্য’ই নয়!

আধুনিক নারী আন্দোলনের যদি কোনো বৈপ্লবিক অর্জন থেকে থাকে সেটা হচ্ছে এই যে তারা গত শতাব্দীতে ধর্ষণের সংজ্ঞাকে পাল্টাতে সক্ষম হয়েছে – এটা যে একজন মানুষের বিরুদ্ধে, একজন নারীর বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ সেটা অন্তত খাতা কলমে সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে (১১)।

ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন নির্যাতন যে মানব প্রজাতিতে সেই আদি থেকেই ছিল সেটা অনুমান করে নিলে বোধ হয় খুব একটা ভুল হবেনা। আমাদের কয়েক হাজার বছরের লিখিত ইতিহাসে এর ভুড়িভুড়ি প্রমাণ মেলে – তার আগে মানব সমাজে ধর্ষণ ছিল না সেটা ধরে নেওয়া চরম বোকামিই হবে। এমনকি প্রাণী জগতেও ধর্ষণ ঘটতে দেখা যায়। এটা আমাদের আদিমতম সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। তবে আজকে আমরা ধর্ষণকে যে অপরাধের লেন্সের নীচে ফেলে দেখতে শিখেছি সেটা আগে কখনো ছিলো কিনা তা আমার জানা নেই; এখন আর আমাদের সেখান থেকে পেছাবার কোনো উপায় নেই। সামনে এগিয়ে খুন যেমনভাবে আমাদের সমাজে অগ্রহণযোগ্য সব ধরনের ধর্ষণকেও ঠিক সে চোখেই দেখতে শুরু করতে হবে।

আমি এই সিরিজটিতে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের ইতিহাস, সামাজিক এবং বৈজ্ঞানিক কারণ, এ নিয়ে নারীবাদী এবং বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক, আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় স্তরে নারী আন্দোলনের ইতিহাস এবং কার্যকারিতা, নারী পুরুষের মনস্তত্ত্ব, ধর্ষিতদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অবস্থা, আইনি, সামাজিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা, ইত্যাদি বিষয়ের উপর তথ্য এবং গবেষণারভিত্তিক কয়েকটি পর্ব লেখার আশা রাখি।

আজকাল ধর্ষণ নিয়ে অনেক কথাবার্তা এবং বিতর্ক হলেও অনলাইনে বাংলায় ধর্ষণের ওপর তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য রিসোর্স চোখে পড়লো না। এ বিষয়ে জানা, বোঝা এবং সচেতনতা তৈরি করা শুধু নারীর জন্যই নয়, সমাজের প্রতিটি পুরুষের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বস্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বহুমুখী পদক্ষেপ ছাড়া সমাজে যৌন নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের আজকের এই পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের সাথে সাথে পুরুষেরাও যতদিন না এ বিষয়ে সচেতন হবেন এবং সমাজের প্রতিটি মানুষ এর বিরুদ্ধে সক্রিয় না হবেন ততদিন পর্যন্ত এই সর্বত্র-বিরাজমান ঘৃণ্য অপরাধটি রোধ করা বা অন্তত পক্ষে এর সংখ্যা কমিয়ে আনা কখনই সম্ভব হবে না।

( লেখাটি মুক্তমনা ব্লগে প্রকাশিত। )


  • ২২৭৮৮ বার পড়া হয়েছে

পূর্ববর্তী লেখা পরবর্তী লেখা

বিঃদ্রঃ নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


মন্তব্য টি

লেখক পরিচিতি

বন্যা আহমেদ

সম্পাদক, মুক্তমনা।

ফেসবুকে আমরা